সময়ে বহমান নদী ধারায় কখন যে বছর পেরিয়ে যায়, বলা মুশকিল। ক্যালেন্ডারের পতায় ২০২৫ সাল শেষ হয়ে শুরু হয়েছে ২০২৬। অন্যান্য বারের মতো এবারও বছরের প্রথম দিনেই চারপাশ মেতে উঠেছে ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’ শুভেচ্ছা ধ্বনিতে। শহরের রাস্তায় ঝলমলে আলো, সামাজিক মাধ্যমে নতুন স্বপ্নের ঘোষণা। কেউ-বা নানা আয়োজনে পালন করছে বছরের প্রথম দিনটিকে। কিন্তু যথারীতি এসব উচ্ছ্বাসের আড়ালেই চাপা পড়ে যাচ্ছে এক নিঃশব্দ বাস্তবতা; আর তা হলো, সমাজের দরিদ্র মানুষের জীবনাচরণের প্রশ্ন। তাদের জন্য কেবল ক্যালেন্ডার বদলায়, বদলায় না জীবনের চিত্র।
ভোরের আলো ফুটতেই যারা কাজে বেরিয়ে পড়ে, বছরের প্রথম দিনটাতেও তাদের পথচলা একই। ফুটপাতে ঘুমানো মানুষটি জানে না, আজ কত তারিখ। তার কাছে নতুন বছরের কোনো মানেই নেই— সেই একই কষ্ট, একই অনিশ্চয়তা। রিকশাচালক, দিনমজুর, গৃহকর্মী, ভ্যানচালক— এদের কাছে বছরের শুরু মানে বিশ্রাম নয়, বরং নতুন কাজ পাওয়ার দুশ্চিন্তা। উৎসবের দিনে অনেক সময় কাজ কমে যায়, আর তাতে আয়ও কমে যায়। এ কারণে নতুন বছরের আনন্দ এই জনগোষ্ঠীর কাছে নতুন কোনো উপলক্ষ নয়।
গ্রামের চিত্রও খুব ভিন্ন নয়। কৃষকের কাছে নতুন বছর মানে নতুন ঋণ, নতুন অপেক্ষা। ফসল ভালো হবে কি না, বাজারদর ঠিক থাকবে কি না— এই দুশ্চিন্তাই তার সঙ্গী। বছরের প্রথম দিনে জমিতে দাঁড়িয়ে কৃষক আকাশের দিকে চেয়ে রয়, প্রার্থনায় বুক বাধে— প্রকৃতির দয়া যেন থাকে তার ওপর। কিন্তু ক্যালেন্ডার বদলে যায় সময়ের আবর্তে, বদলায় না ভাগ্যরেখা। একই লড়াই, একই অনিশ্চয়তা তাকে ঘিরে থাকে বছর জুড়ে!
নতুন বছর নিয়ে আমরা অনেক প্রতিশ্রুতি দিই— দারিদ্র্য দূর করব, বৈষম্য কমাব, সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করব। কিন্তু বছরের পর বছর সেই প্রতিশ্রুতিগুলো কেবল কাগজেই রয়ে যায়। দরিদ্র মানুষের জীবনে পরিবর্তন আসে ধীরে, কখনো কখনো আসে-ই না। নীতি, পরিকল্পনা আর বাস্তবতার মাঝে যে বিশাল ফারাক, তা দেশের দারিদ্র্য-হার দেখলেই বোঝা যায়। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা PPRC জানিয়েছে বছরটিতে এর দারিদ্র্যের হার বেড়ে হয়েছে ২৭.৯৩%, যা ২০২২ সালে ছিল ১৮.৭%।
তবুও এই অন্ধকারের মধ্যেও আলো ফুটাতে হবে। দরিদ্র মানুষ যেমন হার না মেনে স্বপ্ন দেখে— একদিন ভালো কিছু হবে, এই দুঃখের জীবন বদলাবে; ঠিক তেমনি আমাদেরও তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। দারিদ্র্যের জীবনমান উন্নয়নে সরকারকে গ্রহণ করতে হবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। দারিদ্র্যতার মূল কারণগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। সমাজে বিত্তবানদের এগিয়ে আসতে হবে দারিদ্র্যের নিপিড়ীত জীবন থেকে তাদের বের করে আনতে।
বছরের নতুন দিনে মানবিক দৃষ্টি, কার্যকর উদ্যোগ এবং সম্মিলিত দায়িত্ববোধের শিক্ষা গ্রহণ করা প্রয়োজন। নতুন বছরের প্রথম দিন থেকেই যদি আমরা দরিদ্র মানুষের জীবনের দিকে খেয়াল রাখতে শুরু কির, তাদের কষ্ট বুঝি, পাশে দাঁড়াই— তাহলেই হয়তো কোনো একদিন ক্যালেন্ডারের সঙ্গে সঙ্গে তাদের জীবনও বদলাবে, গড়ে উঠবে এক সুন্দর-বৈষম্যহীন সমাজ। তাতে করে নববর্ষের উৎসব হয়ে উঠবে আরও আনন্দদায়ক।













