নশ্বর ধূলিধরার কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়। সীমাহীন বৈচিত্র্যসম্ভারে ভরপুর এই পৃথিবীতে সব কিছুকে জয় করতে পারলেও একটি জায়গায় এসে মানুষ নিতান্ত অসহায়—সেটা হলো ‘মৃত্যু’। ‘জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা রবে?’—সত্যিকার অর্থেই এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটানোর সাধ্য কারও নেই—সকলকেই ওপারের ডাকে সাড়া দিয়ে থেমে যেতে হবে। জগতের এই অমোঘ নিয়মে ৮০-তে থেমে গেলেন ‘ক্যারিশম্যাটিক লিডার’ বেগম খালেদা জিয়া। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব এবং তিন তিন বারের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রস্থানে রাজনীতির এক কাব্যিক অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল। প্রয়াণের মধ্য দিয়ে তার সুদীর্ঘ ৪১ বছরের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক নেতৃত্ব পৌঁছাল এক ঐতিহাসিক পরিসমাপ্তিতে। অনন্তকালের পথে তার এই প্রস্থানে আমরা গভীরভাবে শোকাহত এবং মর্মাহত। তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আমাদের সমবেদনা; সমগ্র জাতি এই শোক কাটিয়ে উঠবে বলে আমরা কামনা করি।
বাংলার আপামর জনতার নিকট অনুপ্রেরণার, অনুকরণীয় বেগম খালেদা জিয়ার জীবন ছিল সকল স্তরের মানুষের ভালোবাসায় পূর্ণ। তিনি বিদায় নিলেন যদিও, মোহিত করে গেলেন সমগ্র দেশকে। জীবনপথের বহু চড়াই-উতরাইয়ের স্বাদ পাওয়া বেগম জিয়া বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে নিজেকে একাত্মা করে তুলেছিলেন; দ্ব্যর্থহীন চিত্তে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, ‘আমার এই স্বজনহীন জীবনে দেশবাসীই আমার স্বজন। আল্লাহ আমার একমাত্র ভরসা। আমি যেমন থাকি, যেখানেই থাকি, যতক্ষণ বেঁচে থাকব, দেশবাসীকে ছেড়ে যাব না।’ বলার অবকাশ থাকে না, জীবন সায়াহ্নে এসে তিনি সমগ্র জাতির আশ্রয় ও ভরসার কেন্দ্রস্থল হয়ে ওঠেন।
বেগম জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতির এক দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল অধ্যায়ের রচয়িতা। সামরিক শাসনবিরোধী সংগ্রাম থেকে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় নিবেদিতপ্রাণ এই মহীয়সী নেত্রীর মৃত্যুতে এক গভীর শূন্যতা সৃষ্টি হলো রাজনৈতিক অঙ্গনে। শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক ধারাকে তিনি অব্যাহতভাবে সামনের দিকে নিয়ে যান, যা কালের পথে বহমান। এই গুরুদায়িত্ব পালনে তাকে বহু সমস্যাসংকুল পথ পাড়ি দিতে হয়েছে, যা তাকে করে তোলে ‘অজেয়’। তার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বিএনপি ১৯৯১, ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়লাভ করে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও ছিল তার ঈর্ষণীয় অর্জন। বিশেষ করে, নারী শিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নে তার প্রগতিশীল ভূমিকা সর্বমহলে ব্যাপক প্রশংসিত। অবশ্য এই সকল কীর্তি স্থাপনে তাকে অগ্নিপরীক্ষাও কম দিতে হয়নি! তবে সর্বদাই তার সোচ্চার কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত করে গেছে স্বদেশের জয়গান। বাংলাদেশের গণমানুষের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গির একটি নমুনা পাওয়া যায় পুনম পান্ডের লেখা ‘ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ ডমেস্টিক পলিটিকস’ বইয়ে। ১৯৯২ সালে নয়াদিল্লি সফরকালে ভারতের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী পিভি নরসিমা রাও অভিযোগ করেন যে, বহু বাংলাদেশি অবৈধভাবে ভারতে বসবাস করছেন। এই কথার বিপরীতে খালেদা জিয়ার সরাসরি জবাব ছিল, ‘ভারতে বাঙালিরাও বাংলা বোঝেন, বাংলায় কথা বলেন—এর মানে এই নয় যে, তারা সকলেই বাংলাদেশি।’ বেগম জিয়ার এই বক্তব্য ভারতীয় নীতিনির্ধারক মহলে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল বটে; কিন্তু তার উপলব্ধিকে ‘অসাধারণ’ বলতেই হয়।
বেগম খালেদা জিয়া একদা বলেছিলেন, ‘আমি বলেছি আমার কিছু চাই না, আমি এখন জনগণের জন্য, দেশের জন্য, মানুষের জন্য কাজ করতে চাই। আমার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কোনো শখ নেই। আমার অন্য কোনো কিছু হওয়ার শখ নেই।’ বলা বাহুল্য, বেগম জিয়া তার রাজনৈতিক জীবনে বহু মাইলফলক স্পর্শ করেছেন, যার একটি হলো, ব্যক্তিগতভাবে কখনো কোনো নির্বাচনে তিনি পরাজিত হননি। উপরন্তু, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রা ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে রেখেছেন অপরিসীম অবদান। দেশের এক কঠিন পরিস্থিতিতে রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার সাহস দেখিয়েছিলেন যেই মহীয়সী নেত্রী, প্রকৃতিও তাকে দিয়াছে দু’হাত খুলে—তাকে অধিষ্ঠিত করেছে গৌরবের আসনে।
মৃত্যু অনিবার্য, চূড়ান্ত বাস্তব। স্বয়ং মহান সৃষ্টিকর্তা সুরা তাওবার ১১৬ নম্বর আয়াতে বলেছেন, ‘তিনিই জীবন দান করেন, মৃত্যু ঘটান।’ অর্থাত্ মৃত্যুকে এড়ানো অসাধ্য। বিগত ৫৪ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাসে এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্র বিনির্মাণে বেগম খালেদা জিয়া যে অনবদ্য অবদান রেখেছেন, তাতে করে তিনি সমহিমায় ভাস্বর থাকবেন বাংলার গণমানুষের হৃদয়ে।













