মাথার ওপর প্রচণ্ড রোদ, চারপাশে নদীভরা দেশ, তবু বিদ্যুত্ পেতে আমাদের এখনো সম্পূর্ণভাবে গ্যাস, কয়লা, ডিজেল আর আমদানি করা জ্বালানির দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। এই বৈপরীত্যই বড় প্রশ্ন তোলে—আমরা কি সত্যিই সূর্য আর পানির শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে জীবাশ্ম জ্বালানির শৃঙ্খল ভাঙতে পারব?
অনেক বছর ধরে আমাদের বিদ্যুত্-ব্যবস্থার মেরুদণ্ড জীবাশ্ম জ্বালানি। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘনঘন বন্যা, অকালবৃষ্টি, দীর্ঘ তাপপ্রবাহ—সব মিলিয়ে আমাদের অর্থনীতি ও জীবনযাত্রা ক্রমাগত ঝুঁকির মুখে।
গরমের দিন হঠাত্ বিদ্যুত্-চাহিদা বেড়ে গেলে লোডশেডিং, ভোল্টেজ ওঠানামা, প্রিপেইড মিটারের চাপ—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষকে অসহায় ও বিরক্ত করে তোলে। এটি শুধু প্রযুক্তিগত বা অবকাঠামোগত সমস্যা নয়, এটি নৈতিক প্রশ্নও। আমরা কি এমন ব্যবস্থাতেই চলতে থাকব, যেখানে কম আয়ের মানুষ সব সময় বেশি কষ্ট পাবে, আর আমরা প্রতি বছর আরো বেশি জীবাশ্ম জ্বালানি পুড়িয়ে সংকটকে স্থায়ী করব? জ্বালানি কেবল বিদ্যুত্ নয়, এটি একধরনের মূল্যবোধেরও প্রকাশ। আমরা কী চাই—স্বল্পমেয়াদি স্বস্তি নাকি দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন? বাংলাদেশের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য এই সিদ্ধান্ত কোনো বিলাসিতা নয়, বরং টিকে থাকার প্রশ্ন।
এই প্রেক্ষাপটে সৌরশক্তি আমাদের সামনে বড় সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়। ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ সৌরবিদ্যুতের জন্য উপযোগী; বছরের প্রায় সব সময়ই পর্যাপ্ত সূর্যালোক থাকে। শহরের বাড়ির ছাদ, গ্রামীণ টিনের চাল, শিল্পকারখানার বিশাল ছাদ, স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা-হাসপাতালের ভবন—সবই ভবিষ্যতের ছোট ছোট বিদ্যুেকন্দ্র হতে পারে। গত দুই দশকে লাখ লাখ সৌর হোম সিস্টেম গ্রামে আলো পৌঁছে দিয়েছে; এটি প্রমাণ করে, প্রযুক্তি সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে বাংলাদেশও পারে।
কিন্তু অনেকেই এখনো সৌরশক্তিকে শুধু গ্রামের বিচ্ছিন্ন ঘরে ছোট বাতি জ্বালানোর সমাধান হিসেবে দেখেন। বাস্তবে শহর, উপশহর আর শিল্প এলাকায় সৌরবিদ্যুতের ভূমিকা আরো বড় হতে পারে। শিল্পকারখানার ছাদে বড় আকারে গ্রিড-সংযুক্ত সৌর সিস্টেম বসাতে পারলে দিনের বেলা পিক আওয়ারে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমবে। গ্যাসচালিত পিকার প্ল্যান্ট বা ডিজেল জেনারেটরের প্রয়োজন কমে যাবে, আমদানি করা জ্বালানি কম লাগবে, সঙ্গে কমবে কার্বন নিঃসারণও।
অবশ্যই সৌরবিদ্যুতের শুরুতে একটি প্রাথমিক বিনিয়োগ দরকার, যা সাধারণ পরিবারের জন্য ছোট অঙ্ক নয়। কিন্তু যদি আমরা হিসাব করি, প্রতি মাসে বিদ্যুত্ বিল বাবদ কত দিচ্ছি এবং ভবিষ্যতে জ্বালানির দাম বাড়লে সেই বিল কতটা বাড়তে পারে, তাহলে সৌর প্যানেলে বিনিয়োগ আর এত দূরের কিছু মনে হয় না। ব্যাংকভিত্তিক কিস্তি, স্বল্পসুদে সবুজ ঋণ ও নেট মিটারিং সুবিধা থাকলে মধ্যবিত্ত পরিবার ও ছোট ব্যবসায়ীর পক্ষেও এই বিনিয়োগ বাস্তবসম্মত হয়ে ওঠে।
কৃষিক্ষেত্রে সৌরচালিত পাম্প বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। সেচের জন্য ডিজেল পাম্পের ওপর নির্ভরতা কমাতে পারলে কৃষকের খরচ কমবে, গ্রামে ডিজেল পরিবহনের ঝামেলা ও দূষণ দুটোই কমবে। এই নদীমাতৃক দেশে পাহাড়ি অঞ্চল ও সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি জলবিদ্যুতের যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। এখনো আমাদের মোট বিদ্যুত্ উত্পাদনে জলবিদ্যুতের অংশ খুবই ছোট; কিন্তু পরিকল্পিতভাবে মাইক্রো ও মিনি জলবিদ্যুত্ প্রকল্প নিলে প্রত্যন্ত অঞ্চলে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুত্সহ স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন উন্নয়নের দরজা খুলে যেতে পারে।
পার্বত্য ঝরনা, সেচ খালের ফলো ড্রপ, পাহাড়ি নদীর স্রোত—এসবকে কাজে লাগিয়ে পরিবেশসম্মত ছোট জলবিদ্যুত্ কেন্দ্র গড়ে তোলা গেলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমবে এবং স্থানীয় পর্যায়ে টেকসই বিদ্যুত্ সরবরাহ নিশ্চিত হবে। তবে এ ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার, প্রকৃতির ভারসাম্য এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে, যাতে উন্নয়নের নামে নতুন অবিচার বা পরিবেশ ধ্বংস না ঘটে।
বিশ্বের দিকে তাকালে দেখি, নরওয়ে বহু বছর ধরে প্রায় পুরো বিদ্যুত্ব্যবস্থা জলবিদ্যুতের ওপর দাঁড় করিয়ে রেখেছে। ব্রাজিলও দীর্ঘদিন জলবিদ্যুেকন্দ্রিক উত্পাদনের মাধ্যমে তুলনামূলক কম কার্বন নিঃসারণে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে; পাশাপাশি তারা সৌর ও বায়ুবিদ্যুতেও দ্রুত এগোচ্ছে। বাংলাদেশকেও সেই পথেই হাঁটতে হবে। প্রথমে আমাদের স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে হবে—ধীরে ধীরে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভরতা কমিয়ে আমরা সূর্য ও পানির শক্তিকে জ্বালানি ব্যবস্থার প্রধান ভিত্তি করব। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ করতে চাওয়া কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যেন অকারণ জটিলতা বা নীতির অনিশ্চয়তায় না পড়ে—এটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
শক্তি দক্ষতার উন্নয়ন এই রূপান্তরের অপরিহার্য অংশ। এলইডি আলো, দক্ষ মোটর ও পাম্প, ইনভার্টার প্রযুক্তির এসি, প্রাকৃতিক আলোুবাতাসকে কাজে লাগানো ভালো থার্মাল ডিজাইনের বাড়ি—এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে আমরা বিদ্যুত্-চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারি। শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত শক্তি অডিট করে অপচয়ের জায়গা চিহ্নিত করে ধীরে ধীরে তা কমাতে পারলে আর্থিক সাশ্রয়ের পাশাপাশি জীবাশ্ম জ্বালানির চাপও কমে যাবে।
একই সঙ্গে আমাদের গ্রিড ব্যবস্থা আধুনিক ও স্মার্ট করতে হবে। সৌর ও জলবিদ্যুতের অংশ যত বাড়বে, তত বেশি দরকার হবে স্মার্ট গ্রিড ও স্টোরেজ সমাধান। দিনের বেলা অতিরিক্ত সৌরবিদ্যুত্ সঞ্চয় করে রাতে ব্যবহার করা, বর্ষা ও শুষ্ক মৌসুমে জলবিদ্যুতের ওঠানামা সামাল দিতে নমনীয় লোড ব্যবস্থাপনা করা—এ ধরনের ব্যবস্থা পুরো জ্বালানি ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল ও তুলনামূলক কম ব্যয়সাপেক্ষ করে তুলবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাড়াতে গিয়ে পরিবেশের আরেক ধরনের ক্ষতি যেন না হয়, তা মাথায় রাখতে হবে। কোথাও বড় সৌর পার্ক করলে জমির ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠবে, কোথাও জলবিদ্যুত্ কেন্দ্র করলে নদীর প্রবাহ ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেবে। তাই দরকার সঠিক পরিবেশ মূল্যায়ন, স্থানীয় জনগণের অংশীদারত্ব ও বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা। ছাদভিত্তিক সৌর, ভাসমান সৌর, ভবনের গায়ে সৌর প্যানেল—অর্থাত্ বিকেন্দ্রীকৃত নানা মডেল ব্যবহার করলে একদিকে জমির ওপর চাপ কমবে, অন্যদিকে নগর-গ্রামের ব্যবধানও কমবে।
দর্শনের ভাষায় বলা যায়, জ্বালানিনীতি একটি জাতির ভবিষ্যত্ কল্পনার আয়না। আমরা কি এমন বাংলাদেশ কল্পনা করি, যেখানে নদীর তীরের শহরগুলো শ্বাস নিতে পারে, কৃষক নিশ্চিন্তে ফসল তুলতে পারে, উপকূলের মানুষ বারবার ভিটেমাটি হারায় না, আর আমাদের সন্তানরা পরিষ্কার আকাশ আর সবুজ গাছপালা দেখে বড় হয়? যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলে আজই আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে—সূর্য আর পানি হবে বাংলাদেশের জ্বালানি ভবিষ্যতের সত্যিকারের ভিত্তি। এই সিদ্ধান্ত কোনো দলের পক্ষে বা বিপক্ষে যাওয়া নয়, বরং নিজের দেশকে ভালোবাসার বাস্তব রূপ।













