কুমিল্লার একটি দাখিল মাদ্রাসায় এ বছরের পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল মাত্র একজন শিক্ষার্থী। তাকে পড়ানোর জন্য ছিলেন ১২ জন শিক্ষক। সেই একজন শিক্ষার্থীও পাস করেনি। খুলনার একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ১০ জন শিক্ষক পড়িয়েছেন মাত্র দুইজন পরীক্ষার্থীকে। তাদেরও কেউ পাস করেনি। জামালপুরে ১১ জন শিক্ষক তিনজন পরীক্ষার্থীকে পড়িয়েছেন, একজনও উত্তীর্ণ হয়নি।
আবার, নরসিংদীর একটি মাদ্রাসায় ১৮ জন শিক্ষক ১৬ জন পরীক্ষার্থীকে পড়িয়েও কাউকে পাস করাতে পারেননি। এ বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় দেশের ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই পাস করেনি। গত বছর এই সংখ্যা ছিল ১৩৪। অর্থাৎ, প্রশ্নটি তাই কেবল ফলাফল খারাপ হওয়া নয়। প্রশ্ন হলো, এসব প্রতিষ্ঠান চলছে কীভাবে? কোথাও শিক্ষার্থী হাতে গোনা কয়েকজন, কোথাও নিয়মিত ক্লাস হয় না, শিক্ষক এসে ঘুরে চলে যান, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও কম। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই এমপিওভুক্ত। রাষ্ট্র যখন একটি প্রতিষ্ঠানকে অর্থ দেয়, তখন তার বিনিময়ে শিক্ষার ন্যূনতম মান নিশ্চিত হবে, এটাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা। একটি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক আছেন, ভবন আছে, সরকারি সুবিধা আছে, অথচ শিক্ষা নেই—তাহলে প্রতিষ্ঠানটির অস্তিত্বের যৌক্তিকতা কোথায়?
মনে রাখতে হবে, সরকারি অর্থ কোনো প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এমপিও একটি দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত রাষ্ট্রীয় সহায়তা। সেই দায়িত্ব পালন না হলে জবাবদিহি থাকবেই; কিন্তু জবাবদিহির পাশাপাশি প্রয়োজন পুনর্গঠন। যে প্রতিষ্ঠান সত্যিই অকার্যকর, তাকে টিকিয়ে রাখার যুক্তি নেই; কিন্তু যে প্রতিষ্ঠানকে সামান্য বিনিয়োগ, দক্ষ শিক্ষক, নিয়মিত তদারকি ও শিক্ষার্থী ধরে রাখার উদ্যোগে ঘুরিয়ে দাঁড় করানো সম্ভব, তাকে মৃত্যুর দিকে না ঠেলে আবার জেগে ওঠার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে
আরও উদ্বেগজনক হলো, এই সংকটের ভৌগোলিক চরিত্র। বিভাগীয় বা জেলা শহরের তুলনায় উপজেলা, গ্রাম, চর, হাওর, সীমান্ত ও দুর্গম এলাকায় শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেশি। ৩১২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২২৬টি মাদ্রাসা, ৫৭টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের প্রতিষ্ঠান এবং ২৯টি কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৭২ শতাংশ মাদ্রাসা। এটিকে কেবল কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে সমস্যাটির গভীরতা ধরা পড়বে না। দুর্বল প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর দুর্বল ফল করবে, শিক্ষার্থী ঝরে পড়বে, শিক্ষক উপস্থিতির নিশ্চয়তা থাকবে না, আর প্রতিষ্ঠানটি সরকারি সুবিধা পেতে থাকবে—এই ব্যবস্থা শিক্ষার প্রতি একধরনের নিষ্ঠুর পরিহাস।
এখন শিক্ষা মন্ত্রণালয় কারণ অনুসন্ধান করছে। ২২৬টি মাদ্রাসার প্রধানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠান সদুত্তর দিতে না পারলে এমপিও বাতিলের কথাও বলা হয়েছে। একাধিকবার শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে। এই পদক্ষেপ প্রয়োজনীয়। তবে শোকজ ও এমপিও বাতিল দিয়েই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রথমে প্রত্যেক শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ একাডেমিক অডিট করা প্রয়োজন—কতজন শিক্ষক কর্মরত, তাদের উপস্থিতি কেমন, কত দিন ক্লাস হয়, শিক্ষার্থী কতজন, কতজন ঝরে পড়েছে, বিদ্যালয়ের অবকাঠামো কেমন, কোন বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা রয়েছে। এর পাশাপাশি সব শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানকে একই দণ্ডে বিচার করাও সমীচীন হবে না। কোথাও প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা, কোথাও শিক্ষকসংকট, কোথাও শিক্ষার্থী ঝরে পড়া, কোথাও ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা প্রধান কারণ হতে পারে। তাই সিদ্ধান্তের আগে তথ্য চাই। শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপকও তথ্যভিত্তিক ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
মনে রাখতে হবে, সরকারি অর্থ কোনো প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এমপিও একটি দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত রাষ্ট্রীয় সহায়তা। সেই দায়িত্ব পালন না হলে জবাবদিহি থাকবেই; কিন্তু জবাবদিহির পাশাপাশি প্রয়োজন পুনর্গঠন। যে প্রতিষ্ঠান সত্যিই অকার্যকর, তাকে টিকিয়ে রাখার যুক্তি নেই; কিন্তু যে প্রতিষ্ঠানকে সামান্য বিনিয়োগ, দক্ষ শিক্ষক, নিয়মিত তদারকি ও শিক্ষার্থী ধরে রাখার উদ্যোগে ঘুরিয়ে দাঁড় করানো সম্ভব, তাকে মৃত্যুর দিকে না ঠেলে আবার জেগে ওঠার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।
সুতরাং, ৩১২টি প্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষার্থীও পাস করেনি—এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার একটি পরিসংখ্যান মাত্র নয়। এটি আমাদের সামনে এই প্রশ্ন ছুড়ে দেয়—আমরা কি শুধু পরীক্ষার ফল প্রকাশ করব, নাকি সেই ফলের ভেতরে লুকিয়ে থাকা শিক্ষার বাস্তবতাটিও দেখব? এখন দ্বিতীয় কাজটাই বেশি জরুরি।













