ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আসন্ন। অথচ রাজনৈতিক দলগুলো এখনো ন্যূনতম নারীর জন্য ৫ শতাংশ মনোনয়ন দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও পূরণ করেনি! উপরন্তু নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ৫১টি দলের মধ্যে ৩০টিরই নেই কোনো নারী প্রার্থী! শুভংকরের ফাঁক এবং ফাঁকি আর দৃষ্টিভঙ্গির সীমাবদ্ধতা কতটা প্রকট হলে এমনটা হতে পারে—তা এ চিত্র থেকে সহজেই অনুমেয়। মোদ্দা কথা, রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের প্রকৃত ব্যবধানটা কতটা অসামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটাই দেখার।
জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫-এর ধারা ২২ (খ)-(ঘ) অনুযায়ী যেখানে প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ন্যূনতম ৫ শতাংশ নারী প্রার্থীর মনোনয়ন নিশ্চিত করার কথা, সেখানে তা ৪ শতাংশের সামান্য বেশি মাত্র! অর্থাত্ দেখা যাচ্ছে, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে জমা দেওয়া ২ হাজার ৫৬৮ জন প্রার্থীর মধ্যে মাত্র ১০৯ জন নারী প্রার্থী! কোথায় এর রহস্য?
জুলাই সনদে যেখানে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে, পরবর্তী নির্বাচনগুলোতে ধাপে ধাপে এ সংখ্যা ৩৩ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণের, সেখানে শুরুতেই হোঁচট খাওয়ার মতো এই চিত্র নারীদের কতটা আশান্বিত করবে? সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় ৩০টি রাজনৈতিক দলে কোনো নারী প্রার্থীই রাখা হয়নি? মানে নারীর জন্য নির্বাচনের পথ বন্ধ। এ কেমন নারীর প্রতি সদয় আচরণ? এ তো অবজ্ঞার নামান্তর। এর মধ্যে দিয়ে কি এটাই প্রমাণিত হয় না—নারী অধিকারের প্রতি বিদ্বিষ্ট মনোভাব এবং নারীর যোগ্যতা ও মর্যাদার প্রতি অসম্মান?
রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে নারীর পর্যাপ্ত ও প্রয়োজনীয় অংশগ্রহণ ও ভূমিকা রাখার সুযোগই যদি অবারিত না হয়, তা হলে নারীর অধিকার সুরক্ষা ও প্রতিষ্ঠা পাবে কীভাবে? আমরা বলি বটে নারী অধিকার নারীর সমানাধিকার ও সক্ষমতার কথা; কিন্তু বাস্তবে তা কতটা বিশ্বাস করি এবং অনুধাবন করি? নির্বাচনেই যদি নারীর অংশগ্রহণের ন্যূনতম সুযোগ নিশ্চিত না করি, তা হলে আমাদের রাজনৈতিক ও মানসিক শঠতা কি এর মধ্য দিয়ে প্রকাশ হয়ে পড়ে না?
সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে (১০)-এ বলা আছে, ‘জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে মহিলাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করিবার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে’। ১৯ (১)-এ বলা হয়েছে, ‘সকল নাগরিকদের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করিতে রাষ্ট্র সচেষ্ট হইবে।’ এখন প্রশ্ন—সংবিধানের এই মূলনীতি দলগুলো উপেক্ষা করে রাজনীতি ও নির্বাচন করে কীভাবে এবং কার স্বার্থে? গত তিন দশকের সমাজ ও রাজনীতিতে নারীর সদর্প বিচরণ এবং কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারণী ভূমিকা সর্বজনবিদিত। সরকারপ্রধান, বিরোধীদলীয় প্রধান, স্পিকার, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী—ইত্যাদি অবস্থানে নারীর অধিষ্ঠান গোটা নারী সমাজকেই অনুপ্রাণিত ও আলোচিত করেছে। রাজনীতি ছাড়াও শিক্ষা, অর্থনীতি, সমাজনীতি শিল্প-সংস্কৃতিতেও নারীর যোগ্যতা ও সক্ষমতা প্রশংসিত হয়েছে। নারী পুরুষতান্ত্রিক সমাজকাঠামোর মিথ ভেঙে সক্ষমতা ও সমতার ভিত্তিতে নতুন সমাজকাঠামো বিনির্মাণের প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় নারীর কর্তৃত্ব ও প্রতিনিধিত্ব নতুন মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার স্মারক হিসেবেও বিবেচিত। আইন প্রণয়ন ও ক্ষমতার অংশীদারত্বে নারীর যোগ্যতা ও নেতৃত্বগুণ বহুল আলোচিতও; তথাপি এখন কি ভিন্ন চিত্রের চিন্তা করা বিধেয়!
পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কিয়দংশ নারীর এ অগ্রযাত্রায় ঈর্ষান্বিত। তাদের নারীদ্বেষমূলক মানসিকতা পরিহার করতে হবে। নারীকে ভাবতে হবে উন্নয়ন ও অগ্রগতির সহায়ক শক্তি হিসেবে। নির্বাচনি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নারীকে দূরে সরিয়ে রেখে কিংবা তাদের অন্ধকারে রেখে প্রগতির সরণিতে বেশি দূর অগ্রসর হওয়া যাবে না। এ কথাটি মনে রাখা বাঞ্ছনীয়, বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় নারী-পুরুষের সমান গুরুত্ব নিশ্চিত করা না গেলে জাতি হিসেবে আমরা আনন্দিত ও গর্বিত হতে ব্যর্থ হব।
ভুলে গেলে চলবে না, নারী শুধু সক্ষমতার প্রতীক নয়, ঐক্য রক্ষারও প্রতীক। মানবিক মূল্যবোধ অক্ষুণ্ন ও অব্যাহত রাখতে নারীর সমানাধিকার সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন একটি স্বতঃসিদ্ধ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে নির্বাচনের মধ্য দিয়েই সরকার পরিবর্তন হয় এবং জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়। এতে যেমন ভোটের অধিকার নিশ্চিত হয়, তেমনি জনমতেরও প্রতিফলন ঘটে। অবশ্য এর জন্য গোটা প্রক্রিয়াটাই হতে হয় অবাধ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ এবং শান্তিপূর্ণ। ভোটারদের ভোটাধিকার প্রয়োগে স্বতঃস্ফূর্ত এবং সমন্বিত প্রয়াস দেখেই বোঝা যায়—নির্বাচন তাদের মধ্যে কী দারুণ প্রভাব বিস্তার করে। গণতন্ত্রের প্রথম ও শেষ কথাই হচ্ছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। নির্বাচন সে সত্যেরই প্রতিফলন। এখন কথা হচ্ছে, আমরা কাদের নির্বাচিত করি? যাদের করি, তারা কি আমাদের সুখদুখ এবং অধিকারের কথা মনে রাখেন? তারা কি বাস্তবতার নিরিখে বর্তমান বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন? নাকি তারা ফিরে যেতে চান পশ্চাত্পদ চিন্তার জগতে! আসন্ন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই চিন্তা করতে হবে দল ও প্রার্থীর সততা ও নৈতিকতা ও যোগ্যতা। দূরদর্শী নেতৃত্ব ছাড়া কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন সম্ভব নয়।













