প্রতি বছরের মতো এবারও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য শিক্ষকদের গবেষণা ফান্ড বরাদ্দের বিজ্ঞাপন দিয়েছে। তবে বিজ্ঞপ্তির ছোট্ট একটি শর্ত অনেক বড় প্রশ্ন জাগায় মনে—গবেষণা প্রস্তাবনা জমা দিতে পারবেন কেবল সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। তাহলে ইউজিসি কি আসলে শুধু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য, নাকি বাংলাদেশের সমগ্র উচ্চশিক্ষার জন্য কাজ করে?
ইউজিসির সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন বলছে, ২০২৩ অর্থবছরে গবেষণা খাতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল প্রায় ৬২ কোটি টাকা। একই সময়ে দেশের ১১৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বরাদ্দ ছিল শূন্য। অথচ সংখ্যার বিচারে আমাদের প্রায় ৭০ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয় বেসরকারি খাতের। তারা গবেষণা ফান্ড থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত। এটি নিছক পরিসংখ্যান নয়; বরং এটি এক ধরনের রাষ্ট্রীয় বৈষম্য। আমাদের বুঝতে হবে, গবেষণা কোনো শিক্ষকের ব্যক্তিগত সম্পদ নয়, এটি পুরো জাতির সম্পদ; আন্তর্জাতিক জ্ঞানের ভান্ডারের জন্য সম্পদ। কাজেই কেবল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য গবেষণা ফান্ড বরাদ্দ মানে দেশের এক বিশাল অংশকে প্রান্তিক অবস্থানে ঠেলে দেওয়া।
ইউজিসির ভূমিকা খুব একপেশে হয়ে যাচ্ছে। ইউজিসি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তো তেমন কোনো সহায়তা দেয়ই না, বরং এগুলোর ওপর ইউজিসির তেমন কোনো নিয়ন্ত্রণও নেই। বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাণ হলো শিক্ষার্থীরা আর ব্রেইন হলো শিক্ষকেরা কিন্তু ইউজিসি এই দুই গুরুত্বপূর্ণ স্টেকহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষায় তেমন কোনো কার্যক্রমই পরিচালনা করতে পারছে বলে মনে হয় না। মানুষ আশা করেছিল, ২০২৪-এর আন্দোলনের পর ইউজিসি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য কিছু করবে! শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অস্বাভাবিক বেতন আদায় বা শিক্ষকদের গবেষণা সুযোগ প্রদান, প্রমোশন, বেতন-ভাতা, চাকরির নিশ্চয়তা; নিরাপত্তা ও অবসরকালীন সুবিধা; এগুলোর কোনোটাই তেমন গুরুত্বের সঙ্গে দেখাশোনা করতে পারছে না ইউজিসি। সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকের অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র।
দেশের বি ও সি ক্যাটাগরির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে এমনও বিশ্ববিদ্যালয় আছে, যেগুলো একজন লেকচারারকে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা বেতন দেয়, যা আমাদের বর্তমান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতনের চেয়েও কম; এছাড়া অন্যান্য সুযোগসুবিধার কথা বাদই দিলাম। বি এবং সি ক্যাটাগরির ইউনিভার্সিটিগুলোতে অন্যান্য আর্থিক সুযোগ-সুবিধা মূলত তেমন কিছুই নেই। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মূলত কিন্ডারগার্টেন স্কুল বা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের মতো হয়ে পড়েছে। বি ও সি ক্যাটাগরি ইউনিভার্সিটিগুলোতে নেই তেমন কোনো গবেষণা উদ্যোগও। বেশির ভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্যকর কোনো গবেষণা সেলও নেই। যেগুলোতে আছে সেগুলোতেও কাগজে-কলমে নামকাওয়াস্তে একটি সেল আছে, যার বেশির ভাগই অকার্যকর। দুঃখের বিষয়—এই বিষয়গুলো ইউজিসির তদারকির তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। অডিট বা ভিজিটে যাদেরকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পাঠানো হয়, তাদের বাপারে আর কিছু না-ই বললাম!
ইউজিসি সম্প্রতি যে Higher Education Acceleration and Transformation (HEAT) প্রকল্প হাতে নিয়েছে, সেখানে সরকারি-বেসরকারি উভয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশগ্রহণ দেখা গেছে। ৪ হাজার ১৬ কোটি টাকার এই প্রকল্পে (যার অর্ধেকের বেশি বহন করছে বাংলাদেশ সরকার, বাকি বিশ্বব্যাংক) মোট ১৫১টি উপপ্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি-বেসরকারি মিলে ৪৮টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রজেক্ট পেয়েছে, আর সেখানে ১৩টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ও রয়েছে। শতাংশের হিসাবে প্রায় ৩০ শতাংশ। এটি অবশ্যই ইতিবাচক দিক। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়— যখন বড় আন্তর্জাতিক প্রকল্পে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে অন্তর্ভুক্ত করা যায়, তখন জাতীয় গবেষণা ফান্ডে কেন তাদের সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া হয়?
বাংলাদেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একক কোনো রঙে রঙিন নয়। কয়েকটি শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়, যেমন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, ইস্ট ওয়েস্ট, আইইউবি ইতিমধ্যে বিশ্বমানে গবেষণা করছে। আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশনা, বহুজাতিক গবেষণা সহযোগিতা, এমনকি বৈশ্বিক র্যাংকিংয়েও তারা সাফল্যের পরিচয় দিচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি ২০২৩ সালের QS World University Rankings-এ বাংলাদেশের মধ্যে শীর্ষ স্থান পায়। এক জরিপ (Scopus, 2022) অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে সর্বাধিক ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর জার্নালে প্রকাশনা করেছেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষকরা। অথচ, বি ও সি ক্যাটাগরির অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্যকর গবেষণা সেল নেই, শিক্ষকদের গবেষণার জন্য উত্সাহ বা ছুটির সুযোগ নেই। কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আবার মনে করে গবেষণায় শিক্ষকদের যুক্ত হওয়া মানে খরচ বৃদ্ধি। ফলে তারা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গবেষণাকে নিরুত্সাহিত করে। তার পরও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক নিজেদের উদ্যোগে গবেষণা চালাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে যাচ্ছেন নিজের অর্থ ব্যয় করে। গবেষণা থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শেয়ার করছেন, যা ভবিষ্যতে তাদের স্কলারশিপ, উচ্চশিক্ষা ও বৈশ্বিক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছে।
একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষককে গবেষণা ফান্ড দিলে উন্নয়ন শুধু ঐ শিক্ষকের বা সেই বিভাগ বা সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের হয় না, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও এই গবেষণাকর্মে বিভিন্নভাবে জড়িত হয়, যা আমাদের মানবসম্পদ উন্নয়ন ও জাতীয় উন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একজন শিক্ষার্থী যখন রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করার সুযোগ পায়, তার জন্য দেশে-বিদেশে বিভিন্ন জায়গায় স্কলারশিপের রাস্তা সুগম হয়, যা পরবর্তীকালে দেশের উন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের ইউজিসি (UGC India) সে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কেও গবেষণা ফান্ড দেয়, যদিও কিছু শর্ত থাকে। পাকিস্তানের হাইয়ার এডুকেশন কমিশন (HEC) সরকারি ও বেসরকারি উভয় বিশ্ববিদ্যালয়কে অনুদান দেয়। ইউজিসি বাংলাদেশে শুধু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে ফান্ড দেওয়া—যা দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটেও এক অস্বাভাবিক বৈষম্য।
এই বৈষম্যের কয়েকটি বড় প্রভাব রয়েছে। এজন্য মানবসম্পদ উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়; গবেষণা থেকে বঞ্চিত শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। জাতীয় সুষম উন্নয়ন থেমে যায়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপুল শিক্ষার্থী গবেষণার বাইরে থেকে যায়। ফলে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি কমে যায়। যেখানে বিশ্বের অন্য দেশগুলো সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে গবেষণা জোরদার করছে, বাংলাদেশ সেখানে পিছিয়ে যাচ্ছে। এই বৈষম্য দূর করতে হলে—সরকারি-বেসরকারি উভয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য গবেষণা ফান্ড উন্মুক্ত করতে হবে। কার্যকর গবেষণা সেল গঠন বাধ্যতামূলক করতে হবে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে। বরাদ্দ বণ্টনে প্রকাশনার মান, পিএইচডি ডিগ্রি, আন্তর্জাতিক স্বীকৃত জার্নালে প্রকাশিত লেখার মতো বিষয়গুলোকে মূল্যায়নের মানদণ্ড হিসেবে ধরতে হবে। HEAT প্রকল্পের মতো বড় প্রকল্পে যেমন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তেমনি ইউজিসির বার্ষিক গবেষণা ফান্ড বরাদ্দের ক্ষেত্রেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে হবে।
আজকের বিশ্ব জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির বিশ্ব। এখানে গবেষণা ছাড়া কোনো দেশ এগোতে পারে না। বাংলাদেশ যদি সত্যিই উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন চায়, তবে ইউজিসিকে কেবল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমায় আবদ্ধ রাখা ঠিক হবে না। গবেষণা বরাদ্দের সুযোগ দিতে হবে—সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রেই। অন্যথায় ইউজিসি থেকে যাবে ‘Public University Grants Commission’ রূপে; যা একটি বৈষম্যপূর্ণ, একপেশে ও অকার্যকর প্রতিষ্ঠান হয়ে থাকবে। এখন সময় এসেছে, এটিকে সত্যিকার অর্থে একটি জাতীয় উচ্চশিক্ষা কমিশনে রূপান্তর করার।













