গত বছর এই সময় জো বাইডেন ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। কাতারের দোহায় ইসরাইল এবং হামাসের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ও জিম্মি মুক্তি চুক্তির চূড়ান্ত আলোচনায় সবাই ব্যস্ত। সেসময় ট্রাম্পের পক্ষের লোকজনও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছিল, যা অনেককে বিস্মিত করে। বলা বাহুল্য, জিম্মিদের মুক্ত করতে এবং গাজা যুদ্ধ শেষ করার জন্য এটি ছিল এক বিরল নির্দলীয় ঐক্য। তবে এখন মনে হচ্ছে, তা যেন বছর নয়, বরং এক দশক আগের কথা! ঠিক এভাবেই ২০২৫ সাল আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে যে, মাত্র এক বছরেই অনেক কিছু ঘটা সম্ভব।
সব মিলিয়ে বিদায়ি ’২৫ সালকে কেবল পরিবর্তনের বছর নয়, বরং আমূল রূপান্তরের বছর হিসেবে অভিহিত করতে হয়। আর এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সাল বিশ্বরাজনীতির অ্যাজেন্ডায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মোড় বা একটি ‘হিঞ্জ ইয়ার (সন্ধিক্ষণ)’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে!
প্রথমেই বলতে হয় ভেনিজুয়েলার অচলাবস্থার কথা। ট্রাম্প প্রশাসন স্নায়ুযুদ্ধের পর ক্যারিবীয় এবং পশ্চিম আটলান্টিকে বৃহত্তম নৌবহর মোতায়েন করেছে। এখানে ট্রাম্পের লক্ষ্য কী, তা এখনো অস্পষ্ট। ভাবগতি দেখে এটিকে সামরিক শক্তির ওপর ভিত্তি করে ‘শাসন পরিবর্তন’ (রেজিম চেঞ্জ) নীতির মতো মনে হচ্ছে। হোয়াইট হাউজ সম্ভবত আশা করছে যে, ভেনিজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরো স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছেড়ে রাশিয়া বা অন্য কোথাও চলে যাবেন। জানা গেছে, ট্রাম্প সরাসরি এমন দাবিই জানিয়েছেন। অবশ্য এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা কম। মাদুরোর মতো নেতাকে কেবল অর্থনৈতিক চাপ এবং বাহ্যিক হুমকির মাধ্যমে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করার দৃষ্টান্ত ইতিহাসে খুব কমই আছে।
যাহোক, ২০২৬ সালে মাদুরোর ভাগ্যই সব প্রশ্নের উত্তর দেবে। তিনি যদি ক্ষমতায় টিকে থাকেন, তাহলে ট্রাম্পের হুঙ্কারকে কেবল ‘কথার কথা’ হিসেবে দেখার ঝুঁকি তৈরি হবে। আর যদি তিনি ক্ষমতা থেকে পড়ে যান, তাতে করে এ গোলার্ধের প্রধান শাসক হিসেবে ট্রাম্পের গুরুত্ব নিয়ে কারোরই কোনো সন্দেহ থাকবে না।
’২৬ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ পঞ্চম বছরে গড়াচ্ছে। পুতিনের প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল কিয়েভ দখল করা এবং একটি সার্বভৌম দেশ হিসেবে ইউক্রেনকে ধ্বংস করা। আজ তার বাহিনী রাশিয়ার সীমান্তের খুব কাছে পূর্ব ইউক্রেনে আটকা পড়ে আছে এবং তাদের ১০ লাখেরও বেশি লোক হতাহত হয়েছে। ইউক্রেনের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি এই যুদ্ধ রাশিয়ার জন্যও একটি বিপর্যয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এর পরও পুতিনের পিছু হটার কোনো লক্ষণ দেখাচ্ছেন না। অবশ্য তার লক্ষ্য এখন আগের চেয়ে সীমিত।
’২৬ সালে, তথা যুদ্ধের পঞ্চম বছর ‘একটি সন্ধিক্ষণ’ হতে পারে। কারণ, দীর্ঘ লড়াইয়ে স্বাভাবিকভাবেই যুদ্ধরত পক্ষগুলো ক্লান্ত হয়ে পড়ে অথবা অচলাবস্থা ভাঙতে ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ নেয়। নিজেকে ইতিহাসের ছাত্র বলে দাবি করা পুতিন সম্ভবত আগামী বছরটিকে ইউক্রেনের মনোবল ভেঙে দেওয়ার সুযোগ হিসেবেই দেখছেন। যদিও ইউক্রেনে আজ কোনো পক্ষই বড় কোনো সাফল্যের অবস্থানে নেই। এই অর্থে, পঞ্চম বছরটিও গত চার বছরের মতোই মনে হতে পারে, যেখানে দেখা যাবে—পুতিন ধাপে ধাপে সীমিত এলাকা দখলের জন্য তার সেনাদের একটি ‘মাংস পেষার যন্ত্রের মধ্যে’ ঢেলে দিচ্ছেন, আর ইউক্রেন তার পশ্চিমা সহযোগীদের দিকে অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তার জন্য তাকিয়ে আছে। অবশ্য একটি শান্তিচুক্তির চেষ্টা করা হচ্ছে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য। সব মিলিয়ে যুদ্ধের এই পঞ্চম বছরটি সত্যিই নির্ণায়ক হয়ে উঠতে পারে।
নতুন বছরে তাকাতে হবে তাইওয়ানের দিকেও। ’২৫ সালের একটি চোখধাঁধানো চিত্র ছিল বেইজিংয়ের মাটিতে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং উনের বন্ধুসুলভ আলিঙ্গন, যার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট। এই চার দেশ ইউক্রেনে রাশিয়াকে সমর্থন করতে একসঙ্গে কাজ করছে। শুধু তা-ই নয়, তারা একটি বিভক্ত বিশ্বের রূপরেখা আঁকছে, যেখানে রাশিয়া ও চীন তাদের তথাকথিত প্রভাব বলয়ে ছড়ি ঘোরাবে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ঠেলে দেবে পেছনের দিকে।
ট্রাম্প গত সপ্তাহে তাইওয়ানের জন্য ইতিহাসের বৃহত্তম অস্ত্র প্যাকেজ অনুমোদন করেছেন, যার মূল্য প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে, চীন ২০২৭ সালের মধ্যে তাইওয়ান আক্রমণের জন্য তাদের সামরিক বাহিনীকে প্রস্তুত করছে বলে জানা গেছে। সন্দেহ নেই, তাইওয়ান মার্কিনদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ফলে চীন যদি দ্বীপটি আক্রমণ করে কিংবা অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করে, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় ১০ ট্রিলিয়ন ডলার ক্ষতির আশঙ্কা থেকে যায়। সার্বিক পর্যবেক্ষণে তাইয়ান সম্পর্কে বলতে হয়, ’২৬ সালে এই ভূখণ্ড টেবিলে (আলোচনায়) না থাকলেও, মেনুতে (খাবার হিসেবে) থাকবে।
’২৬ সালেও যথারীতি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে থাকবে ‘ইসরাইল’। সামরিক সাফল্যের দিক থেকে ইসরাইলের জন্য এ বছরটি বেশ ভালোই ছিল। যদিও দেশটি তার সামরিক সাফল্যকে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অর্জনে রূপান্তর করতে ব্যর্থ হয়েছে। ২০২৬ সালে তেলআবিব নতুন কী সুযোগ সৃষ্টি করে, সবার চোখ থাকবে সেদিকে। বিশেষ করে, আগামী বছরের ২৬ অক্টোবর ইসরাইলে সংসদীয় নির্বাচন অনেক প্রশ্নের উত্তর দেবে।
নতুন বছরে ইরান পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটাতে চাইবে। ইরানের জন্য গত বছরটি ছিল ভয়াবহ এবং ’২৬-এ তা আরো খারাপ হতে পারে। কিছুদিন আগেও ইরান হিজবুল্লাহ, হামাস, ইরাকি মিলিশিয়া এবং হুতিদের মতো প্রক্সি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে শক্তি ও প্রভাবের দাবি করত। আজ সেই দৃশ্যপট অনেকটা উলটে গেছে। উপরন্তু, দেশটি সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু। এই অর্থে, তেহরানের জন্য ২০২৬ সাল হবে পরীক্ষার বছর।
এ বছর বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবাদের প্রত্যাবর্তন ঘটেছে। সম্প্রতি অনেকগুলো ঘটনা ঘটেছে, যার রেশ বয়ে যাবে নতুন বছর জুড়েও। পাশাপাশি থাকবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তাণ্ডব। বিশ্বরাজনীতিতে এআইয়ের মতো এতটা দ্রুত আর কোনো বিষয় পরিবর্তন বয়ে আনেনি। ফলে যুদ্ধবিগ্রহের পাশাপাশি ’২৬ সালে এআইয়ের হাত ধরে বিশ্ব কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, সবার দৃষ্টি সেদিকে।













