দেশের ৩৫ জেলায় নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হইয়াছে। ইহার বিস্তার ও সংক্রমণের ধরন উদ্বেগজনক হারে পরিবর্তন হইতেছে বলিয়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করিয়াছে আইইডিসিআর তথা জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান। সংস্থাটি জানাইয়াছে, গত বৎসর (২০২৫) রেকর্ড করা চারটি কেসের সকলটিতেই ১০০ শতাংশ মৃত্যুর পাশাপাশি প্রথম বারের মতো একটি ‘অ-মৌসুমি কেস’ পাওয়া গিয়াছে। গত বুধবার আইইডিসিআরের মিলনায়তনে ‘নিপাহ ভাইরাসের বিস্তার ও ঝুঁকি বিষয়ে মতবিনিময়’ শীর্ষক সভায় উপস্থাপিত প্রবন্ধে সংস্থাটির বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শারমিন সুলতানা এই সকল তথ্য জানান।
উপস্থাপিত প্রবন্ধে দেখা যায়, ২০২৫ সালে নওগাঁ, ভোলা, রাজবাড়ী ও নীলফামারী—এই চার জেলায় চার জন নিপাহ রোগী শনাক্ত হন এবং প্রত্যেকেই মৃত্যুবরণ করেন। তাহাদের মধ্যে নওগাঁর আট বছরের এক শিশুর ঘটনাটি ছিল দেশে প্রথম ‘অ-মৌসুমি নিপাহ কেস’, যাহা শীতকাল ছাড়াই আগস্ট মাসে শনাক্ত হয়। ঐ শিশুর সংক্রমণের উত্স ছিল বাদুড়ের আধাখাওয়া ফল (কালোজাম, খেজুর, আম) খাওয়া, যাহা নিপাহ ছড়ানোর একটি নতুন ও এলার্মিং হিসাবে চিহ্নিত হইয়াছে। দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৩৫টিতেই নিপাহ ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ার বিষয়টি উদ্বেগজনক। তাহার মধ্যে ফরিদপুর, রাজবাড়ী, নওগাঁ ও লালমনিরহাটে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার তুলনামূলকভাবে অধিক। নিপাহ ভাইরাস লইয়া আতঙ্কের মূল কারণ হইল—এই ভাইরাসজনিত রোগের নির্দিষ্ট কোনো ঔষধ বা টিকা আজও আবিষ্কৃত হয় নাই। বিশ্বব্যাপী এই ভাইরাসে আক্রান্তদের গড় মৃত্যুহার প্রায় ৭২ শতাংশ। শুধু তাহাই নহে, ঐতিহাসিকভাবে খেজুরের কাঁচা রসকে প্রধান উত্স মনে করা হইলেও ২০২৫ সালে নওগাঁর কেস প্রমাণ করে, বাদুড়ের লালা বা মূত্রে দূষিত যে কোনো আধাখাওয়া ফল সরাসরি খাওয়ার মাধ্যমেও সংক্রমণ ঘটিতে পারে এবং সমগ্র বত্সরই তাহা সম্ভব। মানুষ হইতে মানুষে সংক্রমণ ঘটে, যাহা আরো আতঙ্কজনক। প্রায় ২৮ শতাংশ ক্ষেত্রে নিপাহ আক্রান্ত ব্যক্তি হইতে সরাসরি অন্য ব্যক্তিতে সংক্রমণ ছড়ায়, যাহা স্বাস্থ্যকর্মী ও পরিবারের সদস্যদের জন্য উচ্চ ঝুঁকি তৈরি করে। সুতরাং ইহা একটি বড় ওয়ার্নিং সিগন্যাল।
উল্লেখ্য, ১৯৯৮-৯৯ সালের দিকে মালয়েশিয়ায় প্রথম এই রোগ ছড়ায়। সেই সময় ২৭৬ জন আক্রান্ত হন। বাংলাদেশে ২০০১ হইতে ২০২৫ সাল পর্যন্ত নিপাহ ভাইরাসে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৩৪৭ জন। যেইহেতু এই ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তি খুব কমই বাঁচে, বাঁচিলেও নিউরোলজিক্যাল ও অবথামোলজিক্যাল সমস্যা দেখা দেয়, তাই এই ব্যাপারে সর্বসাধারণের সচেতনতার কোনো বিকল্প নাই। বিশেষ করিয়া এই শীতকালে কাঁচা খেজুরের রস পানের সময় সতর্কতা অবলম্বন করিতে হইবে। নিরাপদ পন্থায় সংরক্ষণ করা না হইলে তাহা খাওয়া যাইবে না। ইহাছাড়া পাখির খাওয়া আংশিক ফল কাটিয়া বা ধুইয়া খাওয়া যাইবে না। দৃশ্যত পাখির খাওয়া না হইলেও অধিক সতর্কতাস্বরূপ ফলমূল পরিষ্কার পানিতে ভালোভাবে ধুইয়া খাইতে হইবে। সাধারণত এই ভাইরাসের সংস্পর্শে আসিবার ৪ থেকে ১৪ দিন পর কাশি, গলাব্যথা, শ্বাসকষ্ট, স্বরভঙ্গ, জ্বর, মাথাব্যথা, বমি, চরম দুর্বলতা, পেশি ব্যথা ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিতে পারে। ইহার গুরুতর লক্ষণ হইল—বিভ্রান্তি বা আচরণগত অস্বাভাবিকতা, তন্দ্রা বা বিভ্রান্তি, হূদেরাগের আক্রমণ, স্ফীত মস্তিষ্ক বা এনসেফালাইটিস। একসময় রোগী কোমায় চলিয়া যায়। এমনকি প্রাথমিক লক্ষণগুলি এক্সপোজারের কয়েক মাস বা এমনকি কয়েক বত্সর পরও রোগীর মৃত্যুর কারণ হইতে পারে। ইহাকে তখন সুপ্ত সংক্রমণ হিসাবে বিবেচনা করা হয়।
মোটকথা, প্রাথমিক লক্ষণগুলি দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে যাইতে হইবে। তবে চূড়ান্ত পরীক্ষানিরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য রোগীকে ঢাকার মহাখালীস্থ আইইডিসিআরে আনয়ন করিতে হইবে। আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে আসিলে সাবান ও পানি দিয়া ভালোভাবে হাত পরিষ্কার করিতে হইবে। সর্বোপরি ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলিতে নজরদারি জোরদার করিতে হইবে এবং সংশ্লিষ্ট হাসপাতালগুলিকে প্রস্তুত থাকিতে ইতিমধ্যে যেই নির্দেশনা দেওয়া হইয়াছে, তাহার বাস্তবায়ন করিতে হইবে।













