তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে একটি সাধারণ বিষয় লক্ষণীয়। তাহা হইল-আজ যাহারা ক্ষমতায় থাকেন, পটপরিবর্তনের পর তাহাদের সম্পর্কে নানা কথাবার্তা চাওর হয়। এমন সব গল্প বা রিপোর্ট প্রকাশিত হয় যাহা দেখিয়া সেই সময়ে যাহারা সরকারে ছিলেন তাহারাও অনেক ক্ষেত্রে বিস্মিত হন। তবে কমবেশি একই গতিধারা চলিতে থাকায় তখন মানুষের মনে নূতন করিয়া প্রশ্ন জাগে, তাহা হইলে পরিবর্তনটা কীজন্য আনয়ন করা হইল?
এইসব দেশে যাহারা দীর্ঘদিন ধরিয়া ক্ষমতায় থাকেন তাহারা একসময় যাহা খুশি তাহা বলিতে থাকেন, করিতে থাকেন। তাহাদের আঙ্গুলি হেলনে প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীসহ বিচার বিভাগের লোকজনও উঠ-বস করেন। সেই দুঃসহ ও শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি হইতে পরিবর্তনের আকাঙ্খায় মানুষ সংগ্রাম করেন এমনকি আত্মহুতি দেন। ইহার পরও যখন একজন স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য বলেন যে, যাহাকে পারেন অ্যারেস্ট করেন একটি নির্দিষ্ট ঘরানার নেতা-কর্মী হইলেই চলিবে, তখন ইহা দ্বারা কী বোঝায়? ইহা কি আগের স্বৈরাচারী মানসিকতার পরিচায়ক নহে? যাহাকে খুশি তাহাকে ধরিবার অর্থ হইল কেহ অন্যায়-অপরাধ না করিলেও তাহাকে ধরিতে হইবে। ইহা তো আইনের ভাষা হইতে পারে না।
এই বিষয়টি একটু গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করা উচিত। যাহারা দায়িত্বশীল তাহারা যদি ইহার আগে অবসর জীবন-যাপনের মধ্যে থাকেন, তাহা হইলে কোনো কথা নাই। কেননা সেই সময় তাহার চিন্তা করিবার অফূরন্ত সময় ছিল। সেই অভ্যাস হইতে বিষয়টিকে একটু ঠান্ডা মস্তিষ্কে ও ধীরচিত্তে ভাবিয়া দেখা কি উচিত নহে? আজি হইতে বহু বৎসর পূর্বে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এক গানে লিখিয়াছেন: ’এ কূল ভাঙে ও কূল গড়ে, এই তো নদীর খেলা/ (রে ভাই) এই তো বিধির খেলা।/ সকাল বেলার আমির রে ভাই ফকির সন্ধ্যাবেলা॥’ এই গানের শেষের দিকে তিনি আরো লিখিয়াছেন: ’রাতে রাজা সাজে নাট-মহলে/দিনে ভিক্ষা মেগে পথে চলে/শেষে শ্মশান-ঘাটে গিয়ে দেখে/ সবই মাটির ঢেলা।/এই তো বিধির খেলা রে ভাই/ ভব-নদীর খেলা॥’ (গীতিগ্রন্থ, বুলবুল, দ্বিতীয় খণ্ড) এই গান যুগের পর যুগ ধরিয়া গাওয়া হইতেছে। কিন্তু ইহার রুঢ় সত্যের মুখোমুখি আমরা কয়জন হইতেছি? পৃথিবীর কোনো কিছুই স্থায়ী নহে। নশ্বর এই পৃথিবীতে ক্ষমতা হইল কচুপাতার ওপর পানির মতো। বিধায় আমরা ক্ষমতায় থাকিয়া এমন কাজ করিব না, যাহা লইয়া প্রজন্ম হইতে প্রজন্মান্তরে প্রশ্ন উঠিবে। উঠিবে সমালোচনার ঢেউ।
’সকাল বেলার আমির রে ভাই ফকির সন্ধ্যাবেলা’ কবির এই কথা শ্বাশ্বত ও সত্য। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে যাহারা ক্ষমতায় থাকেন, তাহারা ইহা বেমালুম ভুলিয়া যান। ইহার পরও আমাদের অধৈর্য্য হইলে চলিবে না। কেননা আমরা এমন এক সমাজে বসবাস করিতেছি যেইখানে ধৈর্য্যধারণ ও সহিষ্ণুতার কোনো বিকল্প নাই। ইহাছাড়া তৃতীয় বিশ্বের দেশ হিসাবে আমাদের সীমাবদ্ধতাগুলিও বুঝিতে হইবে। এইসব দেশে কোনো সমস্যার রাতারাতি সমাধান কঠিন। রাজনীতি-অর্থনীতিসহ আমাদের সবকিছুতে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হইতে আরো সময়ের প্রয়োজন। তাহার মানে আমরা হাতপা গুটাইয়া বসিয়া থাকিব তাহাও নহে। প্রয়োজনে অ্যাকশন নিব বটে, তবে সমাজকে ধৈর্য্য ও সহনশীলতার দিকে অবশ্যই ফিরাইয়া আনিতে হইবে।
বাংলায় একটি প্রবাদ আছে: যেই যায় লঙ্কা সেই হয় রাবণ। উন্নয়নশীল দেশে একসময় যাহারা শাসকদের স্বৈরাচার বলিতেন, দেখা গেল ক্ষমতায় গিয়া তাহারাও একই উপাধি ধারণ করিলেন। আবার কেহ কেহ স্বৈরাচার হইতে হইয়া গেলেন ’স্বৈরাচারের দোসর’। ইহা উন্নতি না অবনতি তাহা পাঠকরাই ভালো বলিতে পারিবেন। অথচ তাহারা একসময় দেশের স্বাধিকার ও স্বাধীনতা সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করিয়াছেন। এমন যদি হয় এই বলাই শেষ কথা, তাহা হইলে কোনো সমস্যা নাই। কিন্তু এইসব দেশে আজ যাহারা ক্ষমতায় আছেন, তাহাদের কপালে যে একই পরিণতি লেখা নাই তাহা আমরা কী করিয়া বলি? এমনকি আগামীতে যাহারা ক্ষমতায় আসিবেন, তাহাদেরও যে একই তকমা দেওয়া হইবে না তাহার নিশ্চয়তা কোথায়? অতএব, সবকিছুতে ধৈর্য্য ও সহিষ্ণুতার পরিচয় দেওয়া ছাড়া আমাদের গত্যন্তর নাই। একটি সুস্থ ও সবল রাষ্ট্র গঠনে ইহাই হইল পূর্বশর্ত।













