ঈশ্বর আমাদের কাছে কী চান? আমরা তাকে কী দেব? পবিত্র বাইবেলের পুরাতন ও নতুন নিয়মে এ প্রসঙ্গে অনেক শিক্ষা আছে। পাপের অধীনে চলে যাওয়া ঈশ্বরের সৃষ্টিকে নতুন করার জন্য ঈশ্বর তার একজাত পুত্র যিশুখ্রিষ্টকে এ জগতে পাঠিয়েছেন। খ্রিষ্ট এসেছেন এ জগতকে পরিবর্তন করার জন্য। সেজন্য তিনি আমাদের জীবনকে পরিবর্তন করেন, যেন সেই পরিবর্তিত জীবন নিয়ে আমরা নিজেরাই এ জগতে কাঙ্ক্ষিত ইতিবাচক পরিবর্তন করতে পারি। বাইবেলে বলা হয়েছে : ‘যে পাপাচরণ করে, সে দিয়াবলের; কেননা দিয়াবল আদি হইতে পাপ করিতেছে, ঈশ্বরের পুত্র এই জন্যই প্রকাশিত হইলেন যেন দিয়াবলের কার্য সব লোপ করেন (১ যোহন ৩:৮) ‘
মানুষের কাছে ঈশ্বর যা চান, সে বিষয়ে পুরাতন নিয়মে খ্রিষ্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দীতে কয়েক জন নবির মাধ্যমে অনেক শিক্ষা সুস্পষ্ট করেই উল্লেখ করেছেন। তাদের মধ্যে মিখা, হোশেয়, আমোষ, যিশাইয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ঐ ভাববাদীগণ প্রাচীন ইসরাইল জাতিসহ অন্য বিভিন্ন জাতির কাছে ঈশ্বরের শান্তি ও ন্যায্যতার পথে চলার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। তারা মানুষকে অন্যায়, অবিচার ও সব ধরনের ভ্রষ্টতা ও পাপের পথ পরিহার করে সততা, ন্যায্যতা ও মানবীয় গুণাবলি নিয়ে ঈশ্বর ও মানুষের সঙ্গে সঠিক সম্পর্কে বাস করার আহ্বান দিয়েছেন। যেমন মিখা ভাববাদীর মাধ্যমে আমরা এ কথা শুনতে পাই—‘আমি কী লইয়া সদাপ্রভুর সম্মুখে উপস্থিত হইব, ঊর্ধ্বস্থ ঈশ্বরের সম্মুখে উপস্থিত হইব? আমি কি হোমবলি লইয়া, এক বর্ষীয় গোবত্সদিগকে লইয়া, তাহার সম্মুখে উপস্থিত হইব? সহস্র সহস্র মেষে অযুত অযুত তৈলপ্রবাহে কি সদাপ্রভু প্রসন্ন হইবেন?
আমি আপন অধর্মের নিমিত্ত কি আপনার প্রথমজাত পুত্রকে দেব? আমার প্রাণের পাপ প্রযুক্ত কি শরীরের ফল দান করিব? হে মনুষ্য, যাহা ভালো, তাহা তিনি তোমাকে জানাইয়াছেন; বস্তত ন্যায্য আচরণ, দয়ায় অনুরাগ ও নম্রভাবে তোমার ঈশ্বরের সহিত গমনাগমন, ইহা ব্যতিরেকে সদাপ্রভু তোমার কাছে আর কীসের অনুসন্ধান করেন? (মিখা ৬:৬-৮)।’ মানুষের কাছে ঈশ্বরের প্রথম দাবি ‘ন্যায্য আচরণ’। বাইবেলের শিক্ষায় ন্যায্যতা ও ধার্মিকতা একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। গীতাসংহিতা ৮৯:১৪-এ বলা হয়েছে—ঈশ্বরের সিংহাসনের ভিত্তি হলো ‘ধার্মিকতা ও ন্যায্যতা’; আর ‘দয়া ও সত্য’ তার পবিত্র শ্রীমুখ, অর্থাত্ তার অগ্রগামী ও পতাকাবাহী। ঈশ্বরের এই দয়ার অর্থ, আমরা যাকে দরিদ্রদের প্রতি ধনীর করুণা বলে বুঝি তেমন নয়। এর অর্থ দুর্বল মানুষের প্রতি ঈশ্বরের প্রেমের কাজ, ভালোবাসা প্রদর্শনের চিহ্ন।
মিখা ভাববাদীর মাধ্যমে ঈশ্বর বলেছেন, যেন মানুষে মানুষে সামাজিক ন্যায়বিচার থাকে, মানুষ যেন একে অন্যের প্রতি সহমর্মিতা ও প্রেমের সম্পর্কে বসবাস করে, আর মানুষ যেন অহংকারী না হয়। এ পৃথিবী তথা মহাবিশ্বের যিনি স্রষ্টা, ধারণকর্তা মালিক ও প্রতিপালক তার কাছে যেন নম্রতায় মানুষ জীবন যাপন করে। ঈশ্বরের সাক্ষাতে নম্রতার অর্থ এই, মানুষ যেন ঈশ্বরের সব সৃষ্টি ও সব মানুষের সঙ্গে শান্তি, প্রেম ও সত্ভাবে বাস করে। ন্যায্যতার অভাবে এ পৃথিবীতে যত অশান্তি, হানাহানি ও যুদ্ধ-বিগ্রহ। আমোষ ভাববাদীর সময়ে তার সমাজে ছিল সীমাহীন অন্যায় ও অবিচার। ধনী লোক একজোড়া জুতার বিনিময়ে একজন মানুষকে ক্রীতদাসরূপে ক্রয় করেছে সেকালে, ঘুষের জন্য বিচারক বিচার বিপরীত করেছে। তাই ভাববাদী বলেছেন, যেন সমাজে ন্যায়বিচার জলের মতো বাধাহীন হয়। আচার-অনুষ্ঠানসর্বস্ব লোক দেখানো ধর্ম-কর্ম ন্যায়বান ঈশ্বরের কাছে বড়ই অপছন্দনীয়। তাই সব মানুষের স্রষ্টা ঈশ্বর ও পরিত্রাতা যিনি, তিনি তার প্রবক্তার মাধ্যমে বলেছেন, ‘তোমরা আমার কাছে হোম ও নৈবেদ্য উত্সর্গ করিলে আমি তাহা গ্রাহ্য করব না এবং তোমাদের পুষ্ট পশুর মঙ্গলার্থক বলিদানেও দৃক্পাত করব না। আমার কাছ থেকে তোমার গানের গোল দূর করো, আমি তোমার নেবল-যন্ত্রের বাদ্য শুনব না। কিন্তু বিচার জলবত্ প্রবাহিত হোক, ধার্মিকতা চিরপ্রবহমান স্রোতের ন্যায় বহুক (আমোষ ৫:২১-২৪)।
যিশাইয় নবির পুস্তকের পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় আমরা দেখি—সমাজে দরিদ্র-দলিত-দুর্বল মানুষের ওপরে দুরাচারী মানুষের দৌরাত্ম্য ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে কঠিন বিচার ও দণ্ডের কথা :সদাপ্রভু বলছেন, তোমাদের বলিদানবাহুল্যে আমার প্রয়োজন কী?…সেসব আমার পক্ষে ক্লেশকর, আমি সেসব বহন করতে করতে পরিশ্রান্ত হয়েছি। তোমার অঞ্জরি প্রসারণ করিলে আমি তোমাদের থেকে আমার চক্ষু আচ্ছাদন করব; যদ্যপি অনেক প্রার্থনা করো; তথাপি শুনব না; তোমাদের হাত রক্তে পরিপূর্ণ। তোমরা নিজেদেরকে ধৌত করো; বিশুদ্ধ করো, আমার নয়ন গোচর ইইতে তোমাদের ক্রিয়ার দুষ্টতা দূর করো; কদাচরণ ত্যাগ করো, সদাচরণ শিক্ষা করো, ন্যায়বিচারের অনুশীলন করো, উপদ্রবী লোককে শাসন করো, পিতৃহীন লোকের বিচার নিষ্পত্তি করো, বিধবার পক্ষ সমর্থন করো (যিশাইয় ১:১০-১৭)। এ হলো ভ্রষ্ট মানুষের প্রতি ‘ভাববাদীর কণ্ঠস্বর’। মানুষের সব অন্যায় ও অপবিত্রতা সেদিন ধরা পড়েছিল দুর্বলের প্রতি অবহেলা ও তাদের স্বার্থপরতার মধ্য দিয়ে। পবিত্রতম ঈশ্বরের ধার্মিকতা অর্থাত্ ন্যায়পরায়ণতা ও অবহেলিত মানুষের প্রতি তার প্রেমের কথাই আমরা বাইবেলে বেশি দেখতে পাই। ঈশ্বর আমাদের কাছ থেকে মূল্যবোধরহিত ও অনুষ্ঠানসর্বস্ব ধর্ম-কর্ম চান না। তা যে ‘অনর্থক ঈশ্বরের নাম উচ্চারণ করার সমতুল্য’। মানুষের জন্য ধর্ম, ধর্মের জন্য মানুষ নয়। স্রষ্টা ঈশ্বর মানুষের পরিত্রাণের জন্য কেবল তার বাণী পাঠিয়েই তার কাজ শেষ করেননি; কিন্তু তিনি মানুষকে সম্মান করলেন, তাকে আপন করলেন তার কাছে তার মতো হয়ে আসার মাধ্যমে। পাপের রাজ্যে এসে তিনি জয় করলেন পাপকে। মানুষকে বা তার মানবীয় অধিকারকে কোনোভাবে অবহেলা করে আমরা ঈশ্বরকে সম্মান করতে পারি না। ঈশ্বরের প্রতিমূর্তি যে মানুষ আমাদের সামনে আছে, তাকে অপমান করে তার স্রষ্টাকে সম্মান করার কথা প্রচারের ভণ্ডামি থেকে ঈশ্বর যেন আমাদের রক্ষা করেন, এটাই হোক আমাদের বড় প্রার্থনা।
বাইবেলে বর্ণিত ঈশ্বরের সৃষ্ট সুন্দর বা ‘উত্তম’ সৃষ্টির কী অবস্থা এখন? আমাদের বস্তুবাদিতা ও ভোগ-দখলবাদী সভ্যতার কতটুকু আমাদের প্রকৃত শান্তি, স্বস্তি বা আনন্দ দিচ্ছে? প্রকৃতি ও পরিবেশদূষণ, পৃথিবীব্যাপী জলবায়ুর ক্ষতিকর পরিবর্তন সব প্রাণিজগেক ভয়াবহ এক পরিণতির পথে নিয়ে যাচ্ছে। আমাদের সব বৈষয়িক উন্নয়নের প্রচেষ্টা ও তার কারণে শ্রেষ্ঠ সব অস্থিরতা সব শান্তিই যে কেড়ে নিচ্ছে দিন দিন! আমাদের এখন অবশ্যই বুঝতে হবে যে, আমরা ঈশ্বরের সৃষ্টির কেবল ভোক্তা তা-ই নয়। আমাদের দায়িত্ব আছে, যেন আমরা ঈশ্বরের সৃষ্টির সবকিছুকেই আমাদের অতি আপন জ্ঞানে যত্ন করি, সবকিছুকেই সম্মান করি। খ্রিষ্ট এ জগতে এসেছিলেন আমাদের জীবনকে সব পরাধীনতার অন্ধকার থেকে মুক্ত করতে। সাধু যোহন যেমন বলেছেন :‘ঈশ্বরের পুত্র এই জন্যই প্রকাশিত হইলেন, যেন দিয়াবলের কার্যসব লোপ করেন (১ যোহন ৩:৮)।’ বড় পরিতাপের বিষয় এই যে, এই জগতে অপবিত্রতা, অন্যায় ও ধ্বংস বা বিনাশের কাজ বা শক্তি যেন অনেক বেশি। আমরা যেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে অনেকেই প্রতিবাদটি করতেও এগিয়ে যেতে চাই না। তাই অন্যায় বেড়ে যায়; বিশ্বাস সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। আমরা যদি সত্যিই খ্রিষ্টের হই, তাহলে আমাদের একটা বড় কাজ হবে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা। আগে বলা হয়েছে, বাইবেলের সর্বত্রই অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আছে। কিন্তু আজ অনেক সময় সত্যের, ন্যায্যতার পক্ষে অধর্মের প্রতি ‘ধিক্কার’ দিতে ভুলে গেছি। যিশাইয় ৫ অধ্যায়, মথি ২৩ অধ্যায়, ইত্যাদি দেখুন কোথায় কোথায় ঈশ্বর তথা খ্রিষ্ট ধিক্কার দিয়েছেন। আমাদের ঈশ্বর প্রতিকারের ঈশ্বর, কারণ তিনি প্রতিবাদের ঈশ্বর। অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের একটা উক্তি এরূপ :‘The world will not be destroyed by those who do evil, but by those who watch them without doing anything.’ সমাজে দৃশ্যমান ন্যায্যতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষকে ঈশরপ্রদত্ত মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে দাঁড়াতে হবে, চলতে হবে পথ।













