যুগে যুগে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো অসীম সাহসীরা নিজেকে উৎসর্গ করেছিল শোষণ মুক্ত ও ইনসাফের সমাজ প্রতিষ্ঠায়। পৃথিবীতে যতদিন অন্যায় থাকবে, ততোদিন বিপ্লবীরা জন্মাবে তা রুখে দিতে। এটাই ইতিহাসের চিরায়ত সত্য। পৃথিবীতে মানবজাতির সূচনা লগ্ন থেকে স্বৈরাচারীরা দুর্বলের ওপর প্রভাব বিস্তার করে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। তবে মজলুমের আশার প্রদীপ হয়ে নিজের জীবনকে তুচ্ছ মনে করে পর্বতসম শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে এই বিপ্লবীরাই। এটাও ইতিহাস বলে যে, সাহসী বীর সেনারা অস্ত্রে নয়; বরং তারুণ্যের শক্তিতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। তাদের ছিল মজলুমের অসীম ভালোবাসা ও সমর্থন।
মহাত্মা গান্ধী, মাস্টারদা সূর্য সেন, ক্ষুদিরাম বসু, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের বীরত্ব কথা আমরা জানি। এছাড়াও আছে ভারতীয় আগ্রাসনবিরোধী কণ্ঠ আবরার ফাহাদ, ২৪’র গণঅভ্যূত্থানের আবু সাঈদ ও মীর মুগ্ধসহ বীর সেনা যাদের আত্মত্যাগ দীর্ঘ ১৫ বছরের ফ্যাসিস্ট শাসন পতনে ইন্ধন জুগিয়েছিল। বাংলাদেশকে নতুন করে গড়ার স্বপ্নে জনগণের আশা জেগেছিল। ফ্যাসিস্ট শাসনের পতনের পর আবারও গণঅভ্যূত্থান পরবর্তী তারুণ্যের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেছিল শহীদ ওসমান হাদি। নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে অঙ্গীকারবদ্ধ সকল দলের গঠন মূলক সমালোচনা তিনি করেছিলেন। তিনি হতে চেয়েছিলেন দেশ গড়ার একজন কারিগর। তবে সন্ত্রাসীদের গুলিতে তাকে শহীদ হতে হয়। তিনি চেয়েছিলেন সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি হয়ে সংসদে যেতে। তবে ভাগ্য তার নিথর দেহ নিয়ে গেল সেই সংসদে। তাকে বলা হয়েছিল ৫০০ ভোট পাবে নাকি। তবে তাকে পৃথিবী থেকে শেষ বিদায় দেওয়া লাখো মানুষের উপস্থিতি সেই আদিম ধারণাকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়। তা হলো– রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হয়ে সংসদে যেতে বড় দল, টাকা বিলিয়ে ভোট চাওয়া, পারিবারিক রাজনৈতিক অবস্থা, প্রভাব ও বয়সের ভারত্বের প্রয়োজন হয় না। এর জন্য দেশের বৃহৎ স্বার্থ রক্ষায় তারুণ্যের কণ্ঠস্বর হয়ে জনগণের জন্য একনিষ্ঠ কাজ করার প্রতিশ্রুতিই দরকার।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) হিসাব মতে, ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ১৮ই মে পর্যন্ত গণপিটুনিতে অন্তত ১১৯ জন নিহত ও আহত ৭৪ জন। গত ১০ বছরে গণপিটুনিতে মোট ৭৯২ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে ২০২৪ সালে। গত বছর এ ধরনের ঘটনায় ১৭৯ জন নিহত হয়েছে। তবে সবচেয়ে উদ্বেগ জনক বিষয় হলো— যাদের হাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব, তাঁরাই মব জাস্টিসের শিকার। চলতি বছরের ৫ই মে প্রকাশিত ডয়চে ভেলের এক প্রতিবেদনে পুলিশের মহাপরিদর্শকের বরাত দিয়ে বলে, ‘অভ্যুত্থানের ৯ মাস পরও পুলিশের বিরুদ্ধেই প্রতিদিন গড়ে একটার বেশি মব হচ্ছে। সর্বশেষ এপ্রিলে পুলিশের বিরুদ্ধেই ৩৭টি মব হয়েছে এবং মার্চে ৩৫টি। এই ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পুলিশ কোনো আসামী গ্রেপ্তারের পর একদল মানুষ সংগঠিত হয়েছে আসামী ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে বা পুলিশের ওপর হামলা করে আসামী ছিনিয়ে নিতে চাইছে।’
এভাবে যদি খুনীরা বুঝতে পারে হত্যাকাণ্ড ঘটালেও প্রভাব প্রতিপত্তির জোরে তারা বেঁচে যাবে, তাহলে এই পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হারে বাড়বে। ওসমান হাদির একটা কথাই ছিল যে, সে মারা গেলেও যাতে জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করা হয়। আজ এই ঘটনার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের বিচার ব্যবস্থায় ভঙ্গুর অবস্থায়ই দায়ী। গণঅভ্যূত্থান বা বিপ্লব হয় অন্যায় দূর করে ইনসাফের শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার জন্য। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তার আলোর মুখ এখনও অধরায় থেকে গেছে। নির্বাচন বা কোনো সাংবিধানিক প্রক্রিয়া ছাড়া শুধু জনগণের সমর্থনে এই অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছে। এখন পর্যন্ত জুলাইয়ের যে সকল সংস্কারের দাবি ছিল, তা বাস্তবায়িত হয়নি। জনগণ চেয়েছে গণঅভ্যত্থান পরবর্তী ম্যান্ডেট যেন নিরপেক্ষ এ সরকারের সময়ে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা হয়নি। ফলে হাজার হাজার শহীদদের রক্ত, পঙ্গুত্ব বরণ ও জীবন বিসর্জন সবই যেন বৃথা। সরকারের পক্ষ থেকে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার আশ্বাস দিলেও, বিচারের দীর্ঘসূত্রতা জনগণের মনে আস্থাহীনতা তৈরি করেছে।
তবে যাইহোক অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে যদি এই বিচার নিশ্চিত না হয়, তাহলে আগামীতে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট জটিল হয়ে ওঠবে। জনগণ তখন বিশ্বাস করতে শুরু করবে যেহেতু এই জুলাইয়ে রক্ত ও প্রাণ বিসর্জন দিয়েও নূন্যতম কাঙ্ক্ষিত আশা পূরণ হয়নি, তাহলে আর রক্ত দিয়ে কী লাভ? নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থা এসেও যেহেতু নানাভাবে দেশের স্বার্থ রক্ষা রাখতে পারছে না, তাহলে কাদের বিশ্বাস করব আমরা? জনগণ তখন রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী মহলের লোকদের কৃত্রিম আশ্বাসে ভরসা হারিয়ে ফেলবে। এতে স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার আকাঙ্ক্ষা আকাশকুসুমই থেকে যাবে।













