মানুষ সত্য ও সুন্দরের পূজারি। সত্যকে জানার আকাঙ্ক্ষা মানুষের চিরায়ত সহজাত প্রবৃত্তি। সত্যান্বেষণ, আত্মজ্ঞান, আত্মোনুশীলন ও আত্মোপলব্ধির বোধ জাগ্রত করতে প্রয়োজন অবিরাম অধ্যবসায় ও গবেষণাকর্মে একনিষ্ঠতা।
বিষাদগ্রস্ত জীবনের যবনিকাপাত ঘটাতে নিরবচ্ছিন্ন জ্ঞানসাধনাই হতে পারে সুখময় জীবনের একমাত্র টনিক। মানব অন্তরে প্রোথিত অমিত সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচনে নিরন্তর জ্ঞান সাধনার বিকল্প আজও অনাবিষ্কৃত। কূপমণ্ডূকতা, কুসংস্কার ও গোঁড়ামির মূলোত্পাটনে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের অপরিহার্যতায় দ্য থিওসোফিক্যাল সোসাইটির আদর্শ ও দর্শন সব সময়ই প্রাসঙ্গিক।
নিখিল বিশ্বের মানব সম্প্র্রদায়কে সব ধর্ম-মত-লিঙ্গ-বর্ণনির্বিশেষে বিশ্বভ্রাতৃত্বের মেলবন্ধনে আবদ্ধ করার মহান উদ্দেশ্যে আধ্যাত্মিক জগতের এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক মহাযোগী ম্যাডাম হেলেনা পেট্রোভনা ব্লাভাটস্কি আরেক মহাজ্ঞানী স্যার কর্নেল হেনরি অলকটের সহায়তায় ১৮৭৫ সনের ১৭ নভেম্বর আমেরিকার নিউ ইয়র্কে প্রতিষ্ঠা করেন ‘দ্য থিওসোফিক্যাল সোসাইটি’ (যার মূলমন্ত্র ‘সত্যের চেয়ে উচ্চতর ধর্ম নেই।’ বর্তমান যুগের বস্তুতন্ত্রবাদের নিরসন ও তত্ত্ববিদ্যার পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য এ সমিতি গঠিত হয় তিনটি উদ্দেশ্য নিয়ে—
এক. জাতি-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ ও সম্প্র্রদায়নির্বিশেষে মানবজাতির মধ্যে বিশ্বভ্রাতৃত্বের কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা।
দুই. দর্শন ও বিজ্ঞানের তুলনামূলক পাঠ ও আলোচনায় উত্সাহ দান।
তিন. প্রকৃতির অনুদ্ঘাটিত রহস্যের অনুসন্ধান ও মানব অন্তরে সুপ্ত প্রতিভার উন্মেষ ঘটানো।
থিওসোফি বা প্রাচীন তত্ত্ববিদ্যা সর্বধর্মের মূল উত্স। এই বিদ্যা প্রত্যক্ষ জ্ঞানের ওপর প্রতিষ্ঠিত। উপনিষদের ‘সত্যান্নাস্তি পরোধর্ম্ম’ এই সমিতির নীতিবাচক মন্ত্র। থিওসোফিস্ট নামে পরিচিত তত্ত্ববিদ্যা সমিতির সদস্যগণ সত্যের পূজারি কিন্তু তারাই সনাতন ভগবদ্জ্ঞানের একমাত্র অধিকারী বলে কখনো দাবি করেন না। তারা সত্যানুরাগী, তাই প্রত্যেক ব্যক্তির সত্যানুসন্ধান ও বিশ্বাসের পূর্ণ স্বাধীনতা স্বীকার করেন।
বিশ্বমানবের কল্যাণার্থে যে যুগসন্ধিক্ষণে থিওসোফিক্যাল সোসাইটির মূল ভাবধারা ফল্গুধারার ন্যায় তত্ত্বজ্ঞানীদের পিপাসু হূদয়ে প্রভাব বিস্তার করেছিল, সে সময়টি ছিল ফলিতবিজ্ঞানের যুগ। জড়বাদী সভ্যতা মানুষকে ভোগবাদী করে তুলেছিল। ‘ভোগেই শান্তি’—মানুষ এ ভ্রান্ত ধারণার বশীভূত হয়ে মায়া-মরীচিকার পেছনে ধাবিত হচ্ছিল। পথভ্রান্ত মানুষ সে ভোগের মধ্যে প্রকৃত সুখের সন্ধান পায়নি। প্রকৃত সুখশান্তি ও আত্মতৃপ্তির অপেক্ষায় মানুষ যেন অন্ধগলির পথ অতিক্রম করছিল। সে অন্ধগলির পথরেখায় থিওসোফিক্যাল সোসাইটি আলোকবর্তিকা হয়ে দেখা দিল পথভ্রষ্ট মানুষের জন্য।
এ সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা ম্যাডাম হেলেনা পেট্রোভনা ব্ল্যাভাটস্কি সভ্যদের জীবনযাপনের যে নীতিগুলো ইঙ্গিত করেছেন সেগুলি হলো :‘বিশুদ্ধ জীবন, উন্মুক্ত মন, পবিত্র হূদয়, ধীশক্তি, অনাবৃত অধ্যাত্ম অনুভূতি, সর্বজনে ভ্রাতৃভাব, উপদেশ গ্রহণে ও দানে আগ্রহ, নিজের প্রতি অবিচার বীরের ন্যায় সহ্য করা, সাহসের সঙ্গে তত্ত্ব প্রচার করা, অন্যায়ভাবে অত্যাচারিতের পক্ষ সমর্থন করা, জীবের অভ্যুদয় ও পূর্ণতা লাভের জন্য তত্ত্ববিদ্যা প্রদর্শিত আদর্শের অনুসরণ।
এগুলো প্রজ্ঞামন্দিরে উপনীত হওয়ার জন্য সাধকের স্বর্ণ সোপান বিশেষ।’ থিওসোফিক্যাল সোসাইটির সাধারণ সভার সভ্যগণ প্রত্যেক সদস্যকে একান্তভাবে অনুরোধ করেন, তারা যেন অন্যের প্রতি সৌজন্য ও সহানুভূতির সীমা লঙ্ঘন না করেন। সোসাইটির মৌলিক নীতিগুলোর পালন, রক্ষণ ও রূপায়ণের দ্বারা নির্ভয়ে তাদের নিজস্ব চিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে চলতে পারেন। থিওসোফি একটি দর্শন, যা জীবনকে সহজবোধ্য করে ন্যায় ও প্রেমের পথপ্রদর্শনপূর্বক জীবনকে ক্রমবিকাশের পথে এগিয়ে নিয়ে চলে।
থিওসোফি মৃত্যু সম্বন্ধে ধারণা সৃষ্টি করে এবং বুঝিয়ে দেয় মৃত্যু পূর্ণতর ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যত্ জীবনের দ্বার উন্মুক্ত করে। আত্মার বিজ্ঞানভিত্তিক ধারণা সৃষ্টি করে এবং মানুষকে বুঝিয়ে দেয় যে আত্মাই তার প্রকৃত স্বরূপ এবং দেহ-মন তার আজ্ঞাবহ মাত্র। ধর্মমত ও শাস্ত্রগ্রন্থের প্রচ্ছন্ন অর্থগুলো সম্বন্ধে সঠিক আলোকপাত করে এবং বুদ্ধির নিরিখে তাকে এমনভাবে প্রমাণিত করে যে স্বাভাবিক চিন্তায় সেগুলো যেন স্বতঃপ্রমাণিত মনে হয়।
‘থিওসোফিক্যাল সোসাইটি’ বা তত্ত্ববিদ্যা সমিতি একটি আধুনিক প্রতিষ্ঠান যদিও ভারতবর্ষের, গ্রিকদেশের ও খ্রিষ্টধর্মের বিভিন্ন পুস্তক থেকে এই সমিতির অস্তিত্বের উল্লেখ বহু পুরাকাল হতেই পাওয়া যায়। পৃথিবীর যে কোনো ধর্মমতে বিশ্বাসী অথবা কোনো ধর্মমতে বিশ্বাসী নয়, কিন্তু অনুশীলনে যত্নবান—এমন সদস্য দ্বারাই থিওসোফিক্যাল সোসাইটি গঠিত। সোসাইটির উদ্দেশ্যগুলোর দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে তারা এই সংস্থাতে একত্রিত হয়েছেন নানা ধর্মমতের বিরোধ অপসারিত করতে, বিভিন্ন ধর্মমতের শুভ ইচ্ছাসম্পন্ন মানুষের মধ্যে মিলনের সেতু তৈরি করতে এবং ধর্মের অন্তর্নিহিত সত্যগুলোকে উপলব্ধি করে সমভাবে অন্যের সঙ্গে তার ফললাভে অংশগ্রহণ করতে। কোনো বিশেষ মতের প্রতি শ্রদ্ধা বা বিশ্বাস এই মিলন-বন্ধনের হেতু নয়।
সত্যকে জানবার অনুসন্ধিত্সা বা আকাঙ্ক্ষাই রচনা করেছে এই মিলনসেতু। তাদের ধারণা সত্যকে জানবার জন্য চাই গভীর অনুশীলন, মননশীলতা, চিত্তশুদ্ধি ও উচ্চআদর্শের প্রতি অনুরক্তি। সবার প্রতি তারা সহনশীল, এমনকি অসহিষ্ণুর প্রতিও। বিশেষ সুযোগ হিসেবে সহনশীলতা ব্যবহার করেন না, সম্পাদন করেন কর্তব্যকর্ম হিসেবে। তারা আগ্রহী অজ্ঞানতা দূর করতে, শাস্তি দিতে নয়। প্রত্যেক ধর্মকে মনে করেন এক দিব্য প্রজ্ঞালোকের প্রকাশ। কোনো ধর্মের নিন্দা করা অপেক্ষা সেই মতবাদের অনুশীলনে যত্নবান। যেমন একমাত্র লক্ষ্য ‘সত্য’ তেমনি তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য ‘শান্তি’।
লেখক : সাংবাদিক
(এই লেখা লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত অভিমত; এ সংক্রান্ত কোনো দায় দৈনিক মূলধারা বহন করবে না)













