বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে এক স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায় রচিত হলো। আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত ও ঐতিহাসিক শততম টেস্ট ম্যাচে সেঞ্চুরি করে বাংলাদেশের সাবেক টেস্ট অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম বিশ্বক্রিকেটের ইতিহাসে এক অন্যন্য স্থান অধিকার করলেন। এই কৃতিত্ব অর্জন করার মাধ্যমে তিনি এক অভিজাত ক্লাবের সদস্যপদ লাভ করলেন, যেই ক্লাবে ইতিপূর্বে কতিপয় কিংবদন্তী ক্রিকেটার স্থান পেয়েছেন। মুশফিকুর রহিম একাদশতম ক্রিকেটার হিসেবে শততম টেস্টে শতরান করার গৌরব অর্জন করলেন। এই পর্যন্ত যারা এই সম্মান লাভ করেছেন, তাঁরা হলেন: জো রুট (২১৮), ডেভিড ওয়ার্নার (২০০), ইনজামাম-উল-হক (১৮৪), গর্ডন গ্রিনিস (১৪৯), জাভেদ মিয়াঁদাদ (১৪৫), রিকি পন্টিং (১২০ ও ১৪৩), হাশিম আমলা (১৩৪), গ্রায়েম স্মিথ (১৩১), মুশফিকুর রহিম (১০৬), অ্যালেক স্টুয়ার্ট (১০৫) ও কলিন কাউড্রে (১০৪)।
২০০৫ সালে ইংল্যান্ডের লর্ডসে মাত্র ১৬ বছর বয়সে মুশফিকুর রহিম তাঁর টেস্ট ক্রিকেটে যাত্রা শুরু করেন। প্রথম জীবনে তিনি বিশেষজ্ঞ উইকেটরক্ষক হিসেবে জাতীয় দলে সুযোগ পেলেও, কালক্রমে নিজ ব্যাটিং নৈপুণ্যে তিনি নিজেকে দলের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ রূপে প্রতিষ্ঠিত করেন। গত দুই দশকে তিনি বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে অন্যতম সফল ব্যাটসম্যান রূপে আবির্ভূত হন। টেস্ট ক্রিকেটে তার মোট রান ৬৪৫৭, যা টেস্টে বাংলাদেশের হয়ে সবচাইতে বেশি রান। টেস্টে বাংলাদেশের পক্ষে প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি (২০১৫ সালে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে) করার বিরল কীর্তিও তাঁর দখলে। অধিনায়ক হিসেবেও তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। সবচাইতে বেশি ম্যাচে (৩৪) যেমন তিনি অধিনায়ক ছিলেন, তেমনি অধিনায়ক হিসেবে সবচাইতে বেশি টেস্ট (০৭) জয়লাভও করেছেন তিনি। উইকেটের পেছনে তিনি দীর্ঘকাল বিশ্বস্ততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং সম্মুখভাগে কঠিন পরিস্থিতিতে ঢাল স্বরূপ দাঁড়িয়েছেন। প্রায় দুই দশক ব্যাপী তাঁর এই নিরবচ্ছিন্ন অবদান এবং ক্রিকেটের প্রতি তাঁর গভীর নিষ্ঠা তাঁকে ‘মিস্টার ডিপেন্ডেবল’ উপাধিতে ভূষিত করেছে। তিনি কেবল একজন খেলোয়াড়ই নন, বরং বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের উত্থানের এক মূর্ত প্রতীক বললেও অত্যুক্তি হয় না। ক্যারিয়ার জুড়ে খেলার প্রতি তাঁর যে আত্মনিবেদন, তারই পুরস্কার এই অর্জন।
মুশফিকুর রহিমের দীর্ঘ বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার তরুণ ক্রিকেটারদের জন্য অনুসরণীয়। তাঁর ক্রিকেট জীবন থেকে যে প্রধান শিক্ষাটি লাভ করা যায়, তা হলো— অদম্য সংকল্প ও কঠোর পরিশ্রমের মাহাত্ম্য। বহুবার তিনি সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছেন, কখনও কখনও তাঁর ফর্ম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, কিন্তু প্রতিবারই তিনি দৃঢ় মানসিকতা ও নিষ্ঠার দ্বারা প্রত্যাবর্তন করেছেন। তাঁর ধৈর্য্য, পরিস্থিতি অনুযায়ী খেলতে পারার ক্ষমতা এবং সর্বদা দলের প্রয়োজনে নিজেকে উৎসর্গ করার মানসিকতা থেকে তাঁর উত্তরসূরীদের শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। এই শততম টেস্টে সেঞ্চুরি করে তিনি প্রমাণ করলেন যে, অভিজ্ঞতা ও ইচ্ছাশক্তির সমন্বয় ঘটলে বয়সের বাধা অতিক্রম করাও সম্ভব। তাঁর এই কৃতিত্ব তরুণ প্রজন্মকে নিরন্তর কঠোর পরিশ্রমের দ্বারা নিজেদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য যুগ যুগ ধরে অনুপ্রেরণা যোগাবে নিঃসন্দেহে।
উল্লেখ্য, অস্ট্রেলিয়ার রিকি পন্টিং নিজের শততম টেস্টের দুই ইনিংসেই সেঞ্চুরি করেন। মুশফিক এখন নিজের শততম টেস্টে পন্টিংকে ছুঁয়ে ফেলতে পারেন কি না, তাই দেখার বিষয়! শততম টেস্টে ডাবল সেঞ্চুরির কীর্তি রয়েছে শুধু ডেভিড ওয়ার্নার ও জো রুটের। তাঁদের পাশে নাম লেখাতে পারলে তাঁর গৌরবে বাংলাদেশের ক্রিকেটও গৌরবান্বিত হবে। এর আগে তিনি টেস্ট ক্রিকেটে তিনটি ডাবল সেঞ্চুরি করেছেন। তাঁর দুইটি আবার উইকেটকিপার ব্যাটসম্যান হিসেবে, যার কীর্তি দুনিয়ার আর কারও নেই। তাই এমন প্রত্যাশা করাটা আমাদের জন্য অমূলক হবে না। অভিনন্দন মুশফিকুর রহিম।













