আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে পিরোজপুর-৩ (মঠবাড়িয়া) আসনে ‘জোট রাজনীতি’র হিসাব-নিকাশ নতুন মোড় নিচ্ছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য সমঝোতা এই আসনে রাজনীতির প্রচলিত ধারা ভেঙে দিতে পারে—এমনটাই মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। এই সমীকরণে সবচেয়ে আলোচিত ও সম্ভাবনাময় নাম হিসেবে উঠে আসছেন এনসিপির মনোনীত প্রার্থী ড. শামীম হামিদী।
আট দলীয় জোটের ভেতরের আলোচনায় পিরোজপুর জেলার তিনটি আসনের মধ্যে পিরোজপুর-১ ও ২ আসনে ছাড় দেওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। এতে করে পিরোজপুর-৩ আসনটি সমঝোতার টেবিলে তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। রাজনৈতিকভাবে এই আসন কখনোই কোনো একক দলের স্থায়ী দখলে ছিল না; বরং প্রতিবারই এখানে প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা ও স্থানীয় জনমতের ভূমিকা বেশি প্রভাব ফেলেছে।
এরূপ বাস্তবতায় জোট সমঝোতার আলোচনায় পিরোজপুর-৩ আসনটি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের (চরমোনাই) জন্য ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে সাবেক এমপি ডা. রুস্তম আলী ফরাজীর সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন। ‘সুযোগ বুঝে’ তিনি পুনরায় চরমোনাই ধারার রাজনীতিতে যুক্ত হলেও তাকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একাধিকবার দল পরিবর্তনের ইতিহাস, দীর্ঘদিন ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা এবং ‘ফ্যাসিবাদী শাসনের দোসর’ হিসেবে পরিচিতির কারণে মঠবাড়িয়ায় তার গ্রহণযোগ্যতা এমনিতেই প্রশ্নের মুখে। জামায়াত, বিএনপি এমনকি সাধারণ ভোটারদের একটি বড় অংশ তাকে প্রত্যাখ্যান করছেন। স্থানীয় জামায়াতের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, তারা কোনো অবস্থাতেই ডা. ফরাজীর পক্ষে নির্বাচনী মাঠে কাজ করতে প্রস্তুত নন। গণমাধ্যমে এমনও শিরোনাম হচ্ছে যে, ‘মঠবাড়িয়ায় রাতের ভোটের এমপি ডা. রুস্তম আলী ফরাজীর এবারের মার্কা হাতপাখা‘। জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত এই একটি শিরোনমই ফরাজী সম্পর্কে বলে দিচ্ছে অনেক কিছু!
এর বিপরীতে এনসিপির মনোনীত ১২৫ জনের প্রাথমিক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ড. শামীম হামিদীকে ঘিরে এলাকায় তৈরি হয়েছে ভিন্ন এক রাজনৈতিক আবহ। জন্মসূত্রে মঠবাড়িয়ার সন্তান ড. শামীম হামিদী একজন শিক্ষক, গবেষক ও সামাজিকভাবে পরিচিত নাগরিক মুখ। শিক্ষা, গবেষণা ও সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার কারণে তিনি শুরু থেকেই ‘ক্লিন ইমেজের নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন।
মনোনয়ন আলোচনায় আসার পর থেকেই তার প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ বেড়েছে, বাড়ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ড. শামীম হামিদীর ক্ষেত্রে কোনো বিতর্কিত অতীত নেই, নেই ক্ষমতার উত্তরাধিকার রাজনীতির ছাপ—যা বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভোটারদের কাছে বড় একটি ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে বিএনপির অবস্থানও এই আসনে তেমন একটা শক্তিশালী নয়। দলটি ১৪ মাস বহিষ্কৃত রুহুল আমিন দুলালকে মনোনয়ন দেওয়ায় এবং দলীয় কোন্দল ও একাধিক গ্রুপে বিভক্ত থাকায় বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি পড়েছে প্রশ্নের মুখে। ফলে ভোটের মাঠে বিএনপি এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জামায়াতের স্থানীয় সমর্থকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন— যদি পিরোজপুর-৩ আসন ছাড় দিতেই হয়, তাহলে কোনো ‘বিতর্কিত বা ফ্যাসিবাদের দোসর’ হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিকে নয়; বরং ড. শামীম হামিদীর মতো শিক্ষিত, সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য ও নতুন ধারার প্রার্থীর পেছনেই তারা কাজ করতে আগ্রহী।
বরিশাল বিভাগে এনসিপি ইতোমধ্যে সাতটি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। রাজনৈতিক হিসাব অনুযায়ী পিরোজপুর-৩ আসনটি এনসিপির জন্য একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হতে পারে, যেখানে দলীয় শক্তির চেয়ে প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা বড় ভূমিকা রাখবে।
সব মিলিয়ে মঠবাড়িয়ায় এখন প্রশ্নটি দল নয়, প্রশ্নটি ‘নেতৃত্বের ধরন’। ক্লিন ইমেজ ও নাগরিক প্রতিনিধিত্ব বনাম বিতর্কিত অতীত—এই বহুমুখী দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে ড. শামীম হামিদী ধীরে ধীরে এলাকার মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীকে পরিণত হচ্ছেন, করে যাচ্ছেন দলীয় কাজ। জোট সমঝোতার মাধ্যমে তার নাম চূড়ান্ত হলে, এনসিপি পিরোজপুর-৩ আসনে কৌশলগত সুবিধা পাবে, যা শুধু একটি আসনই নিশ্চিত করবে না, বরং রাজনৈতিক মানচিত্রেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে— এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় সচেতন ভোটারদের মতে, মঠবাড়িয়াকে ঢেলে সাজাতে হলে সবার আগে পুরনো ধারার রাজনীতির বাইরে বেরিয়ে এসে ভাবতে হবে, আর সেক্ষেত্রে দরকার একজন ‘নতুন মুখ’; একজন শিক্ষিত ও ক্লিন ইমেজের নেতার হাতেই মঠবাড়িয়ার উন্নয়নের বার তুলে দেওয়া দরকার।













