ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোর বাসভবনে গত শনিবারের মার্কিন সামরিক অভিযানের সময় ৫৭ জন নিহত হওয়ার খবর জানিয়েছে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো। ওই অভিযানে মার্কিন সামরিক বাহিনী মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তুলে নিয়ে যায়। তাঁদের কারাকাস থেকে ২ হাজার ১০০ মাইল পাড়ি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে নেওয়া হয়।
‘মাদুরো অপহরণ’ নিয়ে চারটি বিশেষ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্রিটিশ সাংবাদিক জোনাথন কুক। ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাত বিষয়ে মূল্যবান গ্রন্থ প্রণেতা কুকের চারটি বিশেষ পর্যবেক্ষণ হলো—
প্রথম পর্যবেক্ষণ
যুক্তরাষ্ট্র এক ‘রোওগ স্টেট’ (rogue state) অর্থাত্ ‘আন্তর্জাতিক নীতি-বহির্ভূত রাষ্ট্র’-এর পর্যায়ে পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক আচরণ এমনভাবে বিকশিত হয়েছে যে দেশটি এখন আর নিজের কর্মকাণ্ড বৈধ দেখানোর পরোক্ষ চেষ্টাও করে না। এর আগে আফগানিস্তান, ইরাক ও লিবিয়া আক্রমণের সময় ওয়াশিংটন নানা যুক্তি তুলে ধরেছিল। ২০০১ সালে বলা হয়েছিল, আলকায়েদার নেতা বিন লাদেনকে ‘স্মোক আউট’ করে বের করতে হবে; ২০০৩ সালে দাবি করা হয়েছিল, ইরাকে রয়েছে ‘মারাত্মক ধ্বংসাত্মক অস্ত্র’; পরে লিবিয়ার ক্ষেত্রে বলা হয়, মুয়াম্মার গাদ্দাফি তার বাহিনীকে ‘ভায়াগ্রা সেবন করিয়ে’ ধর্ষণযজ্ঞে নামাবে। পরবর্তীকালে এসব যুক্তি ভিত্তিহীন প্রতীয়মান হয়—বিন লাদেন আদালতে হাজির হওয়ার জন্য তালেবান প্রস্তুত ছিল; ইরাকে কোনো গণবিধ্বংসী অস্ত্র মেলেনি; আর গাদ্দাফির ‘ভায়াগ্রা’ অভিযোগ ছিল সম্পূর্ণ কাল্পনিক।
তবুও তখনকার সরকারি প্রচারণায় মানবিকতা, গণতন্ত্র ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা—এই শব্দগুলো ব্যবহূত হয়েছিল। কিন্তু মাদুরোর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র এমন কাহিনিও দাঁড় করায়নি। ‘অভিযোগ’গুলো এতটাই অতিরঞ্জিত যে বিশ্বাস করতে হলে হয় অন্ধ আনুগত্য, নয়তো গভীর ভুল তথ্যের প্রভাব থাকতে হবে। আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থা ভেনিজুয়েলাকে যুক্তরাষ্ট্রের মাদকবাণিজ্যের প্রধান উত্স মনে করে না এবং মাদুরোকে এ ক্ষেত্রের প্রধান পৃষ্ঠপোষক বলার দাবি আরো দুর্বল। অস্ত্রসংক্রান্ত অভিযোগ তো এমনই খাপছাড়া যে, তা আসলে কী বোঝাতে চায়—তা স্পষ্টই নয়।
এখানে বেশি তাত্পর্যপূর্ণ হলো—যুক্তরাষ্ট্র আর নিজের কর্মকাণ্ডে আইন বা আন্তর্জাতিক বিধিবিধান মানার ভানও করছে না।
দ্বিতীয় পর্যবেক্ষণ
ট্রাম্প প্রশাসন আগের মতো ‘মানবিকতার’ আড়ালে নয়, সরাসরি বলেছে—যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলার তেলের ভান্ডার নিয়ন্ত্রণে চায়। বিশ্বের অন্যতম বৃহত্ তেলভান্ডার ভেনিজুয়েলার—এ তথ্য বহুদিনের। ট্রাম্প নিজেই বলেছিলেন—‘আমরা তেল চাই’—এটি কোনো কূটনৈতিক ভাষা নয়; ঔপনিবেশিক যুগের পুরোনো উচ্চারণেরই নব সংস্করণ।
অথচ পশ্চিমা গণমাধ্যমে এই বিষয়টির বদলে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে—‘মাদুরো খারাপ শাসক কি না’, ‘তিনি অর্থনীতি নষ্ট করেছেন কি না’। এভাবে আলোচনার কেন্দ্র সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে আইনের বৃহত্তর প্রশ্ন থেকে—একটি রাষ্ট্র কি অন্য রাষ্ট্রের সরকারকে অপহরণ করতে পারে? আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে এটি ‘আগ্রাসন’—যে অপরাধকে ন্যুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনাল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল।
গণমাধ্যমের এ ধরনের ‘নৈতিক বিতর্ক’ মূল ঘটনাকে ধুলোর নিচে রাখতে সাহায্য করে। যদি সত্যিই পশ্চিমা গণমাধ্যম ‘খারাপ নেতাদের’ বিরুদ্ধে উদ্বিগ্ন হতো, তবে একই মানদণ্ড ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতো—যার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু সে প্রশ্ন ওঠে না। কারণ ভেনিজুয়েলা শক্তির শৃঙ্খলে দুর্বল স্থানে, আর ইসরাইল পশ্চিমা শক্তির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ইউক্রেন যুদ্ধের তুলনাতেও একই বৈপরীত্য দেখা যায়। সেখানে গণমাধ্যম ক্ষুব্ধ, উদ্বিগ্ন, ক্রুদ্ধ ভাষায় আক্রমণ প্রতিহত করে। কিন্তু ভেনিজুয়েলার ক্ষেত্রে ভাষা শান্ত, বিশ্লেষণধর্মী, প্রেক্ষাপটভিত্তিক। এই দ্বৈত মানদণ্ডই পশ্চিমা কূটনীতি ও গণমাধ্যমের গঠনমূলক সংকটকে উন্মোচিত করে।
তৃতীয় পর্যবেক্ষণ
বাম ধারার বিরুদ্ধে প্রায়ই অভিযোগ ওঠে যে, তারা রাশিয়া বা চীনের সমালোচনায় ‘নরম’ বা ‘সচেতনভাবে সতর্ক’। বামপন্থি রাজনীতি মূলত একক-শক্তিনির্ভর বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে। কারণ এমন ব্যবস্থায় শক্তিধর রাষ্ট্রের একচ্ছত্র ক্ষমতা আন্তর্জাতিক আইনের ওপর দাঁড়ায় না—দাঁড়ায় কেবল ক্ষমতার ওপর।
এই পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক অবস্থান—কিউবা, মেক্সিকো, গ্রিনল্যান্ড, কলম্বিয়া—ইত্যাদি দেশের নাম উচ্চারণ করে পরবর্তী ‘শাস্তি’ কার ওপর পড়বে—এমন ইঙ্গিত দেয়। আর ইউরোপীয় নেতৃত্ব ক্রমশ এমন নীতির সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছে। পশ্চিমকে এখন ‘শক্তিশালী’ হওয়া নয়—বরং ‘বহু-মেরু’ বা ‘মালটিপোলার’ বিশ্বে ফিরে যাওয়া দরকার—যেখানে জোটবদ্ধতা, সমঝোতা ও তুলনামূলক স্বচ্ছতা প্রয়োজন হয়।
মালটিপোলারিটি মানে এই নয় যে, রাশিয়া বা চীন ন্যায়পরায়ণ শক্তি—বরং এমন বিশ্বব্যবস্থায় কোনো একক সাম্রাজ্য সবকিছুর মালিক হয়ে উঠতে পারে না। জলবায়ু-সংকট, পরমাণু উপাদান ও সম্পদ সংকটের যুগে এই ভারসাম্য মানবতার বেঁচে থাকার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।
চতুর্থ পর্যবেক্ষণ
ভেনিজুয়েলার প্রকৃত ‘অপরাধ’ কোথায়? ভেনিজুয়েলার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় অভিযোগ আসলে কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নয়, বরং ভেনিজুয়েলা এমন একটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক পথে হাঁটার চেষ্টা করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের করপোরেট-নির্ভর পুঁজিবাদী মডেলের বিরোধিতা করে। বিশেষত ১৯৯৯ সালের পর হুগো শ্যাভেজের নেতৃত্বে চালু হওয়া ‘বলিভারীয় বিপ্লব’—একটি বিকল্প রাষ্ট্রনৈতিক নকশা উপস্থাপন করেছিল, যা সম্পদের বণ্টন, সামাজিক সেবা, রাষ্ট্রীয় মালিকানা এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল।
শ্যাভেজ রাষ্ট্রীয়ভাবে তেল, খনিজ এবং গুরুত্বপূর্ণ শিল্প খাতগুলোকে জাতীয়করণের আওতায় নিয়ে আসেন—যে খাতগুলো আগে দেশীয় ধনী পরিবার, বহুজাতিক কোম্পানি ও আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং নেটওয়ার্কের হাতে ছিল। এসব এলিট তাদের সম্পদ বিদেশে সরিয়ে রাখত, যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ করত এবং দেশের অধিকাংশ জনগণ দারিদ্র্য ও বেকারত্বে জীবন কাটাত।
এই কাঠামোর অবসান এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে সম্পদ বণ্টনের ফলে নিম্নবর্গ ও শ্রমজীবী মানুষ দ্রুত সুফল পেতে শুরু করে। আন্তর্জাতিক গবেষণা ও পরিসংখ্যান বলছে—চরম দারিদ্র্য ৭০ শতাংশেরও বেশি কমে যায়, বেকারত্ব অর্ধেকে নামে, রাষ্ট্রীয় পেনশনভোগীর সংখ্যা প্রায় চারগুণ বৃদ্ধি পায় এবং সাক্ষরতা ১০০ শতাংশে উন্নীত হয়। স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা খাতে রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম মানুষের জীবনের মানে সরাসরি প্রভাব ফেলে। লাতিন আমেরিকার জন্য এ অভিজ্ঞতা ছিল নজিরবিহীন—কারণ ঐ অঞ্চল দীর্ঘদিন ‘ব্যবসাবান্ধব’ নীতির নামে বহুজাতিক করপোরেট ও সামরিক স্বার্থের খেলার মাঠ হিসেবে ব্যবহূত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে সমস্যা এখানেই। কারণ ভেনিজুয়েলার উদাহরণ দেখায় যে—রাষ্ট্র যদি সম্পদ পুনর্বণ্টন করে, যদি নাগরিকদের সামাজিক অধিকারকে অগ্রাধিকার দেয় এবং যদি করপোরেট পুঁজির সামনে মাথা না নোয়ায়—তবে একটি জনগোষ্ঠীর জীবনমান তুলনামূলকভাবে দ্রুত উন্নত হতে পারে। এই মডেল বিশ্বব্যাপী বিশেষ করে পশ্চিমা গণতন্ত্রের নাগরিকদের মধ্যেও প্রশ্ন জাগাতে পারে—আমাদের জীবন কি করপোরেট স্বার্থরক্ষার জন্য পরিচালিত হচ্ছে, নাকি জনকল্যাণকে কেন্দ্র করে?
এভাবেই ভেনিজুয়েলা একটি ‘প্রতীকী বিপদ’ হয়ে ওঠে—বিশেষ করে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার জনগণের জন্য। কারণ সেখানে গত দুই দশকে দেখা গেছে—অর্থনীতি যতই বড় হয়, সম্পদের মালিকানা ততই সঙ্কুচিত হয়। আয়-অসমতা বাড়ে, বেসরকারীকরণ বৃদ্ধি পায়, আর কদিন পরপর মানুষের সামনে হাজির হয় ‘কৃচ্ছ্রসাধন’ বা ‘অস্টেরিটি’—যা সাধারণ মানুষকে দায়ী করে করপোরেট আর্থিক ব্যর্থতার বোঝা তাদের ওপর চাপিয়ে দেয়। এই অবস্থায় ভেনিজুয়েলার উদাহরণ প্রশ্ন উত্থাপন করে—একটি রাষ্ট্র কি আসলে ভিন্নভাবে চলতে পারে?
এমন প্রশ্ন উঠুক—এটাই পশ্চিমা করপোরেট মিডিয়া ও রাজনৈতিক অভিজাতগোষ্ঠীর সবচেয়ে বড় ভয়।
তাই যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য দ্বিমুখী :১. ভেনিজুয়েলাকে আন্তর্জাতিকভাবে নিঃসঙ্গ করা; ২. অর্থনীতিকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যাতে জনগণ নিজেই রাষ্ট্রীয় মডেলকে ‘ব্যর্থ’ ঘোষণা করে।
এই কৌশলের জন্যই দীর্ঘস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক অবরোধ, তেল রপ্তানি সীমাবদ্ধকরণ ও মুদ্রা সংকট সৃষ্টি করা হয়। জনগণকে কষ্টে ফেলেই বলা হয়—‘দেখো, সমাজতন্ত্র ব্যর্থ’—যেন নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক যুদ্ধে রাষ্ট্রের হাত-পা বেঁধে রাখার কথা সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে যায়।
ট্রাম্প প্রশাসনের ঘোষণা আরো সরাসরি—যদি ভেনিজুয়েলার অন্তর্বর্তী সরকার (যেমন ডেলসি রদ্রিগেজ) মার্কিন পুঁজির জন্য দরজা না খোলে, তাহলে দেশটিকে ‘উন্মুক্ত’ করা হবে এমন নেতা বসিয়ে, যিনি বহুজাতিক স্বার্থে কাজ করবেন। এটিই লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে বহুবার দেখা ‘রেজিম চেঞ্জ’ নাটকের আধুনিক পর্ব।
ভেনিজুয়েলার ঘটনা বুঝলে বোঝা যায় কেন পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো নিজেদের শিল্প খাত জাতীয়করণের কথা তুলতেই ভয় পায়। জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও—ব্রিটেনে পানি, জ্বালানি, রেল ও ডাক সেবা জাতীয়করণের দাবি বাস্তবায়িত হয় না। লেবার পার্টির কেয়ার স্টারমার নেতৃত্ব পাওয়ার পরই নিজের জাতীয়করণ প্রতিশ্রুতি পরিত্যাগ করেন। কারণ জাতীয়করণ মানে করপোরেট ক্ষমতা হ্রাস, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি—আর সেটিই বর্তমান পশ্চিমা রাজনৈতিক কাঠামোর কাছে অগ্রহণযোগ্য।
পরিশেষে বলা যায়, ভেনিজুয়েলার প্রশ্ন কোনো ব্যক্তি (মাদুরো) বা দলের ভালো-মন্দ নয়। বরং প্রশ্ন এই যে, পৃথিবীতে কি ভিন্ন ধরনের রাষ্ট্রনীতি থাকার অধিকার আছে? নাকি বিশ্ব কেবল একটি মাত্র অর্থনৈতিক ধর্মেই বাধ্য হবে—যেখানে দেশগুলো পুঁজির বাজার, সম্পদের খনি, আর জনগণ কেবল ভোক্তা?
ভেনেজুয়েলার সমস্যা মূলত রাষ্ট্র বনাম রাষ্ট্র নয়, বরং মডেল বনাম মডেল, দৃষ্টিভঙ্গি বনাম দৃষ্টিভঙ্গি, এবং শেষ পর্যন্ত মানবকল্যাণ বনাম করপোরেট স্বার্থের সংঘর্ষ।













