শিষ্টাচার শব্দটি আরবি, ফার্সি, উর্দুভাষায় ব্যবহূত হয়। ইংরেজিতে Best Behavior এবং বাংলায় বলা হয় ‘আদব’। আদব, বিনয়, নম্রতা, ভদ্রতা, নৈতিকতা, মানবিকতা, সততা বোঝায়। ভদ্র ব্যবহার সুন্দর আচরণই শিষ্টাচার। শিষ্টাচার ব্যক্তি, সমাজ ও জাতীয় জীবনের গৌরবময় আচরণের ‘জনক’। বিনয় মানুষের মাথায় সম্মানের মুকুট পরায়। আদব-কায়দা, স্বল্প সময়ে মানুষের সুন্দর ও সার্থক জীবন গড়ে দেয়। ভালো ব্যবহার মানুষের বিবেকের জাগরণ ঘটায়। শিষ্টাচার খ্যাতি অর্জনের দলিল। আদব সমাজের উপকার করার মহোত্তম শিক্ষা।
মহান আল্লাহ তার ইবাদত ও সৃষ্টিজগতের সেবা করতে মানব সৃষ্টি করেছেন। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমরা মানব, শ্রেষ্ঠ জাতি, তোমরা মানুষকে সত্ কাজের আদেশ দেবে, অসত্ কাজ থেকে বিরত রাখবে। রসুল (স.) বলেছেন, ‘সদুপদেশ দেওয়াই দিন’। জমিনে যে আছে, তার প্রতি তোমরা দয়া করো, আসমানে যিনি আছেন, তিনি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।’
ইসলাম ধর্মে আদবকে ইমানের অঙ্গ বলা হয়। সব ধর্ম ও সমাজে আদবের কোনো বিকল্প নেই। শান্ত ও সুখী সমাজ গঠনে আদব শ্রেষ্ঠ শিক্ষা। সমাজে আদবের কমতি থাকলে অরাজকতা, বিশৃঙ্খলা ও মূল্যবোধের অবক্ষয় সৃষ্টি হয়। শিষ্টাচার বিবেকের জ্যোতি। জ্ঞান-বুদ্ধি ছাড়া শিষ্টাচার প্রতিষ্ঠা হয় না, আদব ছাড়া জ্ঞানের প্রসার ঘটে না। জ্ঞানের সাঁকো সুশিক্ষা। শিষ্টাচার সমাজ পরিচালনা ও সভ্যতার ভারসাম্য এবং ধারাবাহিকতা রক্ষা করে। কুসংস্কার, অসভ্যতা মুছে দিয়ে সত্য-ন্যায় রচনা করা শিষ্টাচার। মক্কার হেরাগুহায় ধ্যানমগ্ন থাকাবস্থায় ফেরেশতা জিরাইল (আ.) এসে বললেন, ‘হে নবি (স.) পড়ো, তোমার প্রভুর নামে!’ মহান আল্লাহ বললেন, ‘তুমি ক্ষমার নীতি গ্রহণ করো, লোকদের সত্ কাজের আদেশ দাও, মূর্খদের এড়িয়ে চলো। শিষ্টাচার আল্লাহ ও তার রসুল (স.)-এর শিক্ষা। সমাজের অনাচার-অত্যাচার, অপকর্ম দূর করাও বিবেকবান মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্য। সমাজে ভালো ও মন্দ, সত্ ও অসত্, ইমান আর বেইমান একসঙ্গে চলতে পারে না। উত্তম আচরণ দিয়ে মন্দকে প্রতিহত করা আদবের শিক্ষা। আদব সমাজ নিয়ন্ত্রণ করবে। আদব ধৈর্যধারণের শিক্ষা দেয়। বড়দের সম্মান, ছোটদের স্নেহ করা আদবের আদর্শ শিক্ষা। শিষ্টাচার অশ্লীলতা, পরনিন্দা, মন্দকাজ, হিংসা-বিদ্বেষ সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকার শিক্ষা দেয়। পৃথিবীর সব প্রাণীর সঙ্গে উত্তম আচরণ শ্রেষ্ঠ আদব। মানবতা, দয়া, উত্তম ব্যবহার মানুষকে সম্মানে ভূষিত করে।
শিক্ষার মূল লক্ষ্য সামাজিক সুখশান্তি ও চরিত্রবান সমাজ গঠন করা, যার আচরণ সুন্দর, তার চরিত্র উত্তম। যিনি ওয়াদা পূরণ করেন, তিনি সত্যবাদী। যিনি মানুষের হক নষ্ট করেন, আমানতের খেয়ানত, অবৈধ উপার্জন করেন, নেশাগ্রস্ত থাকেন, হিংসুক, সুদ-ঘুষ খান—তিনি চরিত্রবান নন। যার হাত, পা, মুখ, জিহ্বা নিয়ন্ত্রণে থাকে, যিনি কোনো মানুষকে কষ্ট দেন না, বরং আপদে-বিপদে সহায়তা করেন, ঐ ব্যক্তি মনুষ্যত্বের অধিকারী। স্বর্গ ও নরক শুধু পরকালের বিষয় নয়, ইহলোকেও বিবেকহীন মানুষ নামের পশুর, নিষ্ঠুর অপকর্মের যন্ত্রণায় জগতে যুগে যুগে নরকতুল্য হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। আদবের শিক্ষা—ধর্ম, বর্ণ, গোত্রে কালো সাদায় কোনো বিরোধ নেই, সব মানুষ সমান। এজন্যই ছন্দের জাদুকর কবি সত্যন্দ্রনাথ দত্ত তার মানবজাতি কবিতায় বলেছেন,—‘কালো আর ধলো বাহিরে কেবল, ভেতরে সবারই সমান রাঙ্গা।’ অর্থাত্ পৃথিবীর সব মানুষের রক্ত লাল। মানুষের প্রতি দয়া, শিষ্টাচারের স্বর্গীয়রূপ। মহাজ্ঞানী পণ্ডিত, অসীম ক্ষমতাবানদের সম্মান থাকে না, যদি না হন স্বজাতির সেবক।
জীবনসত্তার ঘর থেকে মানবসত্তার ঘরে ওঠার মই হচ্ছে—সুশিক্ষা। সুশিক্ষা মনুষ্যত্বের বিকাশ ও প্রচারের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলে, যা সমাজের আয়নায় ধরা পড়ে। যদি সমাজে সুশিক্ষা প্রভাব বিস্তারে সফল না হয়, তাহলে সে বিদ্যা-শিক্ষা অনর্থক। সুশিক্ষা সুগন্ধি তিলে তিলে ছড়ায়। জ্ঞান ও জ্ঞানের সত্কর্ম দিয়ে মনুষ্যত্ব ছাড়া কোনো মানুষের গৌরব ও ইতিহাস গড়ার সুযোগ নেই। চরিত্রবানদের গুণ সমাজ গ্রহণ করে। কিন্তু অর্থবিত্ত, দাম্ভিকতা, অহংকার—সমাজে মর্যাদা থাকে না। কলম সভ্যতার ধারালো অস্ত্র। অসহায়ের পাশে কলম নিয়ে দাঁড়ানো মানবতা। সক্রেটিস, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ক্ষুরধার লেখনীর জন্য বাঙালি জীবনাচারের পথে খুঁজে পায়। মূল্যবোধ ও চেতনার বাহন মাতৃভাষা। নিঃস্বার্থ রক্তত্যাগে রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার বাংলাভাষার রচয়িতা। দেশপ্রেমের কারণেই একগঙ্গা রক্ত ঢেলে বাংলার স্বাধীনতা।
রাষ্ট্র ও জনগণের কল্যাণ করা মনুষ্যত্বের উন্নতির খাতা। কোনো রাষ্ট্রের মানুষ মানবিক ও অমানবিক বিশ্ব ইতিহাসে রচিত হয়। এটাই মানব ইতিহাস। সমাজ, রাষ্ট্রের উন্নতি, অগ্রগতির পথে বাধা-প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা মনুষ্যত্বের কাজ নয়। প্রাণিকুলের আপদে-বিপদে, দুর্যোগে সহায়তা করা, পাশে দাঁড়ানো মানবতা। এমন মহত্ শিক্ষা শিষ্টাচারের প্রাণশক্তি। মানুষ লোভ, স্বার্থ, হিংসা, বিকৃত মানসিকতায় আকৃষ্ট হলে, তখন সে অমানুষ। কুকুরকে এক বেলা সামান্য খাবার দিলে ঋণ পরিশোধে মরিয়া হয়ে যায়। ইতিহাস সাক্ষী—পৃথিবীতে যত নামকরা মানুষ খুন হয়েছেন, সবাই আপন জনের হাতে বা তাদের ষড়যন্ত্রের কারণে। মানুষ যার খায়, সবার আগে তার ক্ষতি করে বেশি। সমাজের অনাচার, অত্যাচার ব্যভিচার ভালো মানুষ সহ্য করতে পারেন না। কিন্তু তারা কিছু করতেও পারেন না। বিবেক যেন বন্দি। মা-বাবার হাতে ছেলেমেয়ে, ছেলে-মেয়ের হাতে বাবা-মা, ছাত্রের হাতে শিক্ষক খুন হচ্ছেন। ছাত্রছাত্রী শিক্ষক মিলে অশ্লীলতায় জড়িত। কৃষক, শ্রমিক মেহনতি মানুষ নয়, বরং বড় বড় শিক্ষিত লোক ঘুষ-সুদ খান এবং দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। অশিক্ষিত, নেশাগ্রস্ত মাস্তান, পাতিনেতা, কিশোরগ্যাং সমাজ নিয়ন্ত্রণ করছে। পান থেকে চুন খসলেই প্রাণহানি। বেপরোয়া মানুষের কারণে অস্থির সমাজ। সমাজে খুনখারাবি দখলবাজির মহোত্সব চলছে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনীর নিরাপত্তা নেই। দেশ জুড়ে এক অবক্ষয়ের ভয়াবহ চিত্র। এমন অবস্থা সভ্য সমাজে চলতে পারে না। শিষ্টাচার প্রাণভয়ে জাদুঘরে লুকিয়েছে। মানুষের, মানুষের প্রতি আস্থা, বিশ্বাস ভরসা নেই। মায়ের কোলেও শিশু নিরাপদ নয়। সমাজের মাথায় যেন পচন ধরেছে।
জাতীয় রাজনীতিতে শিষ্টাচারের বড় অভাব। রাজনীতির দর্শন হলো—উত্তম ব্যবহার। কিন্তু বয়স্ক, নীতি-আদর্শবান, শ্রদ্ধাভাজন জ্ঞানীদের স্থান নেই। অর্থ-ক্ষমতার দাপটে চলছে রাজনীতি। রাজনীতির দলীয় মঞ্চের সামনে শ্রোতা নেই। সবাই মঞ্চে গিয়ে নেতা সরিয়ে ছবি তোলেন। লোহার বা ইস্পাতের তৈরি মঞ্চ ভেঙে পড়লে লজ্জাও লাগে না। বরং যারা দূর থেকে এসব দেখেন, তারা আক্ষেপ করছেন। আদর্শহীন রাজনীতি সমাজকে পেছনের দিকে টেনে নিচ্ছে। শিক্ষা, যোগ্যতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতার কোনো মূল্য নেই। মোবাইল সাংবাদিকতা বিজ্ঞানের এক আদর্শহীন আবিষ্কার। সাংবাদিকতার নীতি-আদর্শ মাটিচাপা পড়েছে। লেখাপড়া নেই, ১০ শব্দের বাক্যে পাঁচ বানান ভুল। তার পরও তিনি সাংবাদিক। দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আদর্শ বানের পানিতে ভেসে গেছে। ভালো ছাত্র ভালো থাকতে পারছেন না। আদর্শবান শিক্ষক বাক্প্রতিবন্ধীর মতো থাকেন। শিক্ষাব্যবস্থায় শিষ্টাচার খুবই অপমানিত। শিক্ষিতদের মা-বাবারাই যান বৃদ্ধাশ্রমে। হারাম-হালালের কোনো পার্থক্য নেই। মানুষে ও খাদ্যে ভেজাল। এ দেশে একসময় মসজিদ-মক্তবসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা খুবই কম ছিল। প্রতি গ্রামে দুই-এক জন শিক্ষিত ছিলেন। সেসময় গ্রামাঞ্চলে তেমন অপরাধ ছিল না। বছরে কোনো থানায় একটিও খুনের ঘটনা ঘটত না। মানুষের মধ্যে শ্রদ্ধাবোধ ভালোবাসা ছিল। সমাজে ছিল সুখ ও শান্তি। কিন্তু এখন সব হারিয়ে ঘরে ঘরে অশান্তি। একান্নবর্তী পরিবার এখন খণ্ড-বিখণ্ড।
অবক্ষয় একটি মারাত্মক সামাজিক ব্যাধি। এ ব্যাধি মানবদেহের ক্যানসারের মতো সমাজ-সভ্যতা ধ্বংস করতে পারে। মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কোনো চিকিত্সা নেই। অবক্ষয় জটিল ও কঠিন। রাষ্ট্র-সমাজ এক না হলে মূল্যবোধের উন্নতি হবে না। মানুষের সুন্দর আচরণ ও নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে সমাজে শিষ্টাচার গড়ে তুলতে হবে। শিষ্টাচার সমাজের সেতুবন্ধ তৈরি করতে পারে। কেবল নৈতিক শিক্ষা ও মানবতার কর্মই নতুন প্রজন্মের আগামী দিনের পথনির্মাণে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। যেহেতু সুশিক্ষা ও মনুষ্যত্ব অচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ, সেহেতু সুশিক্ষা ও নৈতিকতা সমাজের মূল্যবোধ এবং মহত্বের প্রদীপ জ্বালাতে পারে। দেশের শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন এখন অবশ্যম্ভাবী।













