সমাজে ন্যায়বিচারের অভাব ও আইনের প্রতি অনাস্থা থেকে অনেক মানুষ নিজেই ন্যায় প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব নিতে চায়। এরই ফল আমরা দেখতে পাই মব জাস্টিস বা গণপিটুনি নামক এক ভয়ংকর সামাজিক ব্যাধি। এটি একপ্রকার অরাজকতা, যেখানে মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নেয় এবং বিচারব্যবস্থার বাইরে গিয়ে অপরাধী বা সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে শাস্তি দিয়ে দেয়। বিচারের দীর্ঘসূত্রতা, আদালতে একটি মামলার রায় পেতে কখনো কখনো বছরের পর বছর সময় লেগে যায়। এতে অনেক মানুষ ধৈর্য হারিয়ে ফেলে এবং দ্রুত প্রতিশোধ নিতে চায়।
সামাজিক ক্রোধ ও উত্তেজনা, কোনো একটি ভয়ংকর অপরাধ ঘটলে জনসাধারণের মনে একধরনের ক্ষোভ জমে ওঠে। বিশেষ করে নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো অপরাধের ক্ষেত্রে জনমনে প্রচণ্ড ক্ষোভ দেখা যায়, যা মুহূর্তের মধ্যে সংঘবদ্ধ প্রতিশোধে রূপ নেয়। সঠিক তথ্যের অভাব ও গুজব, অনেক সময় নিরপরাধ ব্যক্তি শুধুমাত্র গুজবের ভিত্তিতে গণপিটুনির শিকার হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বা লোকমুখে ছড়িয়ে পড়া ভুল তথ্য জনগণকে উত্তেজিত করে তোলে এবং তারা বিচার না করেই হামলে পড়ে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যর্থতা, অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ অপরাধীদের গ্রেফতার করলেও রাজনৈতিক প্রভাব বা ঘুষের কারণে তারা ছাড়া পেয়ে যায়। এতে জনগণের বিশ্বাস জন্মে যে অপরাধীরা কখনো শাস্তি পাবে না। মব জাস্টিসের নেতিবাচক প্রভাব—নিরপরাধ মানুষের মৃত্যু। অনেক সময় নিরপরাধ ব্যক্তিকে ভুল বোঝাবুঝির কারণে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয়। পরবর্তী সময়ে প্রমাণিত হয় যে, সে কোনো অপরাধই করেনি! এটি মানবাধিকার লঙ্ঘনের চরম দৃষ্টান্ত। আইনের শাসনের অবমূল্যায়ন;আইন-আদালত থাকার পরও যদি মানুষ নিজের হাতে আইন তুলে নেয়, তবে সেটি রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার প্রতি এক চরম অবমাননা। এটি সমাজকে অরাজক করে তোলে।
সামাজিক বিশৃঙ্খলা ও ভয়ভীতি;মব জাস্টিস স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হলে সমাজে একধরনের আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। মানুষ যে কোনো সময় গণপিটুনির শিকার হতে পারে, এমন আতঙ্ক বিরাজ করলে অপরাধীদের জন্য সুযোগ তৈরি। মব জাস্টিসের সুযোগ নিয়ে অনেক দুষ্কৃতকারী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ব্যক্তিগত শত্রুতা মেটানোর জন্য মিথ্যা অভিযোগ ছড়িয়ে কাউকে হত্যা করতে পারে। এটি সমাজে চরম অবিচার সৃষ্টি করে। রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ থেকে উত্তোরণের উপায় হলো বিচারব্যবস্থার সংস্কার;আইনের দ্রুত প্রয়োগ এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। সচেতনতা বৃদ্ধি; জনগণকে বুঝতে হবে যে, গণপিটুনি কোনো সমাধান নয়, বরং এটি অপরাধকেই প্ররোচিত করে।
গুজব নিয়ন্ত্রণ : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজবের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকারিতা বৃদ্ধি : পুলিশ ও প্রশাসনকে আরো দায়িত্বশীল হতে হবে, যাতে জনগণের আইন-আদালতের ওপর আস্থা থাকে।
শিক্ষা ও মূল্যবোধ : নৈতিকতা ও আইনের গুরুত্ব সম্পর্কে স্কুল-কলেজে পাঠদান নিশ্চিত করতে হবে।
মব জাস্টিস কোনো ন্যায়বিচার নয়, এটি অপরাধ। সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের ধৈর্য ধরতে হবে এবং আইনের প্রতি বিশ্বাস রাখতে হবে। নইলে একদিন হয়তো আমরাও সেই গণপিটুনির শিকার হতে পারি!













