এএকটি কারখানা বন্ধ হলে প্রথমে যা অনুধাবন করা যায়—তা হলো শব্দের অনুপস্থিতি। মেশিনের শব্দ নেই, চুল্লির আগুন নেই, ট্রাক ঢুকছে না, শ্রমিকের ব্যস্ততা নেই। বাইরে থেকে মনে হয়, একটি কারখানা কয়েক দিনের জন্য থেমে আছে। কিন্তু অর্থনীতির ভেতরে তখন অনেক কিছুই চলতে থাকে। ঋণের সুদ চলতে থাকে, শ্রমিকের সংসারের খরচ চলতে থাকে, কাঁচামালের মূল্য চলতে থাকে, বিদেশি ক্রেতার অপেক্ষার সময় চলতে থাকে। শুধু উৎপাদনটাই চলতে থাকে না।
বর্তমান গ্যাস-সংকটের সবচেয়ে ভয়ংকর দিকটি এখানেই। প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে চলা সংকটে দেশের অধিকাংশ ভারী শিল্পের উৎপাদন বন্ধ। স্টিল, কাচ, সিরামিক, সিমেন্ট, কেমিক্যালের মতো গ্যাসনির্ভর শিল্প কার্যত অচল। মেঘনা গ্রুপের ৫৭টি শিল্প ইউনিট বন্ধ। টি কে গ্রুপের কেমিক্যাল, ভোজ্য তেল ও সিমেন্ট কারখানাও বন্ধ। আরএফএল গ্রুপের উৎপাদন নেমে এসেছে ৫০ শতাংশের নিচে। গাজীপুরে ৫২৫টি এবং হবিগঞ্জে ১৭১টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়েছে। হবিগঞ্জের ১৭১টি কারখানায় দেড় লক্ষাধিক শ্রমিক কাজ করতেন। এখন তাঁরা অলস সময় কাটাচ্ছেন। কোথাও শ্রমিক কারখানায় গিয়েও কাজ পাচ্ছেন না, কোথাও ছুটি দেওয়া হচ্ছে। এসব কারখানা ভোজ্য তেল, আটা, ময়দা, সুজি, চিনি, সিমেন্ট, পেপার, এলপিজি, ফিড ও কেমিক্যালের মতো বহু পণ্য উৎপাদন করে। উৎপাদন বন্ধ থাকলে বাজারে তার প্রভাব পড়বে। কোথাও সরবরাহ কমবে, কোথাও দাম বাড়ার চাপ তৈরি হবে। গ্যাসের সংকট তখন শিল্পাঞ্চল ছাড়িয়ে মানুষের বাজারে ঢুকে পড়বে।
আরেকটি বিপদ আরও নীরব। শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন না করলেও তার ঋণ বন্ধ থাকে না। ব্যাংকের কিস্তি বন্ধ থাকে না। কাঁচামালের বিল, বেতন, রক্ষণাবেক্ষণ, পরিবহন, বিদ্যুৎ, করের দায়ও মুক্ত হয় না। শিল্প উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, দীর্ঘ সময় উৎপাদন বন্ধ থাকলে ভালো প্রতিষ্ঠানও ঋণখেলাপির দিকে ঠেলে যেতে পারে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই অনিশ্চয়তা যদি অভ্যাসে পরিণত হয়, তবে কে বাংলাদেশে নতুন শিল্প স্থাপন করবে? যে উদ্যোক্তা জানেন না আগামীকাল কারখানায় গ্যাস থাকবে কি না, তিনি কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে কীভাবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করবেন?
রপ্তানির ক্ষেত্রেও বিপদটি গুরুতর। পোশাক কারখানা একা পোশাক তৈরি করে না। তার পেছনে সুতা, কাপড়, ডাইং, ফিনিশিং, কেমিক্যাল, পরিবহনসহ একটি দীর্ঘ উৎপাদনশৃঙ্খল থাকে। সেই শৃঙ্খলের একটি অংশ থামলে অন্য অংশও থেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। ইতিমধ্যে অধিকাংশ বস্ত্রকল বন্ধ ছিল এবং চালু থাকা কয়েকটি কারখানাও ৩০ শতাংশের বেশি উৎপাদন করতে পারছে না। বিদেশি ক্রেতা কিন্তু আমাদের গ্যাসের সমস্যার অংশীদার নয়। তাদের প্রয়োজন নির্দিষ্ট সময়ে পণ্য। আমরা সময়মতো দিতে না পারলে তারা হয়তো অন্য দেশের দিকে তাকাবে। ব্যবসায় আবেগের জায়গা খুব কম। একবার ক্রেতা অন্যত্র সরে গেলে তাকে ফিরিয়ে আনা সহজ নয়।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই অনিশ্চয়তা যদি অভ্যাসে পরিণত হয়, তবে কে বাংলাদেশে নতুন শিল্প স্থাপন করবে? যে উদ্যোক্তা জানেন না আগামীকাল কারখানায় গ্যাস থাকবে কি না, তিনি কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে কীভাবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করবেন? নতুন শিল্পে গ্যাস-সংযোগের সমস্যার পাশাপাশি বর্তমান সংকট নতুন বিনিয়োগকেও বাধাগ্রস্ত করবে।
এই সংকটের তাৎক্ষণিক কারণ এলএনজি সরবরাহের বিপর্যয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি কারণ আরও কঠিন। দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমছে, আমদানিনির্ভরতা বাড়ছে, অথচ আমদানি বাড়ানোর অবকাঠামোও যথেষ্ট নয়। একটি টার্মিনাল বিকল হতেই দৈনিক প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। তাই শুধু টার্মিনাল মেরামতের অপেক্ষায় থাকলে চলবে না। স্বল্পমেয়াদে শিল্পে জরুরি ভিত্তিতে গ্যাস সরবরাহ ফিরিয়ে আনতে হবে। একই সঙ্গে নতুন কূপ খনন, স্থলভাগ ও সমুদ্রে অনুসন্ধান, ভোলার গ্যাস ব্যবহারের উদ্যোগ, এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যেতে হবে। বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যেও সমান্তরাল দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তার কথা স্পষ্ট।
ভারী শিল্পের চাকা যদি দীর্ঘদিন থেমে থাকে, তাহলে তার অভিঘাত অর্থনীতিসহ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়বে। সুতরাং সময় থাকতে এর টেকসই ও আশু সমাধান করা অত্যন্ত জরুরি।













