শুরু হয়েছে উচ্চশিক্ষার ভর্তি পরীক্ষা। মেডিক্যাল কলেজের ভর্তি পরীক্ষা ইতিমধ্যেই শেষ হয়েছে। প্রকৌশল ও অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েও ভর্তি পরীক্ষার তারিখ নির্ধারিত হয়েছে। ফলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে লক্ষ করা যাচ্ছে এক অজানা আতঙ্ক। কারণ এই ভর্তি পরীক্ষা এখন আর কেবল প্রশ্নপত্রের সঙ্গে লড়াই নয়, এটি এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। পরীক্ষার্থীর পাশাপাশি এই যুদ্ধে নীরব সৈনিক হয়ে অংশ নেন অভিভাবকরাও। সন্তানের ভবিষ্যৎ, সামাজিক মর্যাদা, আর্থিক সক্ষমতা—সবকিছু মিলিয়ে তাদের মনে জমে ওঠে অদৃশ্য এক চাপ। পরীক্ষার আগের রাতগুলোতে যেমন শিক্ষার্থীর চোখে ঘুম আসে না, তেমনি অভিভাবকের বুকেও জমে থাকে অজানা শঙ্কা। কোচিং, গাইড বই, মডেল টেস্টের ভিড়ে সন্তানকে হারিয়ে ফেলবেন না তো—এই ভয়ও কাজ করে।
আর শিক্ষার্থীর কাছে ভর্তি পরীক্ষা মানে আত্মসম্মানের লড়াই। বছরের পর বছর পড়াশোনার ফল যেন এক দিনেই নির্ধারিত হবে—এই ভাবনাই তাদেরকে সারাক্ষণ মানসিক চাপে রাখে, চোখে-মুখে ফুটে ওঠে উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা। কার ছেলে কোন কোচিং করেছে, কার মেয়ে কত নম্বর পাবে—এই তুলনা চলে অভিভাবকদের মধ্যে। ভর্তি পরীক্ষার দিন অভিভাবকেরাও যেন এক অদৃশ্য পরীক্ষায় বসেন। সন্তানের কলম ঠিক আছে কি না, প্রবেশপত্র আছে কি না—এসব খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে তাদের দুশ্চিন্তার শেষ নেই। পরীক্ষার সময় সন্তান ভেতরে, অভিভাবক বাইরে—দুজনেই যেন আলাদা আলাদা মানসিক যুদ্ধে লিপ্ত থাকেন।
অনেক অভিভাবক আবার নিজের জীবনের ব্যর্থতা বা অপূর্ণতা সন্তানের সাফল্যের মাধ্যমে পূরণ করতে চান, যা অজান্তেই সন্তানের ওপর আরো চাপ তৈরি করে। ফল প্রকাশের আগের সময়টা সবচেয়ে কঠিন। এই সময়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা বারবার ফোন হাতে নেন, সংবাদ দেখেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় খোঁজ করেন। সন্তান যদি একটু চুপচাপ থাকে, তারা ভাবেন নিশ্চয়ই ভালো হয়নি। এই মানসিক দোলাচল অনেক সময় বাবা-মার মনের মধ্যে এক চাপা উত্তেজনা তৈরি করে। অথচ এই সময়টাতেই সন্তানের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় অভিভাবকের নির্ভরতা আর সাহস জোগানো উপস্থিতি। কিন্তু উদ্বেগে আচ্ছন্ন অভিভাবক অনেক সময় তা দিতে পারেন না। অবশ্য এই পুরো প্রক্রিয়ায় অভিভাবকরাও কম ভোগেন না।
সন্তানের সঙ্গে সঙ্গে তারাও লাইনে দাঁড়ান, দৌড়ান এক কাউন্টার থেকে আরেক কাউন্টারে, অচেনা শহরে দিশেহারা হন। সীমিত আয়ের পরিবারে ভর্তি পরীক্ষার খরচ, ভর্তি ফি, যাতায়াত, থাকা-খাওয়া ইত্যাদি একটি বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। কেউ ধার করে আসে, কেউ গয়না বিক্রি করে, কেউ সঞ্চয় ভাঙে। এত দুর্দশা ও কষ্টের মধ্যেও কিছু স্বেচ্ছাশ্রমের কাজ লক্ষ করা যায়। মাঝেমধ্যে কিছু কিছু শিক্ষার্থী পানির বোতল, ওষুধ, দিকনির্দেশনা দিয়ে পাশে দাঁড়ায়। অনেক স্থানেই স্বল্প মূল্যে খাবারের ব্যবস্থা করে কর্তৃপক্ষ, পর্দা টানিয়ে ক্লান্ত অভিভাবকদের বসার জায়গা করে দেয়, পরীক্ষার্থীর ব্যাগ, মোবাইল ফোন জমা রাখে ইত্যাদি। এই ছোট ছোট সহায়তাই মানবিকতার আলো জ্বালায়, ভবিষ্যতের পথ সহজ ও শুদ্ধ করে।
ভর্তি পরীক্ষার সময় যাতায়াত ও বাসস্থানের সংকট যেন এক নীরব যুদ্ধ। প্রত্যন্ত গ্রামের ছেলেমেয়েদের সেই যুদ্ধ শুরু হয় পরীক্ষার আগের দিন থেকেই। গ্রামের মেঠোপথ শেষে বাস টার্মিনালে পৌঁছেই তারা বুঝতে পারে—ভর্তি পরীক্ষা শুধু প্রশ্নপত্রের সঙ্গে লড়াই নয়, এটি যাত্রাপথেরও পরীক্ষা। টিকিটের লাইনে দীর্ঘ অপেক্ষা, অতিরিক্ত ভাড়া দাবি, আর ভিড়ের চাপে নিশ্বাস নেওয়াই কঠিন হয়ে ওঠে। তবু মনের ভেতর স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয় আর বাবা-মায়ের আশা তাকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
শহরের পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছানোর পর নতুন আরেক বিপত্তি—থাকার জায়গা। আত্মীয়স্বজনের কেউ নেই, পরিচিত বন্ধুও না। পরিচিত বন্ধুর কিংবা আত্মীয়ের বাসায় থাকতে পারলে ভালো, অন্যথায় একমাত্র ভরসা হোটেল। এক্ষেত্রেও টাকার শ্রাদ্ধ—কোথাও ভাড়া বেশি, কোথাও আবার ভর্তি পরীক্ষার অজুহাতে অতিরিক্ত টাকা চাওয়া হচ্ছে। অনেকে আবার পুরোনো কোনো মেসে ঠাঁই নেয়, যেখানে একটি ছোট ঘরে পাঁচ জন পরীক্ষার্থী গাদাগাদি করে থাকে। মেঝেতে পাতলা বিছানা, চারপাশে অচেনা মুখ—তবু ক্লান্ত শরীর নিয়ে সেটুকুই তখন স্বস্তির আশ্রয়।
পরীক্ষার দিন সকালে যাতায়াতের ভোগান্তি যেন আরো বেড়ে যায়। রাস্তায় যানজট, রিকশাওয়ালার অতিরিক্ত ভাড়া দাবি, আর সময়মতো কেন্দ্রে পৌঁছানোর দুশ্চিন্তায় বুক ধকধক করতে থাকে। অনেকে ভুল বাসে উঠে পড়ে দিশেহারা হয়। শেষ মুহূর্তে হয়তো কোনোরকমে কেন্দ্রে পৌঁছে—ঘড়িতে তখন মাত্র কয়েক মিনিট বাকি। ক্লান্তি আর উদ্বেগ নিয়ে পরীক্ষার হলে ঢোকে। পরীক্ষার হলের বেঞ্চে বসে তারা দেখে, চারপাশে বসা অনেক পরীক্ষার্থীর চোখেও সেই একই ক্লান্তি, একই আশা। প্রশ্নপত্র হাতে গভীর এক নিশ্বাস নিয়ে কলম চালাতে চালাতে ভাবতে থাকে—এই লড়াই শুধু তার একার নয়, হাজারো শিক্ষার্থীর প্রতিদিনের গল্প।
অতঃপর পরীক্ষা শেষে ফেরার পথে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে—সুযোগ পেলে ভবিষ্যতে তারা এমন ব্যবস্থা গড়ে তুলবে, যেখানে ভর্তি পরীক্ষার জন্য কাউকে আর যাতায়াত ও বাসস্থানের এই দুর্ভোগ পোহাতে না হয়। সেই স্বপ্নই তাদেরকে নতুন করে শক্তি জোগায়, কারণ তারা বিশ্বাস করে—সব কষ্ট পেরিয়েই এগিয়ে যেতে হয় স্বপ্নের পথে।
ভর্তি পরীক্ষা জীবনের একটি ধাপ মাত্র, শেষ যুদ্ধ নয়। কিন্তু মনস্তাত্ত্বিক এই যুদ্ধে জয়ী হতে হলে কেবল শিক্ষার্থীর নয়, অভিভাবকের মানসিক পরিপক্বতাও জরুরি। সন্তানের পাশে দাঁড়ানো, ফলাফল যা-ই হোক তাকে গ্রহণ করা, বিকল্প পথ বেছে নেওয়া—এই শিক্ষাটা এই সময়টাতে বড় প্রয়োজন। উদ্বিগ্ন অভিভাবক যদি নিজের দুশ্চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তবে সন্তানও সাহস পায়। কারণ ভর্তি পরীক্ষার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো একটি সুস্থ মন, দৃঢ় আত্মবিশ্বাস আর পরিবারের নিঃশর্ত সমর্থন। এই তিনটি গুণ থাকলে যে কোনো যুদ্ধেই পরাজয় সাময়িক, আর শেখাটাই হবে স্থায়ী।
ভর্তি পরীক্ষার এই যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত সবাইকে সমানভাবে জয়ী করে না। কেউ পায় কাঙ্ক্ষিত আসন, কেউ আবার পরাজয়ের ভার নিয়ে ঘরে ফেরে। কিন্তু হয়রানির স্মৃতি থেকে যায় দীর্ঘদিন। এই অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের শেখায় ধৈর্য, লড়াই আর ব্যবস্থার অসংগতি মোকাবিলা করার পাঠ। তবু স্বপ্নটা মরে না—পরের বছর আবার কেউ প্রস্তুতি নেয়, কেউ বিকল্প পথে হাঁটে। যদি নীতিনির্ধারকরা পরিকল্পিত সময়সূচি, একক ভর্তি পরীক্ষা, পর্যাপ্ত আবাসন, স্বচ্ছ ফলাফল ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারেন, তবে এই যুদ্ধ অনেকটাই মানবিক হতে পারে।
এসব বিবেচনায় গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা, একই দিন বিভিন্ন স্থানে পরীক্ষা নেওয়ার রেওয়াজ চলছে গত কয়েক বছর যাবত্। কিন্তু এখানেও লক্ষ করা গেছে অনেক সুবিধা, অসুবিধা ও সমস্যা। গুচ্ছ পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের হয়রানি অনেকটাই লাঘব হয় বটে, কিন্তু প্রতি বছরই অসংখ্য সিট খালি থাকে। একই দিন বিভিন্ন শহরে পরীক্ষায় প্রক্টরিং নিয়ে আছে প্রশ্ন। আবার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় তাদের নিজস্ব পদ্ধতিতে—অর্থাত্ একই পরীক্ষা একাধিক শিফটে—কঠোর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পরিচালনা করে থাকে। শিক্ষার্থীদের একটু হয়রানি হলেও পরীক্ষার স্বাতন্ত্র্য সর্বমহলে প্রশংসিত।
যাহোক, ভর্তি পরীক্ষা হওয়া উচিত যোগ্যতা যাচাইয়ের উত্সবে, হয়রানির মহড়ায় নয়। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের চোখে তখন আর আতঙ্ক নয়, থাকবে আশার আলো—যেখানে শিক্ষা সত্যিই মুক্তির পথ হয়ে উঠবে। তবে ইউজিসি এবং সব বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পরামর্শে একটি পরীক্ষার মাধ্যমে মেডিক্যাল, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং সাধারণ বিষয়ে ভর্তি হওয়া যায়—এমন পন্থা বের করা সম্ভব।
-
ড. এম মেসবাহউদ্দিন সরকার। অধ্যাপক, তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, আইআইটি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।













