একটি শিশু কেবল সেই পরিবারের প্রাণ নয়, তারা রাষ্ট্রেরও প্রাণ। তারাই তো ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের হাল ধরবে। সব যুগে সব সমাজেই শিশুরা সবচেয়ে মহামূল্যবান। সেই সব শিশুর মধ্যে প্রায়ই কেউ যদি নিখোঁজ হয়, তখন যেন কেবল সেই শিশুটির পরিবারের জন্য সময় থেমে যায়! ঘড়ির কাঁটা চলতে থাকে বটে, শহরের জীবন স্বাভাবিক নিয়মে চলতে থাকে। মানুষ কর্মস্থলে যায়, বাজার বসে, যানবাহন চলাচল করে। শুধু একটি পরিবার অপেক্ষায় থাকে—সন্তান কোথায়, কেমন আছে, বেঁচে আছে কি না—এই অনিশ্চয়তার চেয়ে বড় শাস্তি আর কী হতে পারে?
পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব বলছে—২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজের জিডি হয়েছে। তাদের মধ্যে ২ হাজার ৩৮ জনের সন্ধান পাওয়া যায়নি। পুলিশ বলছে, নিখোঁজ শিশুদের ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ উদ্ধার হয়। নিঃসন্দেহে উদ্ধার হওয়া শিশুদের সংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু যে ২ হাজারের বেশি শিশু এখনো নিখোঁজ, তাদের প্রত্যেকের পরিবারের যন্ত্রণা কি আমরা অনুভব করতে পারি?
বাংলাদেশে নিখোঁজ শিশুদের সাম্প্রতিক ঘটনাবলি সেই নির্মম বাস্তবতাকেই আবার সামনে এনেছে। ঢাকার খিলক্ষেতের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র হাবিবুল্লাহ নাঈম ১৭ সেপ্টেম্বর বাসা থেকে বের হয়ে আর ফিরে আসেনি। তার মোবাইল ফোন থেকে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি অর্থ দাবি করেছে বলে পরিবার জানিয়েছে। পরিবারের অভিযোগ, নিখোঁজ হওয়ার ২৪ ঘণ্টা পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত থানায় সাধারণ ডায়েরি গ্রহণে অনীহা দেখানো হয়েছিল। দক্ষিণখানের ১৩ বছর বয়সী আরাফাত হোসেন রিয়াদের ঘটনাও একই প্রশ্ন তুলেছে।
শিশু নিখোঁজের ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে কাজ করার জন্য পুলিশের কোনো বিশেষ ইউনিট বর্তমানে নেই। অথচ সংশ্লিষ্টদের মতে, নিখোঁজের পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের মধ্যে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ, মোবাইল ফোনের অবস্থান শনাক্ত, সম্ভাব্য যাতায়াতের পথ অনুসন্ধান এবং সন্দেহভাজনদের বিষয়ে দ্রুত তথ্য সংগ্রহ করা গেলে অনেক ক্ষেত্রে শিশুকে উদ্ধারের সম্ভাবনা বাড়ে
মার্চ মাসে নামাজ পড়তে বের হয়ে আর ফিরে আসেনি সে। ছয় মাস ধরে সন্তানকে খুঁজে বেড়াচ্ছে পরিবার। অথচ পরিবারের অভিযোগ, এলাকার সিসি ক্যামেরার ফুটেজসহ সম্ভাব্য সূত্র অনুসন্ধানে পুলিশ যথেষ্ট তৎপর হয়নি। এরই মধ্যে কুমিল্লার ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতিমের নিখোঁজ হওয়ার পর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা জনমনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। অপ্রতিমের নিখোঁজ হওয়া এবং পরবর্তী সময়ে তার মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় তার পূর্বপরিচিত কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। প্রশ্ন হলো, একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর তাকে উদ্ধারের জন্য যে সময়টি সবচেয়ে মূল্যবান, সেই সময়টুকু আমরা কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করছি?
সম্প্রতি একটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশে শিশু নিখোঁজসংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—শিশু নিখোঁজের ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে কাজ করার জন্য পুলিশের কোনো বিশেষ ইউনিট বর্তমানে নেই। অথচ সংশ্লিষ্টদের মতে, নিখোঁজের পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের মধ্যে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ, মোবাইল ফোনের অবস্থান শনাক্ত, সম্ভাব্য যাতায়াতের পথ অনুসন্ধান এবং সন্দেহভাজনদের বিষয়ে দ্রুত তথ্য সংগ্রহ করা গেলে
অনেক ক্ষেত্রে শিশুকে উদ্ধারের সম্ভাবনা বাড়ে। এখানেই রাষ্ট্রের সক্ষমতার প্রশ্নটি সামনে আসে। একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবার যদি প্রথমে থানায় গিয়ে জিডি করতে সমস্যায় পড়ে, পরে এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে ঘোরে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ছড়িয়ে মানুষের সহানুভূতির অপেক্ষা করে—তাহলে আধুনিক প্রযুক্তি, বিপুল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনিক কাঠামোর কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন উঠবে। কোনো কোনো শিশু অভিমান করে, পারিবারিক কলহে, পড়াশোনার চাপ কিংবা বন্ধুর প্রভাবে বাড়ি ছেড়ে যায়—এটি সত্য; কিন্তু কোন শিশু নিরাপদে ফিরবে আর কোন শিশু অপরাধীর হাতে পড়েছে, তা নিখোঁজের প্রথম মুহূর্তে বোঝার উপায় নেই। অতএব প্রতিটি ঘটনাকেই শুরুতেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া আবশ্যক।
পরিবারেরও দায়িত্ব আছে। সন্তান কোথায় যায়, কার সঙ্গে মেশে, কী ধরনের সংকটে আছে—তার প্রতি নজর দিতে হবে; কিন্তু পরিবারের সতর্কতা কখনোই রাষ্ট্রের দায়িত্বের বিকল্প নয়। একটি শিশু নিখোঁজ হওয়া মানে সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্যও একটি জরুরি সংকেত। সেই সংকেত যেন আমরা অনুধাবন করতে ভুল না করি।










