সময় কখনো থামে না। সে কেবল আমাদের পাশ কাটিয়ে চলে যায়–কখনো নিরব, কখনো প্রচণ্ড শব্দে। এক বছরের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে নতুন বছরের দরজায় কড়া নাড়ার মুহূর্তটি তাই সবসময়ই মানুষের কাছে বিশেষ। ২০২৬ সালও তেমনই এক নতুন দরজা। এই দরজার ওপারে কী আছে, তা কেউ নিশ্চিতভাবে জানে না; তবু মানুষ আশা নিয়ে তাকিয়ে থাকে। কারণ মানুষ কেবল অতীত দিয়ে বাঁচে না, সে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দিয়েই নিজেকে বারবার নতুন করে গড়ে তোলে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, “পুরাতনকে বিদায় জানাই, নবকে করি আহ্বান।” নতুন বছর মানেই পুরোনো দিনের হিসাব-নিকাশ, ভুল-সাফল্যের এক নিঃশব্দ আত্মসমালোচনা। ২০২৫ সাল আমাদের শিখিয়েছে অনেক কিছু–ব্যক্তিজীবনে, সমাজে, রাষ্ট্রে। কোথাও আমরা এগিয়েছি, কোথাও থেমে গেছি, কোথাও হয়তো পিছিয়েও পড়েছি। কিন্তু নতুন বছর মানে সেই থেমে যাওয়া পায়ে আবার গতি আনার এক নীরব প্রতিশ্রুতি।
২০২৬ আমাদের সামনে আসে এক জটিল সময়ের উত্তরাধিকার নিয়ে। বিশ্ব রাজনীতি অস্থির, অর্থনীতি টালমাটাল, প্রযুক্তি দ্রুত বদলে দিচ্ছে মানুষের চিন্তা ও জীবনধারা। সক্রেটিস বলেছিলেন, “পরীক্ষাহীন জীবন বেঁচে থাকার যোগ্য নয়।” এই নতুন বছরে দাঁড়িয়ে আমাদেরও নিজেদের জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্রকে নতুন করে পরীক্ষা করার প্রয়োজন রয়েছে। আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি, কোন পথে যাচ্ছি–এই প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় ২০২৬ একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়চিহ্ন। তরুণদের সংখ্যা বাড়ছে, তাদের স্বপ্নও বাড়ছে। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের পথ কি যথেষ্ট মসৃণ? শিক্ষা, কর্মসংস্থান, নৈতিকতা ও মানবিকতার প্রশ্নগুলো নতুন বছরে আরও জোরালোভাবে সামনে আসবে। কাজী নজরুল ইসলাম বলেছিলেন, “আমি চির বিদ্রোহী বীর।” কিন্তু বিদ্রোহ মানেই কেবল ধ্বংস নয়; বিদ্রোহ মানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, অচলায়তন ভেঙে নতুন পথ তৈরি করা। ২০২৬ যদি কিছু দাবি করে, তবে তা হলো গঠনমূলক বিদ্রোহ–অন্যায়, দুর্নীতি, অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে।
নতুন বছর মানুষকে আশাবাদী করে তোলে, কিন্তু সেই আশাবাদ যেন কেবল ক্যালেন্ডারের পাতায় সীমাবদ্ধ না থাকে। দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট বলেছিলেন, মানুষের কাজ হওয়া উচিত এমনভাবে জীবনযাপন করা, যেন তার আচরণ সার্বজনীন নৈতিক আইনে পরিণত হতে পারে। ২০২৬ আমাদের সেই নৈতিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়। আমরা কি কেবল নিজের লাভ দেখব, নাকি সমষ্টির কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেব? আমরা কি প্রযুক্তিকে মানবতার সেবায় ব্যবহার করব, নাকি মানবিকতাকেই প্রযুক্তির কাছে সমর্পণ করব?
বিশ্বসাহিত্যে নতুন বছরের ভাবনা বারবার ফিরে এসেছে নতুন সূচনার প্রতীক হিসেবে। লিও টলস্টয় বিশ্বাস করতেন, মানুষের প্রকৃত শক্তি তার নৈতিক উন্নতিতে। ২০২৬ সেই নৈতিক উন্নতির বছর হতে পারে–যদি আমরা চাই। যুদ্ধ, সহিংসতা, বিদ্বেষে ক্লান্ত পৃথিবী আজ শান্তির নতুন ভাষা খুঁজছে। এই নতুন বছরে আমাদের ব্যক্তিগত আচরণ, সামাজিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত–সবকিছুর মধ্যেই যদি মানবিকতার ছাপ না থাকে, তবে নতুন বছর কেবল সংখ্যা বদলের আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হবে।
বাংলা সাহিত্যেও সময় ও মানুষের সম্পর্ক গভীরভাবে আলোচিত হয়েছে। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় দেখিয়েছেন, মানুষ তার দুর্বলতা নিয়েই মানুষ। নতুন বছর মানে সেই দুর্বলতাকে অস্বীকার করা নয়, বরং তা স্বীকার করে সামনে এগোনো। ২০২৬ আমাদের শেখাতে পারে–ভুল করা লজ্জার নয়, ভুল থেকে না শেখাই প্রকৃত ব্যর্থতা।
নতুন বছরের আরেকটি বড় প্রশ্ন পরিবেশ ও প্রকৃতি। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত ইতোমধ্যে আমাদের নিত্যদিনের বাস্তবতা। বন্যা, খরা, তাপপ্রবাহ—সবই যেন আমাদের সতর্ক করে দিচ্ছে। ফরাসি দার্শনিক জাঁ-জাক রুশো বলেছিলেন, মানুষ প্রকৃতির কাছে ফিরে গেলে সে নিজেকে খুঁজে পায়। ২০২৬ কি আমাদের প্রকৃতির সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক গড়ার বছর হবে? নাকি আমরা আগের মতোই অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংকট রেখে যাব?
নতুন বছর মানে কেবল বড় বড় রাষ্ট্রীয় বা বৈশ্বিক প্রশ্ন নয়; এটি ব্যক্তিগত জীবনেরও নতুন অধ্যায়। একজন ছাত্রের কাছে ২০২৬ হতে পারে স্বপ্ন গড়ার বছর, একজন শ্রমিকের কাছে জীবিকার সংগ্রামের নতুন অধ্যায়, একজন লেখকের কাছে নতুন ভাবনার সূচনা। আলবেয়ার কামু বলেছিলেন, মানুষ আশাহীন পরিস্থিতিতেও অর্থ খুঁজে নিতে পারে। ২০২৬ আমাদের সেই অর্থ খোঁজার সুযোগ দেয়–নিজের অবস্থান থেকে, নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী।
পত্রিকার পাতায় নতুন বছরের কলাম মানেই কেবল আশার কথা লেখা নয়; বাস্তবের কঠিন সত্যও তুলে ধরা জরুরি। আমরা জানি, সমাজে বৈষম্য আছে, ন্যায়বিচারের সংকট আছে, মূল্যবোধের অবক্ষয় নিয়ে অভিযোগ আছে। কিন্তু এই সত্য উচ্চারণই পরিবর্তনের প্রথম ধাপ। দার্শনিক হেগেল বলেছিলেন, ইতিহাস এগোয় দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়েই। ২০২৬ সেই দ্বন্দ্বের বছর হতে পারে—যেখানে পুরোনো ও নতুনের সংঘাতে জন্ম নেবে আরও পরিণত সমাজ।
সবশেষে, ২০২৬ আমাদের সামনে একটি আয়নার মতো। এই আয়নায় আমরা নিজেদের দেখতে পাব–আমাদের আশা, ভয়, সাহস ও দুর্বলতা নিয়ে। নতুন বছর আমাদের কিছুই জোর করে দেয় না; সে কেবল সুযোগ এনে হাজির করে। সেই সুযোগকে আমরা কীভাবে গ্রহণ করব, সেটাই আসল প্রশ্ন।
সময়ের নতুন দরজায় দাঁড়িয়ে তাই আজ একটিই কামনা–২০২৬ যেন কেবল আরেকটি বছর না হয়, বরং একটি উপলব্ধির নাম হয়। যেখানে আমরা আরও মানবিক হব, আরও দায়িত্বশীল হব, আরও সাহস নিয়ে সত্যের পাশে দাঁড়াব। কারণ শেষ পর্যন্ত বছর বদলালেই জীবন বদলে যায় না; জীবন বদলায় মানুষের সিদ্ধান্তে, চিন্তায় ও কাজে। ২০২৬ হোক সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার বছর–যেখানে আমরা নিজেরাই নিজেদের নতুন বছরের সবচেয়ে বড় প্রতিশ্রুতি হয়ে উঠি।













