মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লডিয়া শিনবাউম সম্ভবত তার মেয়াদের সবচেয়ে কঠিন রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। মিচোয়াকানে সহিংসতা ও বিস্ফোরণের জের ধরে তার দেশটিতে নজিরবিহীন জেন-জি বিক্ষোভ চলছে, যা শিনবাউমের গদিকে করে তুলেছে নড়বড়ে। অবশ্য এটা নিছক বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং এটি একটি পদ্ধতিগত ভাঙনের প্রেক্ষাপট।
সপ্তাহ দুয়েকেরও কম সময়ের ব্যবধানে দুই-দুইটি হত্যার ঘটনায় মেক্সিকো উত্তাল হয়ে ওঠে। লেবুচাষি সমিতির এক তরুণ, ক্যারিশম্যাটিক নেতাকে গুলি করে হত্যার কয়েক দিন পর উরুয়াপান শহরের জনপ্রিয় মেয়র নিহত হন। ২ নভেম্বর ‘ডে অব দ্য ডেড’ উত্সব চলাকালীন দিনের আলোতে তাকে গুলি করা হয়। এ ঘটনার পর চলমান বিক্ষোভ আরো ঘনীভূত হয় এবং তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
এ দুই ব্যক্তি অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর অপকর্মের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছিলেন। কৃষি সরবরাহ শৃঙ্খলে দুর্নীতিবাজদের গভীরভাবে জাঁকিয়ে বসা এবং লেবু ও অ্যাভোকাডো চাষিদের কাছ থেকে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। তারা অভিযোগ তুলে বলেছিলেন, রাজ্য ও ফেডারেল কর্তৃপক্ষ তাদের কথা কানে তুলছে না। এর পরিণাম সম্পর্কেও তারা সতর্কতা জানিয়েছিলেন।
পর পর দুই জন হত্যার শিকার হলে উরুয়াপান ও মোরেলিয়ায় ব্যাপক পদযাত্রা ও বিক্ষোভ শুরু হয়। এরপর মিচোয়াকানে আন্দোলন যেভাবে দানা বাঁধতে থাকে, একটু একটু করে তা হয়ে ওঠে ‘একটি টাইম বোমা’। বিক্ষোভটি ক্রমশ মেক্সিকোর চলমান নিরাপত্তাসংকটকে প্রকটতর করে তোলে এবং তা শিনবাউমের কৌশলের সীমাবদ্ধতা, দুর্বলতার প্রতি ছুড়ে দেয় কঠিন চ্যালেঞ্জ।
মেক্সিকোর বর্তমান সংকট বুঝতে একটু পেছনে ফিরে তাকাতে হবে। ২০০৭ সালে মিচোয়াকানের তত্কালীন বামপন্থি গভর্নর লাজারো কার্ডেনাস বাতেল—যিনি বর্তমানে শিনবাউমের প্রেসিডেন্সি অফিসের প্রধান, তিনি তত্কালীন প্রেসিডেন্ট ফেলিপ ক্যালডেরনের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি ফেডারেল সহায়তা চেয়েছিলেন। তার দাবি ছিল, রাজ্যটিতে মাদক কার্টেল ও অপরাধমূলক কার্যকলাপের অনুপ্রবেশ ক্রমশ বাড়ছিল। সেই অনুরোধের প্রেক্ষাপটে শেষ পর্যন্ত শুরু হয় সামরিক অভিযান। এমনকি এটিকে ‘মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। সেই থেকে শুরু! যেসব অঞ্চলে মাদকের অনুপ্রবেশ ঘটার দাবি উঠেছিল, সেগুলো হয়ে উঠতে থাকে ‘অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার অজুহাতে’ সামরিক বাহিনীর অভিযানের পরীক্ষাগার। বলা বাহুল্য, এতে করে সহিংসতা কমার পরিবর্তে বরং আছড়ে পড়তে শুরু করে উত্তেজনার এক নতুন ঢেউ।
বিভিন্ন হিসাব এবং সরকারি তথ্যউপাত্ত থেকে যে চিত্র পাওয়া যায়, তা রীতিমতো ভয়াবহ! ক্যালডেরনের প্রশাসনের অধীনে (২০০৬-২০১২) হত্যা এবং কার্টেল-সম্পর্কিত হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা হয়ে পড়ে আকাশচুম্বী। উদাহরণস্বরূপ, কেবল ২০১০ সালেই ১৫ হাজার ২৭৩টি অপরাধ-সম্পর্কিত হত্যার ঘটনা ঘটে, যা ২০০৯ সালের ৯ হাজার ৬১৬ থেকে অনেক বেশি। এরপর এনরিকে পেনা নিয়েতোর অধীনে (২০১২-২০১৮) হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা আরো বেড়ে যায়। এই ‘ইচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা’ ক্যালডেরনের অধীনে যেখানে ছিল প্রায় ১ লাখ ২ হাজার ৮৫৯টি, তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৪ হাজারে। এখানেই থেমে থাকেনি ঘটনা। আন্দ্রেস ম্যানুয়েল লোপেজ ওব্রাডরের অধীনে সংখ্যাগুলো হয়ে ওঠে বিস্ময়কর—২০১৯ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে মেক্সিকোয় প্রায় ১ লাখ ৯ হাজার ৫৯টি খুন রেকর্ড করা হয়েছে।
এই সংখ্যাগুলো গুরুত্বপূর্ণ; কারণ, এতে করে একটি সহজ সত্য সামনে আসে আর সেটি হলো, সেনা মোতায়েন এবং মাদক কার্টেল নির্মূলে যে মিশন হাতে নেওয়া হয়েছিল, তা তো শান্তি আনেইনি, বরং পরিস্থিতিকে আরো ঘোলাটে করে তুলেছে। অপরাধী সংগঠনগুলো আরো সুসংগঠিত হয়েছে, সময় ও পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে এবং অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, তথা চাঁদাবাজি বাডিয়ে তুলেছে। অপরাধীরা এখন আর কেবল প্রত্যন্ত অঞ্চলেই নয়, মূল উত্পাদনশীল খাতগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। শিনবাউমের বিপদ ঘনিয়ে আসতে শুরু করে এভাবেই।
মিচোয়াকানে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এখন আর ভূগর্ভস্থ পাচারকারী চক্রের মতো আচরণ করে না, উপরন্তু তারা আধা-রাষ্ট্রীয় বাহিনীর মতো আচরণ করছে। লেবুচাষি এবং অ্যাভোকাডো উত্পাদনকারীদের ভাষ্য, তাদের কাছ থেকে তারা এখন ‘ট্যাক্স’ নেয়, মূল্য সমন্বয়ের জন্য চাপ প্রয়োগ করে এবং এমনকি কখন ফসল কাটতে হবে, কীভাবে বিক্রি করতে হবে—সেসবও বাতলে দেয়। এর বাইরে গেলে তাদের সহিংসতার মুখোমুখি হতে হবে বলে শাসানো হয়। সব মিলিয়ে তারা হয়ে উঠেছে অলিখিত রাষ্ট্রীয় অভিনেতা।
এই সংকটের একটি বাজে ও বিরক্তিকর প্রবণতা হলো, এই প্রবণতার মুখে পড়ে বহু মেয়র, সাবেক মেয়র এবং স্থানীয় কর্মকর্তারা ক্রমবর্ধমানভাবে হত্যার শিকারে পরিণত হন। এক গবেষণা অনুসারে, ২০১৭ সালের মধ্যে মেক্সিকোতে অন্তত ১৫০ জন এমন ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়েছিল, যার মধ্যে এক বছরে ২০ জন মেয়র হত্যার (২০১০) মতো চরম ঘটনাও ছিল। আগের বছরগুলোতে বছরপ্রতি এই হার ছিল গড়ে প্রায় ১০ জন। প্রশ্ন উঠতে পারে, মেয়রদের কেন এভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়? এর উত্তর হলো, তাদের পদটিই যেন অপরাধীদের লাভ-লোকসান, আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদাবাজির নেটওয়ার্কের জন্য হুমকিস্বরূপ।
মিচোয়াকানের পরিস্থিতি এভাবে অত্যন্ত ভয়াবহ হয়ে ওঠে। এই অঞ্চলটি স্থানীয় রাজনৈতিক সহিংসতার জন্য সবচেয়ে বেশি উন্মুক্ত রাজ্যগুলির মধ্যে একটি। এর কারণ—এটি কৃষি সম্পদ, কার্টেলের উপস্থিতি এবং দুর্বল স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে ঠাসা। এ অবস্থায় শিনবাউমের প্রেসিডেন্সির জন্য স্পষ্ট বার্তা হলো, যদি স্থানীয় কর্মকর্তাদের সুরক্ষা দেওয়া না যায়, তাহলে রাষ্ট্রটির পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে ফাঁপা হয়ে যাবে।
যাহোক, সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডগুলোর পর প্রেসিডেন্ট শিনবাউম নড়েচড়ে বসেন। প্রকাশ্যে মেয়র মানজোর হত্যাকাণ্ডকে ‘জঘন্য’ বলে নিন্দা জানান, নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা আহ্বান করেন এবং ‘শূন্য দায়মুক্তি’ ও ‘পূর্ণ বিচার’ নিশ্চিতের অঙ্গীকার করেন। তিনি মিচোয়াকানের জন্য একটি নতুন নিরাপত্তা অভিযানও ঘোষণা করেন। তার এই পরিকল্পনার নাম ‘প্ল্যান মিচোয়াকান’, যার মধ্যে ফেডারেল বাহিনী মোতায়েন, রাজ্য প্রসিকিউটরদের সঙ্গে সমন্বয়, গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং কিছু প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় অন্তর্ভুক্ত হয়। পাশাপাশি গ্রহণ করা হয় বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচি।
তবে মুশকিল হলো, এখন পর্যন্ত এই পরিকল্পনার মূল বিষয়বস্তু স্পষ্ট বোঝা যায়নি! বাজেট-স্বল্পতার পাশাপাশি এতে রয়েছে অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব। শিনবাউমের নিজের দল ‘মোরে না’ গত চার বছর ধরে মিচোয়াকান শাসন করে আসছে। এই সময়েই সমস্যাটি প্রকটতর হয়েছে। অথচ হত্যাকাণ্ডগুলোর প্রতি তার প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া ছিল এমন যে, তিনি কেবল অতীতকে দোষারোপ করে গেছেন! শিনবাউম যুক্তি দেখান যে, তার নেতৃত্বে দেশব্যাপী হত্যাকাণ্ড হ্রাস পেয়েছে। তবে বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। কারণ, তার দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বিভাজন ও সংকট এতটাই আড়ালে পড়ে যায় যে, বিশেষ করে খোদ মেক্সিকো সিটি প্রায় অশাসনযোগ্য ‘নো-ম্যান’স ল্যান্ডে’ পরিণত হয়ে পড়ে! অন্যান্য অঞ্চল; যেমন—মিচোয়াকান, গেরেরো, চিয়াপাস, সিনালোয়ার মতো রাজ্যগুলোতে রাজ্য বা ফেডারেল কর্তৃপক্ষ—কেউই কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারে না।
এই যখন অবস্থা, তখন শিনবাউম যে কঠিন পরীক্ষার মধ্যে পড়ে গেছেন, সেটি আর দ্বিতীয় বার বলার প্রয়োজন নেই। অবশ্য তার সামনে সুযোগের জানালাটিও এখানো খোলা আছে। তিনি আবারও নতুন আঙ্গিকে ‘প্ল্যান মিচোয়াকান’ ঘোষণা করতে পারেন। তবে তার সেই প্ল্যানের মধ্যে অবশ্যই বিশ্বাসযোগ্যতা থাকতে হবে। বাস্তব প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, স্বচ্ছ ও পর্যাপ্ত বাজেট, ক্ষমতাপ্রাপ্ত স্থানীয় বেসামরিক পুলিশ, স্থানীয় নেতাদের জন্য সুরক্ষা, কৃষিতে চাঁদাবাজি নেটওয়ার্ক দমন এবং যোগসাজশের অভিযোগের জন্য জবাবদিহির সংস্কৃতি গড়ে তোলার বাস্তবসম্মত প্রতিশ্রুতি দিতে হবে তাকে। সুশীল সমাজকে, তথা চাষি, উত্পাদক, ইউনিয়ন, নাগরিক আন্দোলনকে কেবল দর্শকসারিতে বসিয়ে না রেখে অংশীদার হতে দিতে হবে। অপরাধমূলক নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের বীজ মূলত সেখানেই।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, মিচোয়াকান হলো এমন একটি স্থান, যেখানে ব্যর্থতার মানচিত্র সম্ভাব্য সংস্কারের মানচিত্রকে ছাড়িয়ে যায়। সুতরাং, প্রশ্ন হলো— শিনবাউম কি বর্তমান পরিস্থিতিকে কেবল আরেক নতুন সংকট হিসেবে দেখবেন, নাকি মেক্সিকোর নিরাপত্তা ও শাসনতান্ত্রিক দৃষ্টান্তকে পুনরায় সংজ্ঞায়িত করার ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে গ্রহণ করবেন। অবশ্য সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে!













