হেমন্তের দিনগুলো আলোছায়ার মিশেলে তৈরি হয় নরম বিকেল। হালকা কুয়াশা আর বাতাসে ধানের ঘ্রাণে ম-ম করে মাঠ। দাঁড়িয়ে থাকা ধানের নাড়াগুলো মনে করিয়ে দেয়, একটা ঋতু তার দায়িত্ব শেষ করল। এ সময়টায় ফসলের ঘ্রাণে ভর করে পালা বদলের সময়। এই বদলের মধ্যেই আসে শীতের প্রথম ঘোষণা। গ্রামের ঘরে ঘরে ধান ভানা, চাল কোটার শব্দে যোগ হয় একধরনের ঘরোয়া সুর। শীতের এই ঘ্রাণ, এই শব্দ, এই অনুভব—সব মিলিয়ে তৈরি করে অনন্য এক নিবিড়তা! সে সময়টা পার করে এখন দেশে চলছে পূর্ণ শীতকাল।
এই সিজনে গ্রামীণ শীত মানেই পিঠাপুলির মৌসুম। নতুন ধানের গুঁড়ো, খড়কুটোর উনুন আর টগবগে পাটালি গুড়ের মিষ্টি ঘ্রাণ মিলে বাংলার শীতকে করে তোলে মোলায়েম এক ঋতু। দাদি-নানিদের হাতের পুলি, ভাপা ও চিতই পিঠার ধোঁয়া যেন পরিবারকে আরো কাছে টেনে আনে। নিজেরা খাওয়ার পাশাপাশি কেউ আবার সযত্নে পাঠিয়ে দেয় দূরের আত্মীয়-বন্ধুর বাড়িতে।
তবে এত বদলের মধ্যে দুঃখজনক হলো—হাটবাজারে এখনো প্রকাশ্যে বিক্রি হয় অতিথি পাখি। শীতের শুরুতেই একশ্রেণির শিকারি পরিযায়ী পাখি শিকারে তত্পর হয়ে ওঠে। অথচ, ইংল্যান্ডের নর্থ হ্যামশায়ার, সাইবেরিয়া কিংবা অ্যান্টার্কটিকার তীব্র শীতে প্রচণ্ড খাদ্যাভাব থেকে বাঁচতে আকাশে ডানা মেলে দূরপথ পাড়ি দিয়ে আসে এই পাখিগুলো।
শীত মৌসুমে এদেশে আসা পাখিদের মাঝে সোনাজঙ্গ, খুরুলে, কুনচুষী, বাতারণ, শাবাজ, জলপিপি, ল্যাঞ্জা, রাজহাঁস, বালিহাঁস, হরিয়াল, দুর্গা, রাজশকুন, লাল বনমোরগ, তিলে ময়না, রামঘুঘু, জঙ্গি বটের, ধূসর বটের, হলদে খঞ্চনা, কুলাউ ইত্যাদি প্রধান। বাংলাদেশের নানা প্রান্তে দেখা মেলে অতিথি পাখিদের। এসব অতিথি পাখির কিচিরমিচিরে মুখর থাকে পুরো প্রকৃতি। এক মোহনীয় রূপ ধারণ করে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গা।
আজ এমনই এক পরিযায়ী পাখির কথাই বারবার মনে উঠে আসছে। ‘কুনচুষী’ পাখি বা মাইগ্রেটরি বার্ড, সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের দিকে আসে এবং মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত থাকে। এরা সুদূর সাইবেরিয়া, মঙ্গোলিয়া এবং হিমালয় অঞ্চলের দেশগুলো থেকে আসে, যেখানে শীতকালে তীব্র ঠান্ডা ও খাদ্যের অভাব দেখা দেয়। আকারে ছোট হয় এবং এদের পালকের রং ও কণ্ঠস্বর বেশ আকর্ষণীয় হয়, যা আমাদের দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আরো বাড়িয়ে তোলে। ‘কুনচুষী’ (Common Pochard) বা মৌটুসি পরিবারের (Nectariniidae) সদস্য বলে দেখতে সাদৃশ্য পাওয়া যায়। চুনোমুখো মৌটুসির (Ruby-cheeked Sunbird) মতো লম্বা ও সরু ঠোঁট হওয়ায় কুনচুষীও ফুলের মধু খেতে বড্ড ভালোবাসে!
এদের সুমিষ্ট কণ্ঠের জন্য অনেকে এদেরকে গায়ক পাখিও বলে থাকে। সাধারণত, এরা শস্যদানা, কীটপতঙ্গ, এবং ছোট মাছ খেয়ে জীবন যাপন করে। কুনচুষী (Orange-headed Thrush) পাখির পুরুষ ও স্ত্রী দেখতে প্রায় একই রকম হলেও, পুরুষ পাখি সাধারণত একটু বেশি উজ্জ্বল রঙের হয়, বিশেষ করে মাথায় ও দেহে।
অন্যদিকে, স্ত্রী পাখির রঙে সবুজাভ বা বাদামি ভাব বেশি থাকে। তবে কিছু ক্ষেত্রে স্ত্রী পাখিও বেশ কালারফুল হতে পারে, এবং তাদের আচরণগত পার্থক্য (যেমন—প্রজনন ও গায়কি) তাদের লিঙ্গ বুঝতে সাহায্য করে।
পুরুষ পাখি সাধারণত সুরেলা ও বিচিত্র গান গায়। ইন্টারেস্টিং! স্ত্রী পাখি অনেক সময় পুরুষদের চেয়ে আগে বা পরে পরিযায়ী হয় এবং বাচ্চাদের দেখাশোনা করে, যা তাদের বিপরীত লিঙ্গের আচরণগত পার্থক্যকে নির্দেশ করে।
১৯৮০ সাল থেকে মিরপুর চিড়িয়াখানার হ্রদে, নরসিংদীর চাতল বিল, নীলফামারীর নীলসাগর, নিঝুম দ্বীপ, হাকালুকি হাওর, বরিশালের দুর্গাসাগর, সিরাজগঞ্জের হুরা, টাঙ্গুয়ার হাওর, হাটল হাওর ও সোনাদিয়ায় অতিথি পাখির দেখা মিলছে। প্রাকৃতিকভাবেই তারা তাদের পরিচর্যা করতে পারে, তবে অতিথি হয়ে আসার কারণে আমাদেরও কিছু দায়িত্ব রয়েছে। যেমন—শিকার বন্ধ করা, উপযুক্ত খাদ্যের ব্যবস্থা করা (যেমন শস্যদানা ও শাকসবজি), এবং ওদের জন্য নিরাপদ আবাসস্থল (হাওর, বিল) নিশ্চিত করা, যা প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা এবং তাদের সংখ্যা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। ওরা যখন ঝাঁক বেঁধে থাকে বিরক্ত না করা ও ছবি তোলার সময় দূরত্ব বজায় রাখাও যত্নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বাংলাদেশে পাখি শিকার একটি দণ্ডনীয় অপরাধ, যা বন্যপ্রাণী আইন, ২০১২ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এই আইন অনুযায়ী তপশিলভুক্ত বন্য বা অতিথি পাখি হত্যা করলে বা পোষা দণ্ডনীয় অপরাধ। যার শাস্তি সর্বোচ্চ এক বছর কারাদণ্ড, এক লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে, এবং একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি করলে শাস্তি দ্বিগুণ হওয়ার বিধান রয়েছে। তবুও শিকারিদের ফাঁদে পড়ায় প্রতি বছর এসব অতিথি পাখির সংখ্যা কমছে। এভাবে প্রতি বছর অতিথি পাখি নিধন হতে থাকলে প্রকৃতি হারাবে তার নিজস্ব রূপ, বিলুপ্ত হবে বহু পাখির প্রজাতি। তাই সবারই উচিত, অতিথি পাখিদের নিরাপত্তা দানে মানবিক হওয়া পাশাপাশি প্রয়োজন সঠিক নজরদারি।













