গতকাল ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫। বাংলাদেশের ইতিহাসের এক বিশাল অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল। মহান রবের ডাকে সাড়া দিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তিনি কেবল একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান ছিলেন না, তিনি ছিলেন এদেশের গণতন্ত্রের মূর্ত প্রতীক, সাহসের এক অবিনাশী বাতিঘর। ইতিহাসের পাতায় তাঁর নাম লেখা থাকবে এমন একজন নেত্রী হিসেবে, যিনি ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে একটি জাতির জন্য নিজের পুরো জীবনটা উৎসর্গ করে গেছেন।
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের শুরুটা কোনো পরিকল্পিত উচ্চাভিলাষ থেকে ছিল না। তিনি ছিলেন একজন সাধারণ গৃহবধূ, যিনি স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে সুখী জীবনযাপন করছিলেন। কিন্তু ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মর্মান্তিক শাহাদাত তাঁকে ইতিহাসের এক কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করায়। দলের ভাঙন রোধে এবং দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় লাজুক স্বভাবের সেই গৃহবধূকে বাধ্য হয়েই রাজপথে নামতে হয়। সেদিন তিনি যদি হাল না ধরতেন, তবে জাতীয়তাবাদী রাজনীতি হয়তো ওখানেই শেষ হয়ে যেত। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তিনি যে আপসহীন ভূমিকা পালন করেছিলেন, সারাটি জীবন দেশের মানুষের অধিকারের জন্য দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য যে আপসহীনভাবে কঠিন যে লড়াই করেছেন তা তাঁকে ‘আপসহীন নেত্রী’র উপাধিতে ভূষিত করে। ৯০ এ রোদে পুড়ে, রাজপথে মাইলের পর মাইল হেঁটে তিনি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করেছিলেন, হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী।
রাজনীতি বেগম খালেদা জিয়াকে ক্ষমতার স্বাদ যতটা দিয়েছে, তার চেয়ে সহস্রগুণ বেশি দিয়েছে বেদনা আর ত্যাগ। ২০০৭ সালের ১/১১-এর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তাঁর ওপর নেমে আসে ভয়াবহ চাপ। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীরা চেয়েছিল তাঁকে দেশ থেকে মাইনাস করতে। চিকিৎসার নাম করে তাঁকে বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার সব আয়োজন সম্পন্ন করা হয়েছিল। দেশ থেকে পরিবারসহ চলে যাওয়ার স্পেস ও দেয়া হয়। কিন্তু তিনি ছিলেন ইস্পাতকঠিন। সেই চরম মুহূর্তে তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেছিলেন–“দেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নাই, এটাই (বাংলাদেশ) আমার ঠিকানা। এই দেশ, এই দেশের মাটি-মানুষই আমার সবকিছু। কাজেই আমি দেশের বাইরে যাব না।” তাঁর এই একটি সাহসী সিদ্ধান্ত সেদিন বিদেশি প্রভুদের ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দিয়েছিল এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা পেয়েছিল। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, তিনি কেবল মাটির কাছাকাছি থাকা নেতা নন, তিনি মাটিরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। যদি তিনি সেদিন চলে যেতেন বাংলাদেশের চিত্রটা হয় তো অন্যরকম হতো।
বেগম জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনকে যদি এক কথায় সংজ্ঞায়িত করতে হয়, তবে তা হলো ‘নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম’। এই সংগ্রাম কখনোই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। আশির দশকে যখন তিনি রাজপথে নামেন, তখন থেকেই শুরু হয় তাঁর ওপর জেল-জুলুমের খড়গ। এরশাদ আমলে বারবার গৃহবন্দি হয়েছেন, কিন্তু দমে যাননি। তবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন ও মর্মান্তিক অধ্যায় ছিল গত দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনামল। বয়সের ভারে ন্যুব্জ এবং লিভার সিরোসিস, হার্ট ও কিডনির জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে বছরের পর বছর কাটাতে হয়েছে নির্জন কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। সেখানে আবার তাকে স্লো পয়জনিং করা হয়েছে। পুরান ঢাকার পরিত্যক্ত কারাগারে স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশ, চিকিৎসার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চনা এবং চরম মানসিক পীড়ন–সবকিছুই তিনি সহ্য করেছেন অসীম ধৈর্যে। তাঁকে হুইলচেয়ারে করে আদালতে টানা হয়েছে, জামিন নিয়ে নাটক করা হয়েছে, তবুও তিনি ছিলেন অবিচল। শারীরিক অসুস্থতা তাঁকে কাবু করলেও তাঁর ইস্পাতকঠিন মনোবলকে এক মুহূর্তের জন্যও দুর্বল করতে পারেনি শাসকগোষ্ঠী।
ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন একজন মমতাময়ী মা, অথচ ভাগ্যের রাজনীতির কারণে নির্মম পরিহাসে তাঁকে সইতে হয়েছে পুত্র হারানোর এক অকল্পনীয় যন্ত্রণা। ২০১৫ সাল, বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায় হয়ে থাকবে। তখন ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো মালয়েশিয়ায় মৃত্যুবরণ করেন। সে সময় বেগম জিয়া তাঁর গুলশান কার্যালয়ে বালুর ট্রাক দিয়ে অবরুদ্ধ। সন্তানের মৃত্যুসংবাদ যখন এল, তখন তিনি বন্দিদশায়। কোকোর মরদেহ যখন দেশে আনা হলো, একজন মা হয়েও তিনি সন্তানের শেষ জানাজায় শরিক হতে পারেননি। বাইতুল মোকাররমে লাখো মানুষের ঢল নামলেও, তৎকালীন রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতির কারণে মাকে সেই জনসমুদ্রে যেতে দেওয়া হয়নি। গুলশান কার্যালয়ের চার দেওয়ালের ভেতরেই সন্তানের কফিনের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁকে শেষ বিদায় জানাতে হয়েছিল। বাকরুদ্ধ হয়ে তিনি কেবল সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে অঝোরে অশ্রু বিসর্জন দিয়েছিলেন। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন ঘটনা বিরল, যেখানে একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দেশপ্রেমিক মাকে তাঁর সন্তানকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত করা হয়েছে। তবুও তিনি ভেঙে পড়েননি। বড় ছেলে তারেক রহমানকে পঙ্গু করে মিথ্যা মামলা দিয়ে পাঠানো হয়েছে নির্বাসনে। স্বামী নেই, এক সন্তান কবরে, আরেক সন্তান হাজার মাইল দূরে—এমন নিঃসঙ্গ, স্বজনহারা জীবনে তিনি চোখের পানি মুছে দেশবাসীকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বলেছিলেন, “আমার এই স্বজনহারা জীবনে দেশের মানুষই আমার স্বজন।”
জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং ফ্যাসিবাদের পতনের পেছনে বেগম জিয়ার এই দীর্ঘ নীরব সংগ্রাম ছিল অন্যতম অনুপ্রেরণা। তিনি ছিলেন সেই ‘ফিনিক্স পাখি’, যিনি ধ্বংসস্তূপ থেকে শুরু করে দুঃখের গভীর থেকে বারবার উঠে দাঁড়িয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন প্রতিহিংসা নয়, বরং ঐক্যের রাজনীতিই দেশকে এগিয়ে নেবে। সংসদে দাঁড়িয়ে ক্ষমতাসীন দলের প্রতি তিনি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছিলেন, “সংসদে গলাবাজি এবং বাহিরে মারামারি না করে দেশ গড়ার লক্ষ্যে কাজ করি।” আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু রেখে গেছেন এক বিশাল উত্তরাধিকার। তিনি শিখিয়ে গেছেন কীভাবে মেরুদণ্ড সোজা করে বাঁচতে হয়, কীভাবে প্রভুদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে দেশের স্বার্থ রক্ষা করতে হয়। বাংলাদেশের ভাতের অধিকার, ভোটের অধিকার এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষার লড়াইয়ে বেগম খালেদা জিয়া এক চিরস্মরণীয় নাম। এই মহীয়সী নারীর মৃত্যুতে আজ শোকস্তব্ধ পুরো জাতি। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এই মজলুম জননেতাকে জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন। আমিন। বিএনপিকেও যেন শহীদ জিয়াউর রহমান ও বেগম জিয়ার আদর্শকে ধারণ করে দেশের মানুষের ভাতের অধিকারের জন্য,গণতন্ত্র ও এদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আপোষহীনভাবে সংগ্রাম জারি রাখার জন্য আল্লাহ তৌফিক দিক।













