নিজস্ব প্রতিনিধি :
মো. আসাদুজ্জামান আসাদ। কাস্টমস-সিএণ্ডএফের এক স্বঘোষিত মহারাজা! সাতক্ষীরার শ্যামনগরের মো. আব্দুস সাত্তার ও খোদেজা বেগমের পুত্র আসাদুজ্জামান অনিয়ম-দুর্নীতি করে কেবল বিপুল সম্পত্তির মালিকই বনে যাননি, তার বিরুদ্ধে উঠেছে সীমাহীন অপকর্মের অভিযোগ। নিজ এলাকায় বিশাল অট্টালিকা হাঁকিয়েছেন, চড়েন কোটি টাকার গাড়ি; দীর্ঘদিন ধরে চালিয়ে আসছেন ‘হানি ট্র্যাপ’ ফাঁদের ব্যবসা; সিএণ্ডএফ ব্যবসার আড়ালে করেন বিদেশ থেকে ‘সেক্স টয়’ ও নেশাজাতীয় দ্রব্যসহ নিষিদ্ধ পণ্যসামগ্রী আমদানি ও বাজারজাত। উচ্চ পদস্থ অফিসার এবং শীর্ষ আওয়ামী নেতাদের নানা অপকর্মের ‘দালাল’ হিসেবে কাজ করা আসাদুজ্জামানের দৌরাত্ম্য এতোটাই বেড়ে গেছে যে, ভুক্তভোগী অনেকের প্রশ্ন, ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে আওয়ামী সিন্ডিকেটের সবাই যেখানে পালিয়ে বা আত্মগোপনে, সেখানে আসাদুজ্জামান এখনো বহাল তবিয়তে কীভাবে ‘রাজ’ চালিয়ে যাচ্ছেন? তার এই ‘মহা প্রতাপশালী’ হয়ে ওঠার পেছনের রহস্য কী? কাদের শক্তিতে তিনি এখনো কাস্টমস ও সিএণ্ডএফ খাতে দাঁপিয়ে বেড়াচ্ছেন দৌর্দণ্ড প্রতাপে?
জানা যায়, আসাদুজ্জামান প্রাণ আরএফএলে চাকরি করেন। পাশাপাশি করেন সিএণ্ডএফ ব্যবসা। তবে সিএণ্ডএফ বিজনেসেই তিনি বেশি সময় ব্যয় করেন এবং ‘এই খাত’ই তার কাছে বেশি পছন্দের। কারণ, এই খাতকে ব্যবহার করেই তিনি আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন। করেছেন বাড়ি-গাড়ি, ব্যাংক-ব্যালান্স। পাশাপাশি প্রাণে চাকরির সুবাদে তিনি বিভিন্ন অপকর্ম-অনিয়মে লিপ্ত; কথায় কথায় নাম নেন প্রাণ আরএফএলের কর্ণধার আহসান খান চৌধুরীর নাম; এই ‘নাম বিক্রি করে আধিপত্য দেখান, নেন বাড়তি সুবিধা। আহসান খান চৌধুরী নাকি তার ‘আপনা লোক’।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কাঁলিগঞ্জের চরদায় তিনি ‘কিছুক্ষণ’ নামে ঝা চকচকে ৫ তলা ভবন হাঁকিয়েছেন। করেন মাছের ঘেরের ব্যবসা। কিনেছেন বিপুল পরিমাণ জমিজমা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, ‘শুনেছি আসাদ ভালো ব্যবসা করে চট্টগ্রামে। ব্যবসা ভালোই চলে বলে আমরা জানি। তার ব্যবসা নাকি দেশে-বিদেশে। বেশ ভালোই আছে তো দেখি। কাছের মানুষজনের খোঁজখবর রাখে। তার বহু টাকা!’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় আরেক বাসিন্দা বলেন, ‘আসাদুজ্জামান আওয়ামী লাগের রাজনীতি করতো। এখনো করে। আপনি তার সম্পর্কে খোঁজখবর করলেই সবকিছু জানতে পারবেন। সে বহু টাকার মালিক।’
এই প্রতিবেদকের হাতে যেসব ছবি ও তথ্যপ্রমাণ এসেছে, তাতে দেখা যায়, আসাদুজ্জআমান আওয়ামী লাগের নেতাকর্মীর সঙ্গে পার্টিতে মাতোয়ারা হয়ে বেড়াচ্ছেন। নাইম মেহেদী ওরফে অনিক মেহেদী নামে এক আওয়ামী নেতার সঙ্গে তাকে সহাস্যে পোজ দিয়ে ছবি তুলতে দেখা যায়। এই নাইম মেহেদীর ফেসবুক পেজে গিয়ে দেখা যায়, তিনি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সক্রিয় নেতা বা কর্মী। তিনি নিয়মিত আওয়ামী লীগের পক্ষে বিভিন্ন লেখালেখি ও পোস্ট শেয়ার করেন। বিগত ১৩ নভেম্বরেও তিনি আওয়ামী লীগের লকডাউন ঘিরে ব্যাপক সরব ছিলেন।
এ ব্যাপারে আসাদুজ্জামান অবশ্য দাবি করেন, তার সঙ্গে জোর করে ছবি ওঠা হয়েছে এবং এটা নিয়ে একটি মহল এখন ‘ইস্যু’ করার চেষ্টা করছে। ছবি যে কেউই উঠতে পারে। তিনি দাবি করেন, ‘আমি আ. লীগ করি না; ৫ আগস্ট আন্দোলনে হাসিনার পতন হলে সেই ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে ‘আলহামদুল্লিাহ’ লিখেছিলাম।’
অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রশ্ন করা হলে আসাদুজ্জামান বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে আমি সিএণ্ডএফ ব্যবসা করছি। সুবিধা না পেয়ে আমার কাছের কিছু লোক এখন আমার বিরুদ্ধে কুৎসা ছড়াচ্ছে। আমি পৈত্রিকভাবে বিত্তশালী, এখনো আমার বাপের শত শত বিঘা জমি আছে।’
কীভাবে মফস্বলে এই সুবিশাল বাড়ি বানিয়েছেন, প্রাডো গাড়ি কিনেছেন, এসব বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে, তিনি দাবি করেন, ‘এই বাড়ি আমার নয়, আমার বাবার। তাছাড়া এই বাড়ি সবধরনের নিয়মকানুন মেনেই করা হয়েছে, সবধরনের ভ্যাট-ট্যাক্স দিয়ে।’
হানি ট্র্যাপের ব্যবসা আছে কি না জানতে চাওয়া হলে, আসাদুজ্জামান পালটা অভিযোগ করেন, ‘যারা এসব বলছে, তারাই এই কাজ করে।’ এসময় তিনি আহসান খান চৌধুরীর সঙ্গে সখ্যতার বিষয়কে সামনে এনে গুলশানে নতুন অফিস করছেন বলে জানান।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘আমার ব্যবসা ও চাকরির সুনাম নষ্ট করার জন্য কিছু লোক কাজ করছে। তাদের কারণে আমি চার মাস ঠিকমতো ঘুমোতে পর্যন্ত পারছি না।’ তিনি তাদের বিরুদ্ধে আর্থিক অভিযোগ এনে এই প্রতিবেদকের কাছে হোয়াটসঅ্যাপে কিছু ব্যাংকের সই করা চেক এবং থানায় করা একটি জিডির কপি দেন।
অবশ্য যাদের বিরুদ্ধে জিডি করা হয়েছে, তারা এই প্রতিবেদকের কাছে পালটা অভিযোগ করে বলেন, ‘আসাদ আমাদের পরিচিত, কাছের মানুষ; কিন্তু সে নানা অপকর্মে জড়িত এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে এখনো সক্রিয় আর তাই তার সঙ্গে আমরা চলাফেরা করি না। তাছাড়া তার কুকর্মের জন্য তাকে এড়িয়ে চলি। এজন্যই সে আমাদের নামে মিথ্যা-বানোয়াট মামলা দিয়েছে।’
এই প্রতিবেদকের কাছে তারা দাবি করেন, ‘খোঁজ করলে তার বিরুদ্ধে সব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যাবে। আরো অনেক কিছু বেরিয়ে আসবে। সে নেশাখোর, সবসময় নেশা করে থাকে এবং বাজে কাজকর্ম করে বেড়ায়। তার কঠিন শাস্তি হওয়া দরকার। আমরা তার বিরুদ্ধে আইনানুগ বিচার ও শাস্তি চাই।’
সম্প্রতি কয়েকটি ব্যাংক অ্যকাউন্টে কয়েক কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন করেছেন আসাদুজ্জামান। সেই লেনদেনের ব্যাংক রিসিট এসেছে এই প্রতিবেদকের হাতে। দেখা যায়, আলেয়া এন্টারপ্রাইজ নামে বেশ কয়েকটি ব্যাংক হিসাব থেকে তিনি আগ্রাবাদ শাখায় এই লেনদেন করেন। স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক লি. (একাউন্ট নাম্বার : ০০৭৩৩১০১৩৯৪), ব্যাংক এশিয়া (একাউন্ট নাম্বার : ০৮১৩৩০০১৪২০), ট্রাস্ট ব্যাংক (একাউন্ট নাম্বার : ০০১২-০২১০০১৪১৯৪), প্রাইম ব্যাংক (একাউন্ট নাম্বার : ২১২০১৩৪০২৮৪৮২), এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক লি. (একাউন্ট নাম্বার : ০১০৫-৩৬০০০০০০০৭২)।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আসাদ একটি `শক্তিশালী সিন্ডিকেট’ গড়ে তুলেছেন। আর তার এ অপকর্মের সঙ্গে কাস্টমসের অন্তত তিন জন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তার (এআরও) প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে অভিযোগ। এছাড়া ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজসে আসাদ সিএণ্ডএফ এজেন্টদের নানাভাবে হয়রানি করে থাকেন। এ ব্যাপারে আরো খোঁজখবর করা দরকার বলে দাবি কয়েকজন ভুক্তভোগীর।
আসাদুজ্জমানের ব্যাপারে এক এআরও‘র সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ‘বর্তমানে আমি গোয়েন্দাতে আছি। আর কোনো সিএণ্ডএফ এজেন্টের কোনো ব্যক্তিগত বিষয় সম্বন্ধে অবহিত নই। তাই কারো ব্যক্তিগত বিষয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই।’ অথচ ঐ কর্মকর্তা আর আসাদ সবসময় একসঙ্গে চলাফেরা করেন বলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে। সবাই তাদের ‘মানিকজোড়’ বলে ডাকে! একজন রাজস্ব কর্মকর্তার একজন সিএণ্ডএফ এজেন্টের সঙ্গে এই দহরমমহরম নিয়ে নানা প্রশ্ন আছে। একজন ভুক্তভোগী দাবি করেন, বিশেষ করে ঐ এআরওর সঙ্গে পরামর্শক্রমেই সব অপকর্ম করে বেড়ান আসাদ; তারা দুজন মিলেই সিণ্ডিকেট গড়ে তুলেছেন এবং এজেন্টদের নানাভাবে হয়রানি করেন।
তরুণ বয়সি আসাদুজ্জামান অল্প সময়ে কীভাবে এত বিপুল সম্পত্তির মালিক বনে গেলেন, কীভাবে সিএণ্ডএফ ব্যবসায় ফুলেফেঁপে উঠলেন, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন আছে। আওয়ামী সুবিধাভোগী এই অসাধু ব্যক্তি কীভাবে এখনো অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন, তার শক্তির উৎস কী, সেটিও বড় প্রশ্ন। সচেতন মহল মনে করে, অনিয়ম-অপকর্ম না করলে কেউ এভাবে বিপুল সম্পত্তির মালিক হতে পারে না। এ ব্যাপারে আরো অনুসন্ধানপূর্বক আসাদুজ্জামানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। বিষয়টিতে সংশ্লিষ্ট মহলের দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন।













