আজকে ২০২৬ সালের প্রথম দিনটিতে, তথা ইতিহাসের আরও এক সন্ধিক্ষণে উপস্থিত আমরা। আগের বছরগুলোর মতো ২০২৫ সালও মানবসভ্যতাকে কোনো নিশ্চিন্ত আশ্বাস দিয়ে যায়নি, বরং আন্তর্জাতিক পরিসরে ও বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অনিশ্চয়তা, অস্থিরতা এবং উৎকণ্ঠার বহু চিহ্ন রেখে বিদায় নিয়েছে। তবু ইতিহাসের অভিজ্ঞতা বলছে—মানুষ অনিশ্চয়তার মধ্যেই স্থিতির পথ সন্ধান করতে শেখে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ২০২৫ সাল বিশেষ কোনো স্বস্তি আনতে পারেনি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পূর্ণাঙ্গ সমাধানের পথে অগ্রসর হয়নি। তার বিপরীতে বরং যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার ফলে ইউরোপে জ্বালানি নিরাপত্তা, খাদ্য সরবরাহ এবং শরণার্থীসংকট অব্যাহত ছিল এবং রয়েছে৷ মধ্যপ্রাচ্যে গাজাকেন্দ্রিক সংঘাতের অভিঘাতে এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে আরো ভঙ্গুর করে তুলেছে, যার প্রতিফলন পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতিতেও।লোহিতসাগর ও গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোতে নিরাপত্তা ঝুঁকি বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যয় বৃদ্ধি করেছে।অপরদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের একাংশে রাজনৈতিক মেরুকরণ গণতান্ত্রিক প্রিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থাকে ফেলে দিয়েছে নতুন এক পরীক্ষার মুখে।
২০২৫ সালে সম্পূর্ণ স্থিতি লাভ করেনি বিশ্ব অর্থনীতিও৷ উচ্চ সুদের হার, খণচাপ এবং ‘সরবরাহ-শৃঙ্খলের পুনর্গঠন’ অনেক উন্নয়নশীল দেশের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় বছরটিতে।জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত—তাপপ্রবাহ, বন্যা ও খরার পুনরাবৃত্তি, খাদ্যনিরাপত্তা ও অভিবাসন সমস্যাকে আরো তীব্র করে তুলেছে। এর পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি কর্মবাজারে ছুড়ে দিয়েছে নতুন প্রশ্ন; আর তা হলো, কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ কোন পথে?
বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও ২০২৫ সাল ছিল দ্বিধা ও প্রত্যাশার মিশ্রণে ভরা। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কিছু অগ্রগতি সত্ত্বেও জীবনযাত্রার ব্যয় সাধারণ মানুষের জন্য চাপস্বরূপ থেকে গেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, রপ্তানি ও আমদানির ভারসাম্য, এই সকল অর্থনৈতিক সূচক নীতিনির্ধারকদের উদ্দেশে সতর্ক সংকেত ছুড়ে দিচ্ছে। জলবায়ু ঝুঁকির দেশ হিসেবে ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন ও লবপাক্ততার চাপ যে কৃষি ও জীবিকায় স্থায়ী অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে, সে কথা বলাই বাহুল্য। এর পাশাপাশি নেতিবাচক প্রবণতা হিসেবে সামাজিক পরিসরে তথ্যের অপব্যবহার ও গুজব গণআস্থার জন্য হইয়া উঠেছে এক নতুন চ্যালেঞ্জ।
ঠিক এমন একটি প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সাল বাংলাদেশের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এই বছর জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা৷ গণতন্ত্রের জন্য নির্বাচন অপরিহার্য, এটা রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যে আস্থার পুনর্নির্মাণের এক গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ্য৷ নির্বাচন যথাযথভাবে অনুষ্ঠিত হলে ভালো কথা, এটা একটি গুরুত্বপূর্ণ ডেভেলপমেন্ট হবে নিঃসন্দেহে।তবে একটি নির্বাচন কেবল নিয়ম-রক্ষার নির্বাচন হলেই হয় না, তা হতে হয় অংশগ্রহণমূলক, শান্তিপূর্ণ ও বিশ্বাসযোগ্য। তা না হলে কী হতে পারে, আমরা অতীতে বারংবার দেখেছি। আমরা কামনা করি, সব কিছু সুষ্ঠু-স্বাভাবিক হোক— রাষ্ট্রযন্ত্র দায়িত্বশীল থাকুক, রাজনৈতিক শক্তিগুলো পরিণত ও পরিমিতিবোধ প্রদর্শন করুক এবং নাগরিকেরা ভয়হীন পরিবেশে মতপ্রকাশ করার সুযোগ পাক।
নানান মহল থেকে প্রশ্ন উঠছে— চলমান অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা কি ২০২৬ সালে বহুলাংশে কাটবে? এর সরল উত্তর কঠিন। ইতিহাস শিক্ষা দেয়, অস্থিরতা এক বছরে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয় না। তবে সঠিক সিদ্ধান্ত, দায়িত্বশীল রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা থাকলে এর তীব্রতা স্থাস পায়।আর্থিক শৃঙ্খলা, সামাজিক সুরক্ষা, তথ্যের স্বচ্ছতা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি অবিচল আস্থা— এই চারটি স্তম্তই ২০২৬ সালের স্থিতির চাবিকাঠি ।
খ্রিষ্টীয় নববর্ষ আমাদের কোনো নিশ্চিত ভবিষ্যৎ দান করে না। তবে এটা দৃষ্টিভঙ্গি বদলাবার সুযোগ দেয়। ২০২৫ আমাদের শিখিয়েছে, অনিশ্চয়তা উপেক্ষা করলে তা আরো ঘনীভূত হয়, আর মোকাবিলা করলে বরং তার সমাধান মিলতে পারে৷ অতএব, ২০২৬ সালে আমাদের প্রত্যাশা অযৌক্তিক আশাবাদ নয়, বরং দায়িত্বশীল প্রত্যয়৷ পৃথিবীর প্রতিটি নববর্ষ এক-একটি পরীক্ষার খাতা। আমরা জানি না, প্রশ্ন কী হবে; কিন্ত প্রস্তুতি আমাদের হাতেই। এই প্রস্তুতিই হোক ২০২৬ সালের অঙ্গীকার ।
সকলের মঙ্গল কামনায়— খ্রিষ্টীয় নববর্ষ আমাদের জন্য আনুক শান্তি, সংযম ও সুদূরপ্রসারী প্রজ্ঞা। শুভ হোক নতুন বছর।













