বাংলাদেশের রাজনীতি এক অনিশ্চিত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দীর্ঘদিনের ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক কাঠামোর পতনের পরে ভবিষ্যৎ রাজনীতির রূপ কেমন হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন বিএনপি তথা জাতির জন্য নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক ঘটনা।
দীর্ঘ ১৮ বছর লন্ডনে নির্বাসনে থাকার পরে দেশে ফিরে আসা তারেক রহমানের জন্য কেবল স্বদেশ প্রত্যাবর্তন নয়, বরং এক কঠিন পরীক্ষার সূচনা। তাঁর ফিরে আসাকে ঘিরে মানুষের মধ্যে যে রাজনৈতিক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, সেখানে যেমন সম্ভাবনা রয়েছে, তেমনি রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জও। তারেক রহমানের ফিরে আসায় দেশের রাজনীতির পালে নতুন হাওয়া লেগেছে; দেশজুড়ে বিএনপি’র কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে নতুন উদ্দীপনা। তবে প্রশ্ন থেকে যায় – এই প্রত্যাবর্তন কি শুধু আবেগের জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি এটি কার্যকর সাংগঠনিক পুনর্গঠনে কার্যকরী ভূমিকা রাখবে?
আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় নির্বাচন। ৩০০ আসনে সাধারণ নির্বাচনের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন সংক্রান্ত গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে। এই পরিস্থিতি তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনকে রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে এবং তার সামনে অপেক্ষা করছে একাধিক চ্যালেঞ্জ। সাম্প্রতিক সময়ে, বিএনপির বিভিন্ন এলাকায় মনোনয়ন নিয়ে বিরোধ, গ্রুপিং এবং সংঘর্ষ বৃদ্ধি পেয়েছে। নির্বাচনে দলের বিজয়ের সম্ভাবনা দেখে নিজেদের মধ্যেই প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছেন দলের প্রার্থীরা। বিএনপিকে দীর্ঘদিন জোরপূর্বক রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে রাখার অপচেষ্টা করেছে গত ফ্যাসিস্ট সরকার। যে কারণে স্বাভাবিকভাবেই কিছু ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে বিএনপির ঐক্য ও ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থার সক্ষমতা ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
নেতৃত্বের সংকট এবং মনোনয়ন কেন্দ্রিক দ্বন্দ্বের পাশাপাশি দলীয় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা তাই তারেক রহমানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকায় মনোনয়ন নিয়ে বিরোধ এবং গ্রুপিং সামাল দেয়া এবং একইসাথে দলের সার্বিক কার্যক্রম নিয়ে জনমনে আস্থা ফেরানো একটি দীর্ঘমেয়াদি কাজ। এক্ষেত্রে, তাঁর প্রথম দায়িত্ব হচ্ছে, দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল মিটিয়ে নেতৃত্ব পুনর্গঠন এবং তৃণমূল পর্যন্ত শৃঙ্খলা জোরদার করা। বিএনপি রাজনৈতিকভাবে পুনরুত্থানের সঠিক পথেই রয়েছে। তবে নেতৃত্ব, দলীয় শৃঙ্খলা, আইনগত ও নৈতিক স্বচ্ছতা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার প্রস্তুতি এখনও কিছুটা অসম্পূর্ণ। দলের জন্য তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ: দলীয় শৃঙ্খলা ও ঐক্য প্রতিষ্ঠা; আইনি ও নৈতিক প্রশ্নে স্পষ্ট অবস্থান এবং রাষ্ট্র পরিচালনার একটি বিশ্বাসযোগ্য রূপরেখা। এই তিনটি দিক ছাড়া সুশাসন নিশ্চিত করা কঠিন হবে।
বিএনপির রাজনীতিতে আইনি ও নৈতিক প্রশ্ন সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে এসেছে। রাজনৈতিক বৈধতা শুধু নির্বাচন দিয়ে আসে না; আসে স্বচ্ছতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতার মধ্য দিয়ে। বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন স্বচ্ছতা ও নৈতিকতার প্রশ্নে তাঁর নানা উদ্যোগ প্রশংসিত হয়েছে। এখন তারেক রহমানের নেতৃত্বে আইনি ও নৈতিক প্রশ্নে দলের অবস্থান নিয়ে নির্বাচনকে সামনে রেখে জনমনে আস্থা তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ। আর আইনি ও নৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো কেবল দলীয় সম্মিলন বা রাজনৈতিক প্রস্তুতির বিষয় নয়; এগুলো রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে রাজনৈতিক স্বচ্ছতা এবং আইনি ন্যায়বিচারের মান নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
নির্বাচনে বিএনপি’র প্রধান প্রতিপক্ষ জামায়াতে ইসলাম। রাজনৈতিক অঙ্গনে দলটির অবস্থান আগের চেয়ে শক্তিশালী। বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচনে শিবিরের জয় এবং ছাত্র সংগঠনগুলোতে প্রভাব বৃদ্ধি এর পেছনে অন্যতম ভূমিকা রেখেছে। এছাড়াও, দলটি সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিজেদের দুর্নীতিবিরোধী ও কল্যাণমুখী দল হিসেবে উপস্থাপনের জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, সামাজিক মাধ্যমে বিএনপিকে দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে প্রচার করছে। এ বিষয়ে নিজেদের অঙ্গীকার নিয়ে বিএনপি’র আরও বেশি জনগণের সাথে সম্পৃক্ত হওয়া প্রয়োজন; এবং এক্ষেত্রে, তারেক রহমানকে কেবল দলের অভ্যন্তরীণ সমন্বয়েই নয়, বৃহত্তর রাজনৈতিক মঞ্চে বিএনপি -কে একটি বিশ্বাসযোগ্য, সংগঠিত এবং ন্যায়বিচারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তীতে যে রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি হয়েছিল, তা ন্যায্য সিদ্ধান্তে রূপান্তরিত করতে না পারার ব্যর্থতা জাতিগতভাবে সবার ওপর বর্তায়। এক্ষেত্রে, নেতৃত্বের যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, সার্বিক বিবেচনায় তারেক রহমানেরই সে প্রস্তুতি ও যোগ্যতা রয়েছে তা পূরণের। তারেক রহমানকে মনে রাখতে হবে, এই সুযোগের সাথে দায়বদ্ধতা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দেশের নাগরিকেরা আস্থা রেখেছেন তার ওপর, এ আস্থা ধরে রাখার দায়িত্ব তারই।
এছাড়া সংস্কার তখনই বাস্তবায়ন সম্ভব হবে, যখন সুসংহত দিক-নির্দেশনার মাধ্যমে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা হবে – যেখানে একাত্তর ও চব্বিশ নিয়ে কোন বিরোধ থাকবে না; যেখানে মত বা ধর্মের নামে কোন নৈরাজ্য হবে না; এবং যেখানে অন্যায়, দুর্নীতি, বৈষম্য ও সহিংসতার বিরুদ্ধে বৃহত্তর পরিসরে সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে। এ প্রেক্ষাপটে, তারেক রহমানই পারেন রাজনৈতিক, আর্থিক ও সামাজিক পরিচয় নির্বিশেষে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে।
অতএব, তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনাই নয়; একে বলা যেতে পারে বাংলাদেশের রাজনীতির নতুন অধ্যায়। বাংলাদেশের রাজনীতি এখন অত্যন্ত সংবেদনশীল অবস্থানে রয়েছে। এ অবস্থায় তারেক রহমানের সুদূরপ্রসারী ও শক্তিশালী নেতৃত্ব গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশের ভবিষ্যতের দিক নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা রাখি। মনে রাখতে হবে তিনি শুধু বিএনপি’রই কাণ্ডারি নন, দেশ ও মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে তিনি জনগণের প্রত্যাশা ও আস্থার প্রতীক।













