ময়মনসিংহের ভালুকায় গত ১৮ ডিসেম্বর অসত্য অযুহাতে দীপুচন্দ্র দাস নামক এক সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষিত যুবককে থানা-পুলিশের সামনে থেকে ধরে নিয়ে প্রথমে বেদম পিটিয়ে, পরবর্তীতে গাছে ঝুলিয়ে আগুনে পুড়িয়ে পৈচাশিক উল্লাসে হত্যা করেছে একদল উগ্রবাদী তথাকথিত ‘তৌহিদী জনতা’! কী নির্মম মধ্যযুগীয় নিষ্ঠুরতা? কোনো স্বাধীন সভ্যদেশে এমন নৃশংস অমানবিকতা কল্পনা করা যায়! কিন্তু এখানে এমনই ঘটছে নির্বিঘ্নে এবং নিরদ্বিধায়।
পুলিশ সেদিন দিবাগত রাত আড়াইটায় দীপুর অর্ধদগ্ধ লাশ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য মর্গে পাঠায়। কিন্তু উগ্রবাদী ‘জনতা’র হাত থেকে দীপুকে রক্ষা-নিরাপত্তার বাস্তব উদ্যোগ নিতে পালনে কেন ব্যর্থ হয়েছে, সে প্রশ্ন মুলতবি রাখা কঠিন! তবে লক্ষ্যণীয়, তথাকথিত তৌহিদী জনতার বিকারগস্ত মানসিকতা দেশের শান্তি প্রিয় নাগরিকদের জন্য কতোটা গভীর উদ্বেগজনক এবং বিপদজনক!
দীপু দাস তারাকান্দা উপজেলার মোকামিয়াকান্দা গ্রামের বাসিন্দা রবিচন্দ্র দাসের পুত্র । তিনি জামিরদিয়া এলাকার পাইওনিয়ার নিটওয়্যারস বিডি লিমিটেড কারখানার একজন চাকুরীজীবি। কারখানার উৎপাদন বৃদ্ধি নিয়ে পূর্ববিরোধের জেরে দীপুরই সহকর্মী সহকারী সুপারভাইজার তারেকের নেতৃত্বে ও পরিকল্পনাতেই এই অনুভূতিতে কথিত আঘাতের প্রচার এবং হত্যা বলে বিভিন্ন সূত্রে প্রকাশ।
তবে দুঃখে ও আতঙ্কের মধ্যেও একটু আশার কথা, এই সংঘটিত নির্মম হত্যায় সম্পৃক্তের মধ্যে ১২ জনকে বিভিন্ন স্থান থেকে ইতিমধ্যে আটক করেছে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী। এর জন্য মিডিয়ার ভূমিকা, মানবাধিকার সংগঠন ও দেশি-বিদেশি সংস্থার চাপ অব্যাহত বলেই সরকার-প্রশাসনের টনক নড়েছে এবং আইনি পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। নয়তো মর্মান্তিক এ বিষয়টি হয়তো উপেক্ষিতই থাকতো।
ময়মনসিংহের এই বর্বর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ধর্ম নিয়ে কটুক্তি করার কোন প্রমাণ কিন্তু পায়নি প্রশাসন! সুতরাং দীপু দাসকে হত্যার ঘটনাটি এটাই প্রমাণ করে বিষয়টি শতভাগ উদ্দেশ্যপ্রনোদিত। তবে উক্ত ঘটনায় ধৃত একজনের রাজনৈতিক পরিচয় দেশবাসীকে হতাশ করেছে। তার মানিসিকতা এটাই প্রমাণ করে যে এরা কোন মতাদর্শের এবং কতটা জঘন্য মনোবৃত্তির। সম্পূর্ণ নিরাপরাধ এবং নির্দোষ একটা যুবককে এভাবেও মধ্যযুগীয় কায়দায় হত্যা করে কি কারো কোনো লাভ হল? এ কোন অন্ধকার সমাজে আমরা বাস করছি!
এ দেশে আইন এবং সর্বজনীন মানবাধিকার কী এমন জঘন্য বিষয়টি অনুমোদন করে? ধর্ম অবমাননা বা নবী রাসুল (স.) কে অবমাননা করেছে এমন অভিযোগে তুলেই কাউকে হত্যার অধিকার কি ধর্মম বা রাষ্ট্র কাউকে দিয়েছে? তারপর সে অভিযোগ যদি হয় সম্পূর্ণ মিথ্যা বানোয়াট এবং বিভ্রান্তিকর এবং ভিত্তিহীন, তাহলে?
অপরাধ প্রবণ মন যাদের, তারা নানা অছিলায় এবং অযুহাতে অন্যকে হত্যা বা আঘাতে বিকৃত শান্তি পেতে চায়, এটা এক মানসিক বৈকল্য। এর থেকে বেরিয়ে আসার জন্য যে নৈতিক শিক্ষা ও পরিবেশ দরকার, সেটা এরা পায়নি বলেই ধরে নিব। উপরন্তু তারা যে মানবিকতার শিক্ষা না পেয়ে, এর উল্টোটাই যে পেয়েছে সে সত্যের প্রতিই আমাদের ধারণা দৃঢ় হয়। বিদ্বেষ ঘৃণা এবং বিদ্রুপের মধ্যেই যে এদের পরিতৃপ্তি আর বিভাজন ও বিভক্তিই যে এদের সংস্কৃতি, তা বোঝাই যায়! আসলে চরম নিষ্ঠুর এবং নৃশংস প্রবৃত্তির মানসিকতা না হলে, মানুষ হয়ে মানুষকে এমনি ভাবে হত্যা করা যায় না।
মনুষ্যত্বের বিন্দু মাত্র লেশ যে এদের মধ্যে নেই, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু আমরা প্রয়াসই এমন ধর্ম অবমাননার জিকিরে নিরাপরাধ মানুষকে হত্যার বিকৃতভাষ্য দেখি। হতভাগ্য দীপুদাস বিবাহিত এবং এক কন্যা সন্তানের গর্বীত পিতা ছিলেন। উপরন্তু তাঁর পিতামাতাও বর্তমান।
১২ ডিসেম্বর শরীফ ওসমান হাদীকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি করেছে সন্ত্রাসীরা এরপর চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাদীর মৃত্যু ঘটে সিংগাপুর হাসপাতালে। পরে হাদীর লাশ ঢাকায় এনে বিশেষ মর্যাদায় জানাজা ও দাফন করা হয়েছে। এ জন্য হাদীর পরিবার সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞ এবং হাদির সমর্থক এবং শুভাকাঙ্ক্ষীরা সন্তুষ্ট। দুঃখ ও বেদনার মধ্যে এটাও এক সান্ত্বনা বটে! কিন্তু দীপু দাসের ব্যাপারে রাষ্ট্র এবং সরকার কতটা উদার সহানুভূতিশীল হতে পারবে? কে শুনবে দীপুর মমতাময়ী মা এবং বাবা ও বউ-এর আর্তনাদ? উপার্জনক্ষণ ছেলের এমন করুণ নির্মম বিদায় কোন মাসহ্য করতে পারেন? আগুনে পুড়েছে কি শুধু সন্তানের দেহ, মা বাবা স্ত্রী সন্তানের বুক পোড়েনি?













