বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল যেন এক প্রাত্যহিক রণাঙ্গন! বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াল রূপ, তথা সমুদ্রের ক্রমবর্ধমান উচ্চতা, মাটির লবণাক্ততা, প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় আর তীব্র নদীভাঙন—এসবের অভিঘাত এই জনপদের লাখ লাখ মানুষকে করে চলেছে নিঃস্ব, রিক্ত। তারা কোনো অপরাধ না করেও জলবায়ু পরিবর্তনের নির্মম শিকার। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এ নিয়ে বড় বড় সেমিনার হয়, ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যাডাপটেশন নিয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা হয়, কিন্তু বছরের পর বছরের কেটে গেলেও অবস্থার কোনো উন্নতি হয় না। বরং কার্যত খালি হাতে তারা এই অসম লড়াইয়ে টিকে থাকে।
প্রশ্ন করা যায়, এভাবে নিজস্ব অর্থায়নে তারা কতকাল টিকে থাকতে পারবে? পর্যাপ্ত পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া কীভাবে এই জলবায়ু অভিঘাত কাটিয়ে উঠতে পারবে? বরং এই অসম লড়াইয়ে তাদের ব্যক্তিগত সামর্থ্য যে ফুরিয়ে আসছে, তা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই।
একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সম্পদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তা অনস্বীকার্য। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের মতো একটি অস্তিত্বের সংকট মোকাবিলায় আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকার কী, তা প্রতিফলিত হয় আমাদের জাতীয় বাজেটে। তবে উপকূলীয় সুরক্ষা এবং অভিযোজনের জন্য প্রতি বছর যে বরাদ্দ রাখা হয়, তা কি প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট?
বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড গঠিত হয়েছে, যা নিজস্ব অর্থায়নে জলবায়ু মোকাবিলার একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। কিন্তু, এই তহবিলের আকার এবং উপকূলীয় অঞ্চলের বিশাল চাহিদা বিবেচনা করলে এই বরাদ্দকে অপ্রতুলই বলতে হয়। তদুপরি, যেটুকু বরাদ্দ আসে, তা প্রায়শই ব্যয় হয় তাত্ক্ষণিক বা জরুরি মেরামতের কাজে। টেকসই, দীর্ঘমেয়াদি এবং জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণে যে ধরনের বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন, তার অভাব সবসময়ই সুস্পষ্ট। এ অবস্থায় উপকূলীয় সুরক্ষার জন্য একটি সমন্বিত, দীর্ঘমেয়াদি ও বৃহত্ বিনিয়োগ পরিকল্পনার কোনো বিকল্প নেই।
প্যারিস চুক্তি থেকে শুরু করে প্রতি বছরের জলবায়ু সম্মেলনে এই নিয়ে অনেক কথা হয়। লস অ্যান্ড ড্যামেজ বা ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় একটি বিশেষ তহবিল গঠনের ঘোষণাও আসে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সেই প্রতিশ্রুত অর্থায়ন থেকে যায় মরীচিকা হয়েই। যে সামান্য অর্থায়ন পাওয়া যায়, তা আসে ঋণ হিসেবে, অনুদান হিসেবে নয়। অথবা তা এমন সব জটিল শর্তের জালে আটকা পড়ে থাকে যে, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে তা পৌঁছানোই কঠিন হয়ে পড়ে। এই অর্থায়ন প্রাপ্তিতে আমাদের কূটনৈতিক ব্যর্থতা যেমন রয়েছে, তার চেয়েও বেশি রয়েছে উন্নত বিশ্বের রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব। এটিই জলবায়ু অবিচারের সবচেয়ে নগ্ন এবং নিষ্ঠুরতম রূপ। অর্থায়ন ছাড়া উপকূলের এই একতরফা লড়াইয়ের ভবিষ্যত্ কী?













