শিক্ষক—এই শব্দটি কেবল একটি পেশা নয়, বরং এটি নৈতিকতা ও আস্থার সর্বোচ্চ প্রতীক। যা একটি জাতির মেরুদণ্ড তৈরি করে। অথচ ২০২০ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এই পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের প্রাথমিক, মাধ্যমিক, মাদ্রাসা এবং উচ্চশিক্ষা স্তরের প্রতিষ্ঠান-প্রধান, অধ্যক্ষ বা সুপারদের দ্বারা সংঘটিত অপরাধের জাতীয় চিত্রটি কেবল হতাশার জন্ম দেয় না, বরং এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার কেন্দ্রে এক মারাত্মক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের গভীর ক্ষত উন্মোচন করে। এখানে একটা বিষয় পরিষ্কার, তা হলো—এই সমস্যা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো অনিয়ম নয়, বরং এটি শিক্ষাঙ্গনের গভর্ন্যান্স-কাঠামোয় শেকড় গেড়ে বসা এক সুসংগঠিত ও পদ্ধতিগত ব্যধি।
আসলে, এই অপরাধগুলোর দুইটি প্রধান ধারা। একদিকে ছাত্রছাত্রী ও নারী সহকর্মীদের প্রতি যৌন নিপীড়ন ও হয়রানির মতো ফৌজদারি অপরাধ, যা সরাসরি ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩)’-এর বিধান এবং কর্মক্ষেত্রে নারীর মর্যাদা রক্ষাকারী ‘উচ্চ আদালতের ২০০৯ সালের নির্দেশ (যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠন)’-এর কঠোরতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে। অন্যদিকে ব্যাপক আর্থিক দুর্নীতি, যেখানে নিয়োগ বাণিজ্য থেকে শুরু করে সরকারি বরাদ্দ পর্যন্ত লুট করা হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ রংপুর বিভাগের কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর উপজেলার একটি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে নিরীক্ষণ কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রায় আড়াই কোটি টাকা আত্মসাতের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে, যা প্রমাণ করে এই আর্থিক অনিয়মগুলো দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ ও দণ্ডবিধির ধারা ৪০৯ (সরকারি কর্মচারী কর্তৃক অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ)-এর স্পিরিটকে উপহাস করে।
এখানে গভর্ন্যান্সের দুর্বলতার গভীরে নিহিত মূল শিকড়গুলো বুঝতে হবে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) মতো গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো বারবার নিশ্চিত করেছে যে, এই দুর্নীতিগুলোর সঙ্গে স্কুল ম্যানেজিং কমিটি (এসএমসি) বা গভর্নিং বডির রাজনৈতিক প্রভাব ও অনিয়মের একটি সরাসরি যোগসূত্র বিদ্যমান। মূল সমস্যাটা হলো, প্রধান শিক্ষকের ক্ষমতা যখন স্থানীয় প্রভাবশালী কমিটির যোগসাজশে একটি ‘দায়মুক্তির সিন্ডিকেট’ তৈরি করে, তখন সেই সুরক্ষা চক্র ভেদ করে কেন্দ্র থেকে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে অপরাধ প্রমাণিত হলেও অভিযুক্ত কেবল ‘সতর্ক’ হয়ে দায়মুক্ত হন এবং আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠেন।
রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী একটি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধেও কিছু অভিযোগ এই পদ্ধতিগত সংকটের একটি নিখুঁত প্রতিচ্ছবি। তার বিরুদ্ধে নন-গভর্নমেন্ট এডুকেশনাল ইনস্টিটিউশন (টিচার্স অ্যান্ড এমপ্লয়িজ) সার্ভিস রুলস-এর বিধিমালা ও আচরণবিধি লঙ্ঘন করে রাজনৈতিক দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী হওয়া, স্কুলের তহবিল থেকে অর্থ আত্মসাত্ এবং সর্বোপরি একজন নারী সহকারী শিক্ষকের প্রতি অশালীন ও যৌন হয়রানিমূলক মন্তব্য করার মতো গুরুতর নৈতিক স্খলনের অভিযোগ রয়েছে। এমন অভিযোগ দেশের আরো নানা স্কুল-কলেজের ক্ষেত্রেই রয়েছে। কিন্তু নানা অভিযোগ ওঠা সত্ত্বেও প্রশাসন কর্তৃক প্রায়শ কার্যকর তদন্ত বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয় না দুঃখজনকভাবে। ফলে দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থী, শিক্ষক-কর্মচারী, অভিভাবক ও সাধারণ মানুষ নিজেরাই বিচার চাইতে বাধ্য হন। কিন্তু তাতেও কি প্রশাসনের টনক নড়ে?
আমরা যদি এই নৈতিক ধস থেকে শিক্ষাঙ্গনকে বাঁচাতে চাই, তাহলে প্রয়োজন কেবল নীতিগত প্রতিশ্রুতি নয়, বরং আমূল প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। কোনো তদন্তের দীর্ঘসূত্রিতা নয়; অভিযোগ দাখিল হওয়ার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে অভিযুক্তকে তাত্ক্ষণিকভাবে সাময়িক বরখাস্ত করে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও সময়বদ্ধ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। নিয়োগ বাণিজ্যের মূল উত্স বন্ধ করতে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা স্থানীয় ম্যানেজিং কমিটির হাত থেকে প্রত্যাহার করে কেন্দ্রীয় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের (যেমন এনটিআরসিএ) মাধ্যমে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা অপরিহার্য। একই সঙ্গে, ম্যানেজিং কমিটিগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত শিক্ষাবিদ, পেশাদার এবং অবসরপ্রাপ্ত দক্ষ সরকারি কর্মকর্তাদের হাতে ন্যস্ত করা অত্যাবশ্যক, যা নন-গভর্নমেন্ট সেকেন্ডারি স্কুলস ম্যানেজমেন্ট রুলস, ২০০৯-এর উদ্দেশ্য পূরণ করবে। আমাদের বিবেক কি এতে সাড়া দেবে না?













