বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণ বলে প্রায়শই একটি কথা শোনা যায়, আইনের ভাষায় যেটি রয়েছে ‘প্রতারণামূলক সম্মতি আদায়’ হিসেবে। ‘বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণ’ নামে কোনো আইন না থাকলেও ‘প্রতারণামূলক সম্মতি আদায়’ আইনের আওতায় এই মামলাটি করা হয়। ‘প্রতারণামূলক সম্মতি আদায়’ বলতে ঠিক কি বুঝিয়েছে, এই ধারায় তার বর্ণনা দেওয়া নেই, ফলে এই ধারাটিকে নানাক্ষেত্রেই, নারীরা যেখানে নিজেকে প্রতারিত মনে করছেন, সেখানে ব্যবহার করা যায়।
বাংলাদেশে ধর্ষণ মামলার বিচার করা হয় ১৮৬০ সালে প্রণীত দণ্ডবিধি অনুযায়ী। দণ্ডবিধি ধারা ৩৭৫-এ ধর্ষণের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, একজন পুরুষ যদি আইনে বর্ণিত পাঁচ অবস্থায় কোনো নারীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করে তবে তা ধর্ষণ হিসেবে বিবেচিত হবে।
এক. নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে শারীরিক সম্পর্ক করা।
দুই. নারীর সম্মতির বিরুদ্ধে কিংবা মৃত্যু বা আঘাতের ভয় দেখিয়ে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের সম্মতি আদায় করা।
তিন. কোনো নারীর বয়স যদি ১৬ বছরের নিচে হয় তবে তার সম্মতি নেওয়া হোক বা না নেওয়া হোক, তা ধর্ষণ বলে গণ্য হবে।
চার. কোনো নারী যদি ভুল করে একজন পুরুষকে নিজের আইনসংগত স্বামী ভেবে তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কের সম্মতি দেন এবং পুরুষটি জানেন যে তিনি তার স্বামী নন, আইনের দৃষ্টিতে এমন শারীরিক সম্পর্কও ধর্ষণ হিসেবে পরিগণিত হবে।
পরবর্তী সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০৯-এর (১) নং ধারায় ধর্ষণের অভিযোগ প্রমাণিত হলে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান করা হয়। একই সঙ্গে এর ব্যাখ্যায় নতুন একটি শব্দ সংযোজন করা হয়। আর তা হলো ‘প্রতারণামূলকভাবে সম্মতি আদায়’। ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ‘যদি কোনো ব্যক্তি বিবাহ বন্ধন ব্যতীত ষোল বত্সরের অধিক বয়সের কোনো নারীর সহিত তাহার সম্মতি ব্যতিরেকে বা ভীতি প্রদর্শন করিয়া বা প্রতারণামূলকভাবে তাহার সম্মতি আদায় করিয়া, অথবা ষোল বত্সরের কম বয়সের কোনো শিশুর সহিত তাহার সম্মতিসহ বা সম্মতি ব্যতিরেকে যৌনকর্ম করেন, তাহা হইলে তিনি উক্ত নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবেন।’
লক্ষণীয়, ১৯৬০ সালের তৈরি আইনের ৩৭৫ নম্বর ধারায় ৪নং সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ‘কোনো নারী যদি ভুল করে একজন পুরুষকে নিজের আইনসঙ্গত স্বামী ভেবে তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কের সম্মতি দেন, এবং পুরুষটি জানেন যে তিনি তার স্বামী নন, আইনের দৃষ্টিতে এমন শারীরিক সম্পর্কও ধর্ষণ হিসেবে পরিগণিত হবে।’ অর্থাত্ একজন নারী এতটাই অবলা এবং বোধহীন যে তিনি তার স্বামীকে চিনতে পারবেন না এবং কেউ তার স্বামী হিসেবে পরিচয় দিলেই তিনি তা মেনে নিবেন! ১৯৬০ সালে হয়তো এই আইনের ভিন্ন বাস্তবতা ছিল কেননা নারীরা তখন সামাজিক কারণেই এমনকি বিয়ের সময়ও স্বামীর মুখ দেখতেন না। তাদের চোখ থাকত লম্বা ঘোমটায় আবৃত, কিন্তু ২০২৫ সালে এসে এই আইনের একই বাস্তবতা আছে কি? আজকের নারীরাও কি এতটাই অবলা ও দৃষ্টিহীন যে তারা তার স্বামীর মুখ দেখেন না? আরেকটি দিক হলো ২০০০ সালের আইনে উল্লিখিত ‘প্রতারণামূলক সম্মতি আদায়’। এই আইনটি বুঝতে হলে আমাদের ‘সম্মতি’ শব্দটি সম্পর্কে ভালো করে বুঝতে হবে।
বাংলাদেশের ১৮৭২ সালের চুক্তি আইনের সংজ্ঞা অনুযায়ি, ‘সম্মতি’ বলতে সাধারণত দুই বা ততোধিক ব্যক্তিকে বোঝায়, যারা একই অর্থে একই বিষয়ে সম্মত হয়। ‘মুক্ত সম্মতি’ একটি আরো সুনির্দিষ্ট আইনি শব্দ, যার অর্থ এমন ‘সম্মতি যা বলপ্রয়োগে, অযৌক্তিক প্রভাব, জালিয়াতি, ভুল উপস্থাপনা বা ভুলের মাধ্যমে প্রাপ্ত হয় না।’ জাতিসংঘের সংজ্ঞা মতে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা প্রেক্ষাপটের ক্ষেত্রে সম্মতি মানে শুধু ‘হ্যাঁ মানে হ্যাঁ’ এবং এটি অবশ্যই প্রলোভন বা জোরজবরদস্তি ছাড়াই অবাধে দেওয়া উচিত ।
দুটো আইনেই দেখা যায়, যখন সম্মতির কথা আসছে সেটা হবে প্রলোভনহীন এবং জোড়জবরদস্তিমুক্ত। জোড়জবরদস্তি হলে বা প্রলোভনে হলে সেটা সম্মতি নয় বা সেই বিষয়টিকে সম্মতি বলা যায় না। যখন ‘সম্মতি’ শব্দটি যুক্ত আছে তখন তার সঙ্গে ‘প্রতারণা’ শব্দটি যায় না। অর্থাত্ প্রতারণামূলক সম্মতি হয় না।
এবারে শব্দের বেড়াজাল এবং আইন থেকে বেড়িয়ে যদি আবেগ এবং অনুভূতি নিয়ে আলোচনা করি তাহলে বিষয়টি কি দাঁড়ায়? অর্থাত্ আইন এখানে বলছে দুটো বিষয় :এক. নারী স্বেচ্ছায় কারো সঙ্গে বিবাহ বহির্ভূত যৌন সম্পর্কে যেতে পারে না এবং দুই. নারী হলো অসহায় এবং বোধহীন।
এই আইন নারীকে তার যৌনতা দিয়ে ভালো-মন্দ বিচার করছে এবং বলছে নারী শুধু তখনই বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে যেতে পারে যখন সে নিশ্চিত যে, ঐ ব্যক্তিটি তাকেই বিয়ে করবে। এবার যদি ধর্ষণের মেডিক্যাল ভাষার কথা বলি তাহলে ‘ধর্ষণ হলো তাই, যখন নারী যৌন অনুভূতি বোধ করেন না এবং সেই সময় যৌন সম্পর্কের কারণে তার যৌনাঙ্গ আহত হয়।’ যে কারণে বৈবাহিক ধর্ষণের মতো বিষয় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের আইনে রয়েছে। অর্থাত্ বৈবাহিক সম্পর্ক থাকলেই স্ত্রীর সঙ্গে পুরুষ তার ইচ্ছেমতো যৌন সম্পর্ক করতে পারবে এমনটা নয়। ধর্ষণকে আমরা দেখি মান-সম্মানের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে, কিন্তু অন্যান্য দেশে যৌনসহিংসতাকে দেখা হয় সহিংসতা হিসেবে। শারীরিক আঘাত করলে যেমন মানুষের শরীর ও মন আহত হয়, তেমনি অনিচ্ছাকৃত সম্পর্কের ফলে নারী আঘাতপ্রাপ্ত হয় বলেই এটা সহিংসতা। এর সঙ্গে মান-ইজ্জতের কোনো সম্পর্ক নেই।
প্রতারণামূলকভাবে যৌনসম্পর্কে সম্মতি আদায় আইনটি তাই নারীকে সম্মান বা নারীর অধিকার আদায়ের আইন নয়, বরং নারীকে অসম্মান, নারীকে সামাজিকভাবে অধঃস্তন এবং নারীর যৌনতা নিয়ে কুসংস্কারকেই প্রমোট করে এবং নারীর মর্যাদাকে খর্ব করে। এই আইনটি নারীর অধিকারের বিষয়টিকে উহ্য করে, বরং নারীকে অবজেক্ট হিসেবে আবারও প্রকাশ করে। একজন মানুষ সে নারী বা পুরুষ যেই হোক না কেন, সে যখন কারো সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়ায় তখন দুই জনার অনুভূতিই সমান থাকে আবার সম্পর্কের কোনো এক পর্যায় কারো অনুভূতি না-ও থাকতে পারে। সম্পর্কের সময় বা আবেগের মুহূর্তে কেউ কখনো চিন্তা করে না যে সে এই সম্পর্কে কখনো থাকবে না। কিন্তু কোনো এক সময় সম্পর্ক ফিকে হতে পারে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুই পরিবর্তন হতে পারে। তার মানে এই নয় যে, বিয়ে করবে বলে যে সম্পর্কে তারা জড়িয়েছে সেই সম্পর্কটি তখন অনুভূতিহীন ও প্রতারণামূলক ছিল এবং বিয়ে হয়নি বলে সম্পর্কটি প্রতারণামূলক হয়েছে।
নারীকে ঘিরে সহিংসতা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে কুসংস্কার। আর এই কুসংস্কারগুলোর ফলেই নারীর প্রতি সহিংসতা আরো বেশি হয় এমনকি শিকার নারীরা আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। শারীরিক বিষয়কে শুধু পুরুষের একক অধিকার হিসেবে দেখা এবং নারীকে অবজেক্ট হিসেবে দেখা হয় এখনো। এবং এ ধরনের আইনের প্রয়োগের ফলে নারী নিজের অধিকারকে নিজেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। এবং এমন আইন দুইজন মানুষের মাঝে তৈরি সুন্দর সময়টিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। এছাড়া, এই আইনটির অপপ্রয়োগের ফলে একজন নির্দোষ ব্যক্তি দোষী সাব্যস্ত হতে পারে। দুই জনের সম্মতিতে তৈরি সম্পর্কের দায় ও দায়িত্ব দুই জনেরই। সেখানে একজন দোষী এবং অন্য জনকে ভিকটিম হিসেবে প্রমাণ করা শুধু সম্পর্ককে অসম্মানই করে না, বরং নারীকেও অপমান করে এবং নারীর অধিকারকে খর্ব করে।













