সিলেট আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে তখন চলছে বিপিএলের উন্মাদনা। মাঠের দুই প্রান্তে ঢাকা ক্যাপিটালস ও রাজশাহী ওয়ারিয়র্সের খেলোয়াড়রা ওয়ার্ম-আপ করছেন। আনন্দ-উৎসবের সেই আবহে সহসা ছেদ পড়ল! ঢাকা ক্যাপিটালসের সহকারী কোচ মাহবুব আলী জাকি হঠাৎ মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন৷ চিকিৎসকের প্রাণপণ চেষ্টা ও সিপিআর ব্যর্থ করে তিনি পাড়ি জমালেন পরলোকে৷ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানালেন, হৃদ্রোগই কেড়ে নিয়েছে তার প্রাণ৷ মুহূর্তের ব্যবধানে খেলার মাঠ পরিণত হলো শোকের অরণ্যে৷
এই নশ্বর পৃথিবীতে মানুষের জীবনের নিশ্চয়তা কতটুকু? আমরা জানি, ‘এক সেকেন্ডের নেই ভরসা/ বন্ধ হবে রং তামাশা/ চক্ষু মুদিলে; হায়রে দম ফুরাইলে’— এই গান গেতে গেতেই হাজার হাজার দর্শকের সামনেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন আমাদের বিখ্যাত লোকসংগীতশিল্পী ফিরোজ সাই। এই ঘটনা ঘটেছিল শিল্পকলা একাডেমিতে ১৯৯৫ সালের ১২ জানুয়ারি৷ পটুয়া কামরুল হাসান ১৯৮৮ সালের ২ ফেব্রুয়ারি টিএসসির সামমনের রাস্তায় জাতীয় কবিতা উৎসবের মঞ্চে সভাপতির দায়িত্ব পালনকালে হঠাৎ মৃত্যুমুখে পতিত হন। লম্বা চুলের চিত্রশিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী ২০১৪ সালের ৩০ নভেম্বর আর্মি স্টেডিয়ামে ক্ল্যাসিকাল মিউজিক ফেস্টিভালে বক্তৃতা দিতে গিয়ে বললেন, ‘আমার একটা কথা আছে’— অমনি সেই কথা শেষ করতে না পেরেই মাথা ঘুরে পড়ে গেলেন মঞ্চে এবং পরে সিএমএইচে মারা গেলেন। এভাবেই মৃত্যু আসে অতর্কিতে, অনাহূত অতিথির মতো৷
একইভাবে নিউ ইয়র্কের বেলভ্যু হাসপাতালে অস্ত্রোপচার-পরবর্তী জটিলতায় আচমকা বিদায় গ্রহণ করেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ৷ দুবাইয়ের এক হোটেলের বাথটাব থেকে ভারতীয় চলচ্চিত্র অভিনেত্রী শ্রীদেবী কাপুরের নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়। ৩২ বছর বয়সে মস্তিষ্কের এডিমা রোগে আক্রান্ত হয়ে অতর্কিতে বিদায় নেন মার্শাল আর্ট কিংবদন্তি ক্রস লি। ব্যায়ামাগারে শারীরিক কসরত করার সময় হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে ৪৬ বছর বয়সে ‘না-ফেরার দেশে’ চলে যান ভারতীয় চলচ্চিত্র অভিনেতা ও প্লেব্যাক গায়ক পুণিত রাজকুমার৷ এরকম আকস্মিক মৃত্যুর বহু দৃষ্টান্ত দেওয়া সম্ভব৷ এজন্য কবি সৈয়দ শামসুল হকের লেখা ও এন্ড্রু কিশোরের গাওয়া সেই গানটির কথাও এখানে প্রণিধানযোগ্য— ‘হায় রে মানুষ, রঙিন ফানুস/দম ফুরালেই ঠুস/ তবু তো ভাই কারোর-ই নাই/ একটুখানি হুশ’।
মানুষের জীবন এই আছে এই নাই! অথচ এই পৃথিবীতে যুদ্ধবিগ্রহ, হানাহানি, ওদ্ধত্য, দাস্ভিকতা, অহংকার, ক্ষমতার দাপট, রাষ্ট্রীয় সম্পদের লুটপাট, দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ, অর্থপাচার ইত্যাদি বন্ধ হচ্ছে না। যে কোনো সময় মৃত্যু হতে পারে জেনেও আমরা বেপরোয়া— এ কেমন কথা! আমাদের আসলে প্রয়োজন শুধু ‘সাড়ে তিন হাত মাটি’। তার পরও বাহাদুরির শেষ নাই! কিন্তু মৃত্যু যখন আসবে, তখন এক সেকেন্ডও এদিক-সেদিক করা সম্ভব নবে না। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘তোমরা যেখানেই থাক না কেন, মৃত্যু তোমাদেরকে পাকড়াও করবেই৷ যদি তোমরা সুদৃঢ দুর্গের ভেতরেও অবস্থান করো, তাহলেও (সুরা আন নিসা, আয়াত-৭৮)।’ এছাড়া শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় বলা হয়েছে : ‘জাতস্য হি ধ্রবো মৃত্যু ধ্রবং জন্ম মৃতস্য চ’— যার জন্ম হয়েছে তার মৃত্যু নিশ্চিত (অধ্যায় ২, শ্লোক ২৭)। আর বাইবেল বলছে : ‘মানুষের জীবন কুয়াশার মতো, যা অল্পক্ষণ দেখা যায় এবং পরে অন্তর্হিত হয়’ (যাকোব ৮: ১৪)৷ এর পরও কেন দুনিয়ার প্রতি আমাদের এত মোহ?
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান ক্যানসারের মতো কঠিন রোগের চিকিৎসায় কিছুটা অগ্রসর হলেও মৃত্যুর অমোঘ বিধানের সামনে আজও অসহায়। নতুন নতুন ব্যাধি প্রতিনিয়ত প্রমাণ করছে যে, মানুষের জ্ঞান ও প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা আকাশচুম্বী। এ কথার পরও আমাদের হুঁশ ফিরছে না! এই মহাসত্য মৃত্যুকে শারীরিকভাবে জয় করা সম্ভব নয়, তবে কর্মের মাধ্যমে জয় করা সম্ভব৷ সৎকর্ম, আর্তমানবতার সেবা এবং স্রষ্টার প্রতি আনুগত্যই মানুষকে মৃত্যুর পরেও জীবিত ‘রাখে৷ লোভ ও পাপের জীবন ত্যাগ করে যদি আমরা ন্যায়ের পথে চলতে পারি, তাহলেই আমাদের এই দুনিয়া থেকে প্রস্থান হবে মর্যাদাপূর্ণ। মনে রাখতে হবে, নিঃশ্বাসের বিশ্বাস নাই; সেই নিঃশ্বাসটুকু বের হয়ে গেলে আমরা শুধুই একটি লাশ বা শবদেহ মাত্র৷













