কিকিশোরগঞ্জের ভৈরব ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জসংলগ্ন মেঘনা নদীতে সরকারি কনডেন্সড তথা অপরিশোধিত জ্বালানি তেল চুরি ও পাচারের যে খবর গত কয়েক দিন ধরে সংবাদপত্রে প্রকাশিত হচ্ছে, তা পড়ে আমরা বিচলিত বোধ করছি। বিষয়টি যেমন দুঃখজনক, তেমনি উদ্বেগজনকও। পেট্রোবাংলার অধীন রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) আশুগঞ্জ স্থাপনা থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে জাহাজে তেল ভরার সময় ও নদীতে অবস্থানকালে একটি সংঘবদ্ধ চক্র নিয়মিত এই অপকর্ম চালিয়ে আসছে।
গভীর রাতে স্টিলের নৌকার সাহায্যে জাহাজের ‘হোস পাইপ’ ও পাইপলাইন থেকে ড্রামভর্তি অপরিশোধিত তেল সংগ্রহ করে তা ভৈরব বাজারের বিভিন্ন ঘাটে খালাস করা হচ্ছে। এভাবে প্রতি মাসে আনুমানিক ৬০ হাজার লিটার কনডেন্সড পাচার হচ্ছে। এই অবৈধ কারবারের কারণে রাষ্ট্র প্রতি মাসে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যা জাতীয় অর্থনীতির জন্যক্ষতিকর।
সমস্যাটি আসলে আরও গভীর। এখানে স্থানীয় নৌ-পুলিশ, প্রশাসন, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ ও কতিপয় অসাধু ব্যক্তির মাসোহারা পাওয়ার বিনিময়ে নির্বিঘ্নে চলছে এই অবৈধ বাণিজ্য। সর্ষের মধ্যে ভূত থাকলে সেই ভূত তাড়ানো কঠিন। চক্রের সদস্যরা ঔদ্ধত্যের সঙ্গে দাবি করছে যে, পাইপের অবশিষ্টাংশ থেকে তেল নেওয়া কোনো চুরি নয়। কিন্তু খনির এই ভারী অপরিশোধিত তেল খোলাবাজারে বিক্রি এবং অন্যান্য তেলের সঙ্গে ভেজাল মিশিয়ে বাজারজাত করা সম্পূর্ণ বেআইনি ও জনস্বার্থবিরোধী। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কেউ কেউ দায় এড়ানোর যে চেষ্টা করছেন, তা হতাশাজনক। ডিজিটাল নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার অজুহাত তুলে এ ধরনের চুরি ও পাচার অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। এর সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত সবাইকে চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। এটি একটি উদাহরণ মাত্র। রাষ্ট্রীয় সম্পদ জ্বালানি তেল চুরি ও পাচারের আরও বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে।
জানা যায়, প্রতিদিন কর্ণফুলীতে প্রায় ৫০ হাজার লিটার চোরাই তেল বেচাকেনা হয়। রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হলেও সিন্ডিকেটের কাঠামোতে প্রকৃত কোনো পরিবর্তন আসেনি, শুধু নিয়ন্ত্রণের হাতবদল হয়েছে। এমনকি পতেঙ্গার গুপ্তাখাল এলাকা এবং কর্ণফুলীর বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে গোপন ডিপো। এসব স্থানে মাটির নিচে ট্যাংকে তেল সংরক্ষণ করা হয় এবং সুবিধাজনক সময়ে বাজারজাত করা হয়
সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের কারণে দেশে জ্বালানি সংকট দেখা দেয়। এই সময় এ ধরনের চুরি ও পাচারের ঘটনা আরও বেড়ে যায়। অধিক লাভের আশায় প্রতিবেশী দেশেও আমাদের জ্বালানি তেল পাচার হয়ে যায়। এই পাচার ঠেকাতে শেষ পর্যন্ত সীমান্তে অতিরিক্ত বিজিবি মোতায়েন করার ঘটনাও ঘটে গত মার্চে। গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বসানো হয় অস্থায়ী চেকপোস্ট। এসব রুট দিয়ে বিশেষ করে ডিজেল ও পেট্রোল পাচার হয়। এ ছাড়া কর্ণফুলী নদী ও চট্টগ্রাম বন্দরেও গড়ে উঠেছে জ্বালানি তেল চোরাচালানের ‘অদৃশ্য সিন্ডিকেট ও সাম্রাজ্য’। দীর্ঘ আড়াই দশকেও তা নিয়ন্ত্রণে আসেনি। লাইসেন্স ও অনুমোদনের আড়ালে বৈধতার মোড়ক থাকলেও বাস্তবে এখানে চলছে সুসংগঠিত অবৈধ তেল-বাণিজ্য।
আমরা জানি, চট্টগ্রাম বন্দরকে কেন্দ্র করে দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার একটি বড় অংশ পরিচালিত হয়। রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) অধীন পদ্মা অয়েল, মেঘনা পেট্রোলিয়াম ও যমুনা অয়েল ডিপোর মাধ্যমে আমদানিকৃত জ্বালানি তেল সারা দেশে সরবরাহ করা হয়। এই পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি স্তর—মাদার ভেসেল থেকে লাইটার জাহাজ, ডিপো থেকে ট্যাংকার, রেল ওয়াগন ও নদীপথ—একাধিক ধাপে চুরির সুযোগ তৈরি করে নিয়েছে সেই সিন্ডিকেট। ২০০ লিটারের প্রতিটি ড্রামে গড়ে ১৫ থেকে ২০ লিটার অতিরিক্ত তেল ভরে সরিয়ে নেওয়ার যে অভ্যন্তরীণ কৌশল দীর্ঘদিন ধরে চালু রয়েছে, তা বন্ধ করা জরুরি।
জানা যায়, প্রতিদিন কর্ণফুলীতে প্রায় ৫০ হাজার লিটার চোরাই তেল বেচাকেনা হয়। রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হলেও সিন্ডিকেটের কাঠামোতে প্রকৃত কোনো পরিবর্তন আসেনি, শুধু নিয়ন্ত্রণের হাতবদল হয়েছে। এমনকি পতেঙ্গার গুপ্তাখাল এলাকা এবং কর্ণফুলীর বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে গোপন ডিপো। এসব স্থানে মাটির নিচে ট্যাংকে তেল সংরক্ষণ করা হয় এবং সুবিধাজনক সময়ে বাজারজাত করা হয়। তাই এসব স্থানে নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডের নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা জরুরি।
আজকাল জ্বালানিকে মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার অংশ হিসেবে যেকোনো ধরনের জ্বালানি তেল চুরি ও পাচারকারীদের কঠোর হাতে দমন করাই বাঞ্ছনীয়।













