বর্তমান বাংলাদেশ এক কঠিন রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা কাঠামো পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। সৃষ্টি হয়েছে বিশাল এক রাজনৈতিক শূন্যতা। জুলাই বিপ্লব পরবর্তীতে প্রায় দেড় বছর পার হলেও এখনো একটি সুসংহত ও আস্থাভিত্তিক রাজনৈতিক কাঠামো দাঁড়ায়নি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এই সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়ভার প্রশাসনিকভাবে চললেও রাজনৈতিক দিকনির্দেশনার প্রশ্নটি অনিশ্চিত রয়ে গেছে। এমন এক ক্রান্তিকালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ঠিক এমনই সময়ে দেশের হাল ধরতে নিজ মাতৃভূমি বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা দিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আজ ২৫শে ডিসেম্বর তিনি দেশে ফিরছেন।
বলতে গেলে, দীর্ঘ দেড় দশকের স্বৈরাচারী শাসনামলে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় ধ্বংস হয়ে পড়েছে। জনগণের অধিকার আদায়ে বিএনপি ও তার সহযোগী দলগুলো বছরের পর বছর রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে। একটি অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণার মাধ্যমে অবশেষে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন পূরণ হওয়ার পথে। তবে নির্বাচন পরবর্তী বাংলাদেশের রূপরেখা নিয়ে জনমনে এখনও আশঙ্কা রয়ে গেছে। তাই নানাবিধ কারণেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন তারেক রহমান। দীর্ঘ ১৭ বছরের বেশি সময় পর যুক্তরাজ্য থেকে তারেক রহমানের এই প্রত্যাবর্তন জনমনে স্বস্তি দিয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিএনপি একটি স্বতন্ত্র জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দর্শন ও রাষ্ট্রচিন্তার প্রতিনিধিত্ব করে। সফল কূটনীতির সূচনা, বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, সংসদীয় ব্যবস্থার বিকাশ, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের বিকেন্দ্রীকরণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিএনপির অবদান ইতিহাসস্বীকৃত। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় শক্তিশালী একটি মধ্যপন্থী ও জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক শক্তির প্রয়োজন সব সময়ই ছিল। বিএনপিই সেই প্রয়োজনীয়তা পূরণ করেছে। বর্তমানে অস্থিতিশীল বিশ্বরাজনৈতিক ব্যবস্থায় সেই প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি আকারে দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে একটি শক্তিশালী ও প্রকৃত জাতীয়বাদী শক্তির ব্যাপক প্রয়োজনীয়তা জনমনে উপলব্ধ হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ভারসাম্যপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিএনপিকেই গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের সবচেয়ে উপযোগী দল হিসেবে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। আর এই প্রশ্নে তারেক রহমানের স্পষ্ট নেতৃত্ব ও সুসংহত দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তাঁকে এক বিকল্পহীন রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে মনে করা হচ্ছে।
দলটির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্ব, উনিশ দফা কর্মসূচি, সার্ক প্রতিষ্ঠার ধারণা, কৃষি উন্নয়ন ও প্রবাসী শ্রমবাজার উন্মোচন ইত্যাদি বাংলাদেশের আধুনিক রাষ্ট্রগঠনের মৌলিক ভিত্তি তৈরি করেছে, যা আজও জনগণকে বিএনপির প্রতি আকৃষ্ট করে। একইভাবে আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম, রাজনৈতিক চাপের মুখেও তাঁর দৃঢ়তা এবং জনগণের প্রতি নিঃশর্ত দায়বদ্ধতা তাঁকে জাতীয় নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। গৃহবন্দী থাকা সত্ত্বেও তিনি গণতন্ত্রের পক্ষে অবস্থান বদলাননি বরং তাঁর দৃঢ় অবস্থান জনগণের আস্থাকে আরও গভীর করেছে। আবার বর্তমানে সংবিধান ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার গণতান্ত্রিক সংস্কার এবং অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে রাষ্ট্র মেরামতে ৩১ দফা নিয়ে কাজ করছে বিএনপি। তারেক রহমানের নির্দেশনা মোতাবেক সেই রাষ্ট্র মেরামতের কর্মসূচি সফল হবে বলে আমরা আশা করি।
প্রবাসে থেকেও বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো ধরে রাখা ও রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখা ইত্যাদি তাঁকে একজন কৌশলী রাজনৈতিক সংগঠকে পরিণত করেছে। তাই বর্তমানে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির প্রশ্নে তারেক রহমান এক কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে উঠে এসেছেন। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, বাংলাদেশ আজ রাজনৈতিক মেরুকরণ, আস্থাহীনতা, দলীয় বিভাজন ও গণতন্ত্রের সংকটে চরমভাবে আক্রান্ত। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মধ্যে আস্থার ঘাটতি স্পষ্ট। মতানৈক্য যেন ক্রমেই বাড়ছে। এই ধারা ভাঙতে না পারলে কোনো সংস্কারই টেকসই হবে না। ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রনায়কদের জন্য এটি একটি কঠিন বাস্তবতা। বর্তমানে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে রাজনৈতিক সহনশীলতা, সংলাপ ও ঐকমত্যের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে তারেক রহমানের বিকল্প নেই।
বর্তমানে বাংলাদেশ এমন এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও শিল্প খাত একসঙ্গে চাপে রয়েছে। এই বহুমাত্রিক সংকট ভবিষ্যতে বিএনপির সামনে অত্যন্ত বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উপস্থিত হবে। তবু তারেক রহমান জনগণের সক্রিয় সমর্থন ও জাতীয় ঐক্যের শক্তির মাধ্যমেই এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব বলে আমরা আশাবাদী। ইতিমধ্যে সুযোগের সমতা নিশ্চিত করে শিক্ষাকে শ্রমবাজার ও প্রযুক্তিগত বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা, স্বাস্থ্য খাতে প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা, জনস্বাস্থ্যভিত্তিক সেবামডেল এবং সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করছেন তারেক রহমান।
দেশকে ভেতর থেকে স্থিতিশীল করা এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশকে নতুনভাবে পরিচিত করিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তারেক রহমানের বিকল্প নেতৃত্ব আপাতত দৃশ্যমান নয়। তাই তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন কেবল একজন নেতার দেশে ফেরা নয়, এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে সম্ভাব্য এক বড় মোড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত। এই প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়েই দেশের রাজনৈতিক গতিপথ নতুনভাবে নির্ধারিত হতে চলেছে। এজন্য রাষ্ট্রকে তাঁর সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং পাশাপাশি দলীয় নেতাকর্মীদেরও সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।













