সম্প্রতি দেশে এইচআইভি/এইডস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যায় উদ্বেগজনক ঊর্ধ্বগতি দেখা দিয়েছে। এটা কেবল জনস্বাস্থ্যের জন্য নয়, বরং আমাদের সামাজিক কাঠামোর জন্যও এক গভীর বিপদসংকেত। বিগত চার বছরের রেকর্ড ভেঙে এইডস রোগীর সংখ্যা এবার দ্বিগুণ; কোনো কোনো জেলায় কয়েক গুণ পর্যন্ত। এই নীরব মহামারি যেন সমাজকে গ্রাস করতে চাইছে গোগ্রাসে!
দেশের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে এইডস বেশি ছড়াচ্ছে বলে জানা যায়। যশোর জেলায় চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত ৪০ জনেরও বেশি এইচআইভি আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ২৫ জনই শিক্ষার্থী। গত বছর এই সংখ্যা ছিল মাত্র ১২ জন। আক্রান্ত শিক্ষার্থীদের বয়স ১৭ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে, যা তারুণ্যের ভবিষ্যেক ফেলে দিচ্ছে প্রশ্নের মুখে।
একইভাবে, রাজশাহীতে গত চার বছরের রেকর্ড ভেঙে চলতি বছরের ১০ মাসে নতুন ২৮ জনের শরীরে এইচআইভি ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১৭ জনই সমকামী সম্পর্কের মাধ্যমে সংক্রমিত হয়েছেন। এই প্রবণতা সমাজের জন্য নিঃসন্দেহে এক নতুন বিপজ্জনক বার্তা। সমকামিতার মাধ্যমে ক্রমবর্ধমান এই সংক্রমণ সমাজের চিরাচরিত মূল্যবোধকে বিতর্কিত করছে। এই অপসংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে।
সিরাজগঞ্জের অবস্থা আরো ভয়াবহ। এ জেলায় চলতি বছর ২৫৫ জনের শরীরে এইচআইভি ভাইরাস পাওয়া গেছে, যাদের মধ্যে ১৮৭ জন মাদকসেবী এবং ৩৫ জন স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থী। ২০২০ সালে যেখানে এই সংখ্যা ছিল মাত্র চার জন। পরিস্থিতি কতটা নাজুক, অনিয়ন্ত্রিত, তা সহজেই অনুমেয়।
এদিকে, খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, গেল চার বছরে প্রায় ৪ হাজার মানুষের রক্ত পরীক্ষা করে এইচআইভি শনাক্ত হয়েছে ২৪৯ জনের শরীরে। বলা বাহুল্য, এই রোগ যেন জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এইচআইভি ভাইরাস মূলত অরক্ষিত যৌনমিলন, সমকামিতা এবং ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদকসেবনের ফলে ছড়িয়ে পড়ছে। পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে অবৈধ পথে আসা মাদক ইনজেকশন দিয়ে সেবন করার মাধ্যমে এইচআইভির সংক্রমণ ঘটছে। সংক্রমণের আরেক গুরুত্বপূর্ণ পথ হলো রক্ত সঞ্চালন (ব্লাড ট্রান্সফিউশন)। এছাড়া, আক্রান্ত মায়ের দুধ পান করার মাধ্যমে শিশুর শরীরেও এই ভাইরাস ছড়াচ্ছে।
উদ্বেগের বিষয় হলো, আক্রান্তদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশই স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী। এ নিয়ে স্বভাবতই অভিভাবকদের চিন্তার শেষ নেই। তরুণ-তরুণীদের মধ্যে এইচআইভি নিয়ে প্রয়োজনীয় সচেতনতার অভাব এবং উঠতি বয়সে কৌতূহলবশত ঝুঁকিপূর্ণ যৌনাচার বা মাদকসেবনের মতো কাজে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। এই অসচেতনতাই তাদের নীরব শিকার বানাচ্ছে।
এই ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং সামাজিক বিপর্যয় এড়াতে কালক্ষেপণ না করে জরুরি ও সম্মিলিত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা অপরিহার্য। এই লক্ষ্যে অবিলম্বে জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। বিশেষ করে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পাঠ্যক্রমের অংশ হিসেবে এ বিষয়ে সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে তরুণ-তরুণীরা নিরাপদ জীবনধারা, ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ পরিহার এবং সুরক্ষা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পায়। একই সঙ্গে, মাদক নিয়ন্ত্রণে সত্বর কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি জীবন রক্ষাকারী রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়াকে নিরাপদ করার বিষয়ে জোর দিতে হবে। সামাজিক স্তরে অবাধ যৌনাচার বন্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলাসহ অভিভাবকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। কেবল সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই এই মরণব্যধি প্রতিরোধ করা সম্ভব। আসুন, সচেতন হই। নিজে বাঁচি, অন্যকে বাঁচাই।













