বাংলাদেশে সাধারণত ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী নাগরিককে প্রবীণ নাগরিক হিসেবে গণ্য করা হয়। কিছু উন্নত দেশে এই বয়সসীমা ৬০ বা ৬৫ বছর ধরা হয়, যা দেশ অনুযায়ী আলাদা হতে পারে। ভারতের মতো কিছু দেশে নির্দিষ্ট আইন অনুযায়ী ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী নাগরিকদের প্রবীণ নাগরিক হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। এই বয়সের পর তারা সমাজে বিশেষ সম্মান ও সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন।
মানুষের বাস্তব জীবনে বার্ধক্যের বাস্তবতাকে অস্বীকার করার কোন উপায় নেই । আজকে যারা যুবক তারা আগামী দিনের প্রবীণ। তবে মানব জীবনে বার্ধক্য বা প্রবীণত্ব হচ্ছে সবচেয়ে নাজুক ও স্পর্শকাতর অবস্থা। শুধু বয়সের কারণে বা বার্ধ্যকের কারণে প্রবীণরা গুরুত্বহীন অবস্থায় অবমূল্যায়নের জীবন ধারণ করবেন, তা এই সচেতন ও সভ্যসমাজে হতে পারে না। প্রবীণরা আমাদের জন্ম দিয়েছেন, তারাই আমাদের শিশুকাল, শৈশবকাল ও কৈশোরকালের লালন-পালনকারী। আমাদের সমাজ, সংসার, রাষ্ট্র এমনকি পৃথিবীটা বাসযোগ্য হয়েছে এই প্রবীণ মানুষগুলোর পরিশ্রমে, তাদের প্রজ্ঞা, বুদ্ধিমত্তায়। তাদের আত্ম-উত্সর্গিত জীবনের চরম সুবিধাভোগী আমরাই। তাই তাদের প্রতি কোন বৈষম্য নয়, কোন করুণা নয় কোন অবহেলা নয় বরং প্রদর্শন করতে হবে নৈতিক, আদর্শিক ও ধার্মিক মহা প্রতিদান। তারাই আমাদের জীবনের শত প্রেরণার নিরন্তন উত্স, জীবন্ত কিংবদন্তি।
একজন সক্ষম মানুষ তার জীবনের পুরোটা সময় শেষ করে দেয় যে পরিবারের জন্য, জীবনের শেষ সময়ে সেই পরিবারে থাকাটা তার নৈতিক অধিকার। তাই পরিবারই হচ্ছে প্রবীণদের আসল ঠিকানা। অথচ বাবা-মা প্রবীণ হয়ে গেলে আজকের সন্তানরা তাদেরকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসেন। কিন্তু বৃদ্ধাশ্রমে বাবা-মায়ের মনের যে লুকানো আকুতি তা সন্তানরা দেখতে পায় না।
চলতি সপ্তাহে দেশের কিছু শীর্ষ দৈনিক পত্রিকা নিঃসঙ্গ অবস্থায় মৃত্যুবরণকারীদের ভয়াবহ সংখ্যা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। একটি পত্রিকার ‘জাপানে গত ৬ মাসে নিজবাড়িতে নিঃসঙ্গ অবস্থায় মারা গেছেন প্রায় ৪০ হাজার মানুষ’ শিরোনামের সংবাদটি দেশের বিবেকবান মানুষের মনে নাড়া দিয়েছে। জাপানের জাতীয় পুলিশ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত নিঃসঙ্গ অবস্থায় মৃত্যুবরণকারীর সংখ্যা ২১ হাজার ৭১৬, যা আনুপাতিক হারে বছরে দাঁড়ায় ৮৬ হাজার ৮৬৪। এমন মৃত্যু মোটেও কাম্য নয়।
আমরা জানি, কানাডা ও আমেরিকায় সিনিয়র সিটিজেনরা বিভিন্ন ধরনের সুবিধা পেয়ে থাকেন, যেমন মাসিক পেনশন, স্বাস্থ্যসেবা, এবং কিছু ক্ষেত্রে কর ছাড়। কানাডায় সিনিয়র সিটিজেনরা বৃদ্ধ সুরক্ষা (OAS) পেনশন, কানাডা পেনশন প্ল্যান (CPP) থেকে মাসিক সুবিধা, এবং প্রাদেশিক সহায়তার অধীনে আবাসন ফি-তে সাহায্য পেতে পারেন। আমেরিকায়, নির্দিষ্ট বয়স এবং আয়ের উপর ভিত্তি করে কর ছাড় পাওয়া যায়। কানাডায় ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী নাগরিক এবং স্থায়ী বাসিন্দারা প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পেতে পারেন, যা বয়স বাড়ার সাথে সাথে বাড়ে। যারা কানাডা পেনশন প্ল্যান (CPP)-তে অবদান রেখেছেন, তারা ৬০ বছর বয়স থেকে মাসিক অবসরকালীন পেনশন পেতে পারেন। যেসব সিনিয়র সিটিজেনের পর্যাপ্ত সঞ্চয় নেই, তাদের অবসরকালীন বাড়ির ফি মেটাতে প্রদেশগুলো বিভিন্ন সহায়তা প্রোগ্রাম প্রদান করে। যোগ্যতা অনুযায়ী, কিছু সিনিয়র সিটিজেন এককালীন অর্থ সহায়তাও পেতে পারেন। কানাডার সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা প্ল্যানের আওতায় সিনিয়র সিটিজেনরা চিকিত্সা সেবা পান।
এমতাবস্থায়, বয়স্ক তথা সিনিয়র নাগরিকদের কল্যাণে- বাংলাদেশ সিনিয়র সিটিজেন ফোরাম গঠিত হয়েছে, এর নেতৃত্ব প্রদান করছেন- সাবেক তত্তাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা- ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। আমরা আশা করি, তার নেতৃত্বে বাংলাদেশের সিনিয়র সিটিজেনরা তাদের অধিকার লাভ করবেন। বিশেষ করে স্বল্প ভাড়ায়- সব শ্রেণীর যাতায়ত, হাসপাতালে সাশ্রয়ী মূল্যে পৃথক চিকিত্সা সেবাসহ বাসস্থান প্রক্রিয়ার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে- প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের বিষয়ে আমরা সরকারের সুদৃষ্টি আকর্ষণ করছি।













