বাংলাদেশে নীরবে ডায়াবেটিস গ্রাস করে নিচ্ছে অসংখ্য মানুষের জীবন ও জীবিকা। গণমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের পরিসংখ্যানের বিমূর্ত সংখ্যার আড়ালে লুকিয়ে আছে হাজারো দুঃখগাথা। সবচেয়ে আশঙ্কার পরিসংখ্যান হলো, বাংলাদেশে ১ কোটি ৩৮ লক্ষাধিক মানুষ আজ এই দীর্ঘস্থায়ী অসুখে আক্রান্ত। প্রশ্ন জাগে, দেশে এত বিপুলসংখ্যক মানুষ কেন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছে? বিশেষজ্ঞেরা বারংবার সতর্ক করে বলে আসছেন, দীর্ঘ সময় বসে কাজ করা, কর্মদক্ষতার নামে অবিরাম মানসিক চাপ, অনিয়মিত খাবার গ্রহণ, প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের প্রতি অদম্য আসক্তি ও ব্যায়ামের প্রতি ভয়ানক উদাসীনতা— এসব কিছু মিলেই ডায়াবেটিসে আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বস্তুত, সমস্যাটি কেবল ব্যক্তি-পর্যায়ের নয়, এটা একটি দেশের সমষ্টিগত জীবনযাত্রার সংকট। আজকের অফিস ও শিল্পকারখানার পরিবেশে ‘লম্বা সময় বসে থাকাটাই যেন উত্পাদনশীলতার পরিমাপক। কর্মী কখন খেলো, কতটা হাঁটল, ঘুম ঠিকমতো হলো কি না— এসব নিয়ে ভাবার সময় কারো নেই!
ডায়াবেটিস আসলে একক কোনো রোগ নয়, এটা যেন এক উত্স, যা থেকে শাখা-প্রশাখার মতো অসংখ্য জটিলতা জন্ম নেয় —হৃদরোগ, কিডনি ব্যর্থতা, দৃষ্টিহানি, নার্ভ ক্ষয়, পায়ে অক্ষমতা, এমনকি অকালমৃত্যু পর্যন্ত। একবার এই রোগ দেহে স্থায়ী আসন গ্রহণ করলে, রোগীকে কেবল ঔষধই বহন করতে হয় না; বহন করতে হয় অবিরাম ব্যয়, অসহনীয় মানসিক চাপ, পরিবার-জীবনের টানাপোড়েন, কর্মক্ষমতা হ্রাস এবং আত্মবিশ্বাসের ধস। রোগটিকে সে কারণে অনেকে ‘নীরব ঘাতক’ বলে থাকেন। অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, ডায়াবেটিসের ব্যয় একটি পরিবারের কাঠামো ধসিয়ে দিতে সক্ষম। একটি পরিবারের মাসিক আয়ে যদি অর্ধেক বা তারও বেশি অর্থ ঔষধ, ইনসুলিন, পরীক্ষা, হাসপাতালে যাতায়াত এবং জটিলতার চিকিত্সায় ব্যয় হয়ে যায়, তা হলে সেই পরিবার কি প্রত্যাশিত উত্পাদনশীল থাকতে পারে? যেই তরুণ কর্মীর ডায়াবেটিসের কারণে অল্প বয়সে দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ বা নষ্ট হলো বা পায়ে ক্ষত হলো, তিনি কর্মক্ষেত্রে কি আগের মতো ভূমিকা পালন করতে পারবেন? সুতরাং এই ক্ষতি শুধু ব্যক্তিগত নয়; এটা সরাসরি একটি দেশের শ্রমশক্তি, উত্পাদন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকেই দুর্বল করে দেয়।
সুতরাং, বাংলাদেশে ১ কোটি ৩৮ লক্ষাধিক মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত —এটা কেবল একটি চিকিত্সাবিষয়ক পরিসংখ্যান নয়; বরং এটা একটি অর্থনৈতিক সতর্কসংকেত। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর চিকিত্সা ব্যয়, কর্মক্ষমতা হ্রাস, পরিবারের আয়ের ঘাটতি সব মিলিয়ে রাষ্ট্রের উত্পাদনশীলতা এবং রাজস্ব সম্ভাবনাও নষ্ট হচ্ছে। রাষ্ট্র যদি ১০ জনের মধ্যে এক জনকেও ডায়াবেটিসের কারণে অক্ষম হয়ে পড়তে দেয়, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে এটা কেবল স্বাস্থ্যব্যবস্থার ব্যর্থতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, উপরন্তু এটা জন্ম দেয় রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতার। অথচ উন্নত বিশ্বে এখন ‘হেলদি ওয়ার্ক এনভায়রনমেন্ট’-এর ধারণা দিনদিন বিস্তৃত হচ্ছে। সেখানে কর্মক্ষেত্রে হাঁটার ব্যবস্থা, নিয়মিত বিরতি, মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার কার্যক্রম, স্বাস্থ্যবান্ধব ক্যান্টিন, এমনকি বাধ্যতামূলক ব্যায়াম-সেশন পর্যন্ত প্রচলিত। সুতরাং এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আমাদের দেশের কর্মপরিবেশে এই ধরনের স্বাস্থ্যকর পরিবর্তন আনয়ন সম্ভব না হলে প্রতি বছরই ডায়াবেটিসে আক্রান্তের গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী হতে থাকবে।
তাহলে সমাধান কোথায়? বিশেষজ্ঞেরা বলেন, ৭০ শতাংশ ডায়াবেটিস প্রতিরোধযোগ্য। তবে প্রতিরোধ তখনই সম্ভব, যখন ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র মিলে একটি ‘স্বাস্থ্যবান কর্মসংস্কৃতি’ নির্মাণ করবে। খাদ্যাভ্যাসে সংযম, নিয়মিত হাঁটা, ঘুমের প্রতি যত্ন, মানসিক চাপ হ্রাস, কর্মক্ষেত্রে বিরতির সুযোগ, ব্যায়ামের পরিবেশ এবং স্বাস্থ্যবান খাদ্য সরবরাহ—এই কাজগুলো ব্যক্তি পর্যায়েই শেষ নয়; রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব এগুলোর নিশ্চয়তা প্রদান। সুতরাং, এখন আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে—আমরা কি আরেক প্রজন্মকে এই নীরব মহামারির নিকট সমর্পণ করাব, নাকি ‘হেলদি ওয়ার্ক এনভায়রনমেন্ট’ তৈরির ব্যাপারে যথোপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করব?













