বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হয় জ্ঞান সৃষ্টির কেন্দ্র, যেখানে পাঠদানের পাশাপাশি গবেষণার মাধ্যমে নতুন ভাবনা, নতুন তথ্য ও নতুন সমাধানের জন্ম হয়। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো,বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জ্ঞান উৎপাদন ও বিতরণের কেন্দ্র হলেও, গবেষণার অভাবে তা ব্যাহত হচ্ছে।আমাদের দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা এখনো প্রান্তিক অবস্থানে রয়েছে।পাঠদানকেন্দ্রিক একমুখী শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরে গবেষণা কার্যক্রম ক্রমেই গুরুত্ব হারাচ্ছে, যা উচ্চশিক্ষার মানের জন্য একটি বড় সংকেত।
বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ওপর পাঠ্যসূচি শেষ করার চাপ এতটাই বেশি যে গবেষণার জন্য সময় ও মানসিক প্রস্তুতি অনেক সময় তৈরি হয় না। অনেক বিভাগে গবেষণা বলতে শুধুমাত্র ডিগ্রি অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় একটি আনুষ্ঠানিক কাজকে বোঝানো হয়। মৌলিক গবেষণার পরিবর্তে আগের গবেষণার পুনরাবৃত্তি বা তত্ত্বভিত্তিক কাজেই সীমাবদ্ধ থাকছেন শিক্ষার্থীরা। এছাড়াও—
অপর্যাপ্ত তহবিল : গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক বরাদ্দ না থাকা একটি প্রধান কারণ।আধুনিক ল্যাবরেটরি, গবেষণা সরঞ্জাম, আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশনার সুযোগ—এসবের ঘাটতি গবেষণাকে নিরুৎসাহিত করে। অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষকরা নিজ উদ্যোগে গবেষণা করতে আগ্রহী হলেও প্রশাসনিক জটিলতা ও আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে তা বাস্তবায়ন করতে পারেন না।
উৎসাহের অভাব : গবেষণার জন্য শিক্ষকদের পর্যাপ্ত স্বীকৃতি ও প্রণোদনার অভাব।
দুর্বল গবেষণা সংস্কৃতি : বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার প্রতি সামগ্রিক আগ্রহ ও উদ্যোগের অভাব।
গবেষণাহীন এই সংস্কৃতির প্রভাব সরাসরি পড়ছে শিক্ষার গুণগত মানের ওপর। শিক্ষার্থীরা সমালোচনামূলক চিন্তা, সমস্যা বিশ্লেষণ ও নতুন জ্ঞান সৃষ্টির দক্ষতা অর্জনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিধারী হলেও বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তারা অনেক সময় পিছিয়ে পড়ছে। এর প্রভাব সম্পর্কে বলা যায়—গবেষণার অভাবে নতুন জ্ঞান তৈরি হয় না, ফলে শিক্ষার মান উন্নত হয় না। গবেষণাহীনতার কারণে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে পিছিয়ে পড়ছে। গবেষণা কার্যক্রম না থাকায় শিক্ষার্থীরা নতুন কিছু শিখতে বা উদ্ভাবন করতে আগ্রহী হয় না।
গবেষণা একটি দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের চালিকাশক্তি। গবেষণাহীনতা দেশের সামগ্রিক অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উৎসাহিত করা জরুরি। এজন্য সরকারের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত তহবিল বরাদ্দ করতে হবে। নিশ্চিত করতে হবেআধুনিক ল্যাব, লাইব্রেরি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুবিধা।
শিক্ষকদের কর্মভার কমানো : শিক্ষকদের গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে।
গবেষণার জন্য প্রণোদনা : গবেষণায় উৎসাহিত করার জন্য শিক্ষকদের স্বীকৃতি ও পুরস্কারের ব্যবস্থা করতে হবে।গবেষণা
সংস্কৃতি গড়ে তোলা : বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করতে হবে এবং শিক্ষার্থীদের গবেষণায় যুক্ত করতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, গবেষণা ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় মানেই অপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়। টেকসই উন্নয়ন ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের জন্য গবেষণাহীন বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা এখন সময়ের দাবি।













