শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড এবং এই শিক্ষা ক্ষেত্রের মূল উপাদান হলো শিক্ষার্থী। তবে পরিতাপের বিষয়, সাম্প্রতিক বছরগুলো জুড়ে এই মূল উপাদানে যেন মরীচিকা ধরছে! প্রায়শই গণমাধ্যমের শিরোনামে উঠে আসছে নানা মরীচিকাময় প্রবণতা—যেমন, শিক্ষার্থীদের দ্বারা সংঘর্ষ, খুন, হুমকি, আত্মহত্যা ইত্যাদি। যদিও এই সংস্কৃতি আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে নতুন নয়।
গত অক্টোবরে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও সিটি ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা এবং এ থেকে সৃষ্ট নারকীয় তাণ্ডব দেখে আমরা হা-হুতাশ করেছিলাম। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে উভয় পক্ষের মধ্যে কথা কাটাকাটি এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে বহু শিক্ষার্থী আহত হওয়ার পাশাপাশি সিটি ইউনিভার্সিটির কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হয়। এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা সংঘর্ষে জড়িয়েছিলেন। সেটাও ঘটেছিল তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে। একইভাবে রাজধানীর সিটি কলেজ ও আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইটপাটকেল নিক্ষেপ, পালটাপালটি ধাওয়ার ঘটনা যেন নিয়মিত ও স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এ কোন প্রবণতা, এটা কীসের আলামত?
এ তো গেল শিক্ষার্থীদের সহিংস হয়ে ওঠার চিত্র। তাদের আত্মহননের প্রবণতাও আঁতকে ওঠার মতো! এক জরিপে জানা যায়, কেবল ২০২৩ সালেই আত্মহত্যা করেছেন ৫১৩ জন শিক্ষার্থী। পরের বছর, অর্থাৎ ’২৪ সালে দেশে ৩১০ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা করেন। শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার এই প্রবণতা ক্রমবর্ধিষ্ণু। তুচ্ছ ঘটনার কারণেই এভাবে আত্মহননের পথে হাঁটছেন তারা।
শিক্ষার্থীদের মন ও মানসিকতার এহেন চিত্র দেখে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, শিক্ষা ক্ষেত্রে আমরা যতটুকু অর্জন করছি, তা কতোটা ফলপ্রসূ? সাক্ষরতার হারের দিক থেকেও আমাদের অগ্রগতি কতটুকু? শিক্ষার প্রকৃত লক্ষ্য হলো, মানুষের আচার-আচরণে স্থায়ী পরিবর্তন আনা, যা বহুল আকাঙ্ক্ষিত। অথচ দেশে লক্ষাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকলেও এর বাস্তব প্রতিফলন ঘটানো যাচ্ছে না। শিক্ষার্থীরা হলেন মৌমাছির মতো, যাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নামক মধুর চাকে এসে নিজেকে সমৃদ্ধ করার কথা। এভাবে তারা নিজেদের সমৃদ্ধ করবেন, জাতিকে আলোর পথ দেখাবেন, কিন্তু আমরা কি সেই চিত্র দেখতে পাচ্ছি? বরং বলতে হয়, এ যেন মধুর চাকে মধুহীন মৌমাছি।
লেখক ও চিন্তক আবুল ফজল তার লেখা ‘মানব-কল্যাণ’ প্রবন্ধে বলেন, ‘রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু প্রশাসন চালানোই নয়, জাতিকে আত্মমর্যাদাসম্পন্ন করে তোলাও রাষ্ট্রের এক বৃহত্তর দায়িত্ব।’ কথাটি নীতিনির্ধারণী মহল তো বটেই, আমাদের সবার জন্যই প্রযোজ্য। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় যে আকাল চলছে, তা দূর করতে প্রয়োজন সঠিক নীতিমালা ও দিকনির্দেশনা এবং শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের দায়িত্বশীল আচরণ।













