যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে সব সময় ইহুদিনীতির প্রতি যে সমর্থন রয়েছে বলে আমরা জানতাম, জোহরান মামদানির নিউ ইয়র্কের মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর এই চিরাচরিত ধারণা পরিবর্তনের সময় এসেছে। প্রায় ২ লাখ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী মামদানির এই জয়ের নেপথ্যে নিঃসন্দেহে ইহুদিদের সমর্থন ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান হেভিওয়েট নেতাদের বারংবার সতর্কতা সত্ত্বেও, এমনকি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকি-ধমকিকে তোয়াক্কা না করে মামদানির প্রতি ভোটের এই জোয়ারের অর্থ একটাই, আর সেটা হচ্ছে— খোদ ইহুদিরাও ইসরাইলের নীতির প্রতি বিষিয়ে উঠেছে।
মামদানির প্রাপ্ত ভোটের মধ্যে ঠিক কত জন ইহুদি তাকে সমর্থন দিয়েছে, বিষয়টি স্পষ্ট না হলেও এক এক্সিট পোলের হিসাবে দেখা গেছে—৩২ শতাংশ ইহুদি ভোটার মামদানিকে ভোট দিয়েছেন। সংখ্যাটা বিশাল, জুইশ ভোটার রিসোর্স সেন্টারের তথ্যমতে, শতকরা ৪৬ জন ইহুদি উদার এবং ১৭ জন কট্টরপন্থি বলে দাবি জানানো হয়েছে, এদের মধ্যে আবার ৫৯ জন ডেমোক্র্যাট এবং ১৭ জন রিপাবলিকান সমর্থক।

এখন কথা হচ্ছে, এখানে ডেমোক্র্যাট বা রিপাবলিকান নয়, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ইসরাইলপন্থি নীতি সব সময় অপরিবর্তিত থেকেছে। এই বাস্তবতায় ঠিক কী কারণে ইসরাইলবিরোধী প্রচারণা সত্ত্বেও এবং নিউ ইয়র্কে এলে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহুকে গ্রেফতার করা হবে, ইসরাইলের সঙ্গে কোনো ধরনের বাণিজ্যিক এবং বিনিয়োগের সম্পর্ক রাখবেন না ইত্যাদি প্রচারণার পরও মামদানির প্রতি এই গণজোয়ার এলো। এর কারণ বিশ্লেষণ করতে গেলে প্রাথমিকভাবে এটাই বলা যায়, ইসরাইলের সাধারণ নাগরিকরাও এখন মনে করছেন, নেতানিয়াহুর কাছে তারা জিম্মি হয়ে রয়েছেন, এক প্রবল শক্তিশালী ডানপন্থি জোটের সমর্থন নিয়ে গণহত্যাকে বহাল রেখে তিনি তার শরিকদের আস্থায় নিয়ে এখন পর্যন্ত ক্ষমতায় টিকে রয়েছেন, যা বহির্বিশ্বে ইসরাইলের নাগরিকদের উপহাসের পাত্রে পরিণত করেছে। যদিও গাজায় ইসরাইলের আগ্রাসনের শুরুটা হয়েছিল সাবেক ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের হাত ধরে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময়ে এসে এটা আরো ব্যাপক হয়েছে। এক্ষেত্রে মামদানির জনপ্রিয়তার মূল কারণ হচ্ছে—ডেমোক্র্যাট টিকিটে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও তিনি প্রচলিত ইসরাইলপন্থি ধারণার বাইরে গিয়ে নিজের মতামতকে ভোটারদের সামনে নিয়ে এসেছেন, যেন তাদের মনের কথাটাই বলেছেন।
নিজেকে ডেমোক্র্যাট বলে স্বীকার করলেও সঙ্গে ‘সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট’ কথাটা যুক্ত করেছেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে কট্টরপন্থা অবস্থানের বিপরীতে গিয়ে উদারপন্থার অনুসারী হিসেবে নিজেকে চিনিয়েছেন ভোটারদের কাছে। যদিও নিউ ইয়র্ক সিটি ডেমোক্র্যাটদের শক্ত ভিত বলে পরিচিত। বরাবরই যে সেখানে তারা তাদের অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছেন তা নয়, এর আগে বিভিন্ন সময়ে রিপাবলিকান মেয়র ছিলেন। এমন অবস্থায় বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিটিগুলোর মধ্যে অন্যতম এই সিটির মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হতে তাকে অনেক কৌশলী হতে হয়েছে, আবার সেখানকার অধিবাসীদের দীর্ঘদিনের দীর্ঘশ্বাসকে অনুধাবন করতে হয়েছে।
নিউ ইয়র্ক বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল নগরীগুলোর একটি, সবচেয়ে বেশি অভিবাসী অধ্যুষিত নগরী। নগরীর ৮৩ লাখ অধিবাসীর মধ্যে শতকরা ২৩ জনই অভিবাসী, যার একটা উল্লেখযোগ্য অংশ মুসলিম হলেও সর্বস্তরের মানুষের মধ্যেই রয়েছে তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ এবং দৈনন্দিন জীবনকে চালিয়ে নিতে হিমশিম খাওয়ার মতো অবস্থা। নগরীর মূল সমস্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম গণপরিবহন, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি সমস্যা সমাধানে কোনো ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি অতীতে। নিউ ইয়র্ক শহর তো বটেই, এই স্টেটের শতকরা ২৫ শতাংশ মানুষও অভিবাসী এবং একই সংখ্যার মানুষ বিভিন্ন শ্রমে নিয়োজিত রয়েছে। এসব সমস্যার সমাধানকে মামদানি তার অগ্রাধিকারের তালিকায় রেখেছেন। নির্বাচনের মাঠে নেমে তিনি স্বল্প আয়ের এবং অভিবাসীদের মন জোগাতে চেষ্টা করেছেন, যেখানে রয়েছেন সব ধর্ম, গোত্র ও সম্প্রদায়ের মানুষ। একজন মুসলিম হয়েও প্রচলিত ধারায় তিনি ইসলামপন্থা বেছে নেননি, বরং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরাইলের ভূমিতে হামাসের হামলাকে নিন্দা করেছেন এবং এর ফলে ইসরাইলের কর্মকাণ্ডকে গণহত্যার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তার এসব যৌক্তিক বক্তব্য ও অবস্থানকে সমর্থন করেছেন সব ধরনের ভোটার। মামদানি নির্বাচিত হলে নিউ ইয়র্কে অবস্থানরত ইহুদিদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন চলবে—ডোনাল্ড ট্রাম্পের এ ধরনের হুঁশিয়ারিকে তাই আমলে নেননি কোনো ইহুদি ভোটার, তারা বিশ্বাস করেছেন যে অতীতের অবস্থা থেকে পরিত্রাণের সময় এসেছে, তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের সময় এসেছে।
কিছু দুঃসাহসিক স্বপ্নের কথা ঘোষণা করেছেন মামদানি। নির্বাচিত হলে পরবর্তী চার বছর সরকারি আবাসনের ভাড়া বাড়াবেন না, দরিদ্রদের ওপর অতিরিক্ত করারোপের পরিবর্তে ২ শতাংশ হারে ধনীদের ওপর করারোপ করবেন এবং অর্জিত অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে দরিদ্র এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ২ লাখ আবাসন নির্মাণ করবেন, শিশুদের জন্য বিনা মূল্যে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান, প্রতিটি এলাকায় সরকারি ব্যবস্থাপনায় মুদির দোকান এবং নগরীর মানুষের জন্য বিনা মূল্যে বাস চালু করার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। এসব কিছু করতে হলে কেবল ধনীদের ওপর আয়কর বাড়ালেই চলবে না, আরো বিশাল অঙ্কের অর্থের জোগাড় করতে হবে, সেটা তিনি কীভাবে করবেন, সেই পরিকল্পনার কথা জানাননি। অন্যদিকে নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, মামদানিকে বিজয়ী করলে নিউ ইয়র্কের জন্য ফেডারেল অর্থের জোগান বন্ধ করে দেবেন তিনি। এই হুমকির পরও বিজয়ী হলেন মামদানি। বলা যায়, ট্রাম্পের হুমকিকে পালটা চ্যালেঞ্জ করেছে নিউ ইয়র্কবাসী।
মামদানির বিজয়ে ট্রাম্প এখন কী করবেন, সেটাই দেখার বিষয়। এই বিজয় ট্রাম্পের আত্মগরিমায় বড় ধরনের আঘাত বলে মনে করা হয়। ট্রাম্পের ব্যবসার মূলকেন্দ্র নিউ ইয়র্ক এবং এই শহরকে ঘিরেই তার সব ব্যাবসায়িক কর্মকাণ্ড সম্পাদিত হয়। সেখানে তার আধিপত্যকে খাটো করছে ৩৪ বছরের এক তরুণ, তাও আবার মুসলিম ও অভিবাসী। এখন দেখার বিষয় তিনি তার ঘোষণামতো নিউ ইয়র্কের জন্য ফেডারেল বরাদ্দ বন্ধ করে দেবেন কি না কিংবা সেটা করতে পারবেন কি না। মার্কিন আইন অনুযায়ী মার্কিন প্রেসিডেন্টের এক্ষেত্রে একক কোনো ক্ষমতা নেই, পুরো বিষয়টি কংগ্রেস ও সিনেট হয়ে প্রেসিডেন্টের অনুমোদনের জন্য আসে। সুতরাং তিনি যা বলছেন, তা করাটা সহজ হবে না। তবে ভোগাতে পারবেন তিনি, অর্থ ছাড়ে বিলম্ব করে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করতে পারবেন।
অন্যদিকে মামদানির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হলে কেবল নগরের করের অর্থে এই খরচের জোগান দেওয়া যাবে না, দরকার পড়বে ফেডারেল অর্থের অতিরিক্ত বরাদ্দ। বর্তমানে নিউ ইয়র্কের মোট বাজেটের ৬ শতাংশ বা ৭ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার আসে ফেডারেল ফান্ড থেকে, সেটার সরবরাহের বাইরেও বছরে আরো কয়েক বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত দরকার পড়বে মামদানির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে। এই খরচ দিতে ব্যক্তিগতভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্প রাজি হবেন না, সেটা নিশ্চিত করেই বলা যায়। তাহলে তাকে অবশ্যই বিকল্প উেসর অন্বেষণ করতে হবে। মামদানি নিজেও সেটা জানেন, তবে কী সেই বিকল্প, সেটা স্পষ্ট করেননি।
সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী জানুয়ারি মাসে নিউ ইয়র্কের প্রথম মুসলিম এবং ১৮৯২ সালের পর থেকে সর্বকনিষ্ঠ মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন জোহরান মামদানি। মামদানির এই জয়ে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছেন সেখানে বসবসকারী অভিবাসীরা, যাদের অধিকাংশই নিম্ন আয়ের এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের জন্য নিত্য সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য তারা মামদানির ওপর ভরসা করেছেন। এই বিশাল অভিবাসীদের মধ্যে একটা উল্লেখযোগ্য অংশে রয়েছে বাংলাদেশি অভিবাসী। মামদানি তাদের অনেকের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে প্রচার করেছেন। বর্তমানে নিউ ইয়র্ক নগরে ৩ লক্ষাধিক বাংলাদেশির বসবাস, এর বাইরে রয়েছে আরো প্রায় ২০ হাজার অবৈধ বাংলাদেশি, যারা জীবিকার তাগিদে প্রতিনিয়ত নানা ঝুঁকি মোকাবিলা করে শহরের বিভন্ন দোকান, কারখানায় কাজ করে যাচ্ছেন। নিত্য পুলিশের ভয়, ধরা পড়লে দেশে প্রত্যাবর্তন, এমন হুমকি থেকে মুক্ত থাকতে এবং কিছুটা উন্নত জীবনের আশায় মামদানির ওপর তারা নির্ভর করছেন। মামদানিও তাদের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।
বিজয়ী ভাষণে মামদানি জানিয়েছেন, তার বিজয় একজন অভিবাসীর বিজয় এবং এই শহর অভিবাসীদেরই থাকবে। নানা কর্মপরিকল্পনার মধ্যে এবং তার মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরুর আগে এই অভিবাসীদের কল্যাণে যদি সুনির্দিষ্টভাবে কিছু করতে পারেন, বিশেষ করে অবৈধভাবে যারা প্রতিনিয়ত জীবন ও জীবিকার ঝুঁকি নিয়ে নিউ ইয়র্কে বসবাস করছেন, তাদের ভাগ্য পরিবর্তনে সহায়তা করতে পারেন, তাহলে সেটাই হবে অভিবাসীদের জন্য সবচেয়ে বড় পাওনা।













