ব্রাজিলের আমাজান লাগায়ো শহর বেলেমে জাতিসংঘের আয়োজনে চলমান বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন তথা ‘কপ ৩০’-এ বিভিন্ন পর্বের বিষয়ভিত্তিক আলোচনায় বিভিন্ন দেশের সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি, বিজ্ঞানী, গবেষক, অর্থনীতিবিদদের বক্তব্যে উপস্থাপিত তথ্য উপাত্তে কার্বন নিঃসারণ হ্রাস এবং ক্ষতিগ্রস্ত দেশসমূহের জন্য অর্থায়নে হতাশার চিত্র ফুটে উঠেছে। একই সঙ্গে কার্বন নিঃসারণ হ্রাসে নির্গমনকারী দেশসমূহের ভূমিকা রহস্যজনক। একইভাবে মাত্রাতিরিক্ত কার্বন নিঃসারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশসমূহের জন্য অর্থায়নে আগে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, গড়িমসি লক্ষণীয়।
এমনি অবস্থায় সম্মেলনে অংশ নেওয়া বিজ্ঞানী, গবেষক, পরিবেশবিদ, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও অর্থনীতিবিদদের বক্তব্যে অতিমাত্রায় কার্বন নিঃসারণকারী দেশসমূহের ভূমিকায় হতাশার তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, কার্বন নিঃসারণ ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে রাখতে প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নে নেতিবাচক অবস্থানে ‘পৃথিবীকে উত্তপ্ত উনুনের দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে’। জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত দেশসমূহকে অর্থায়নের ক্ষেত্রে ধনী ও শিল্প উন্নত দেশসমূহের অনীহায় ক্রমাগত জলবায়ু ঝুঁকির পথে ঠেলে দিচ্ছে ক্ষতিগ্রস্তদের। তাছাড়া সম্মেলনে এ দুটো বিষয়ে উন্নত দেশসমূহের প্রতিনিধিদের প্রবল আপত্তি এবং বিরোধিতায় এবারের সম্মেলন মূলত বিশ্ববাসীকে হতাশ করেছে এবং কপের ভবিষ্যত্ অনিশ্চিত করে তুলছে। এই কঠিন বাস্তবতায় বাংলাদেশসহ ক্ষতিগ্রস্ত দেশসমূহকে এবং এসব দেশের মানুষকে ‘জলবায়ু ঝুঁকির কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ’ ছাড়া দ্বিতীয় কোনো পথ খোলা নেই।
কপ ৩০ জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনে বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করেছেন, বিশ্বব্যাপী জীবাশ্ম জ্বালানির নির্গমন ২০২৫ সালে আবারও নতুন রেকর্ড স্পর্শ করবে। তবে কিছু সংকেত অনুযায়ী পৃথিবী সম্ভবত শীর্ষ নির্গমনের দিকে এগোচ্ছে। আবার অনেকের ধারণা, ১০ বছরের মধ্যে মোট গ্রিনহাউজ গ্যাসের নির্গমন কমতে শুরু করবে। অন্যদিকে, গ্লোবাল কার্বন প্রজেক্টের ১৩ নভেম্বর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জীবাশ্ম জ্বালানি দহন এবং সিমেন্ট উত্পাদন থেকে ২০২৫ সালে নির্গমন ১.১% বৃদ্ধি পেয়ে ৩৮.১ বিলিয়ন টন কার্বন নিঃসারণ হবে। বর্তমানে বৈশ্বিক গ্রিনহাউজ গ্যাসের নির্গমন প্রায় ১০ বছর আগে প্যারিস চুক্তি স্বাক্ষরের সময়ের তুলনায় ১০% বেশি এবং ১.৫ ডিগ্রি উষ্ণতার মাত্রার অনেক ওপরে। যদিও ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো দ্রুত উন্নয়নশীল দেশগুলোর দিকে বেশি নজর যায়, তবুও নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোও অর্থনীতি বাড়াতে এবং জীবাশ্ম জ্বালানির চাহিদা পূরণে নির্গমন বাড়াচ্ছে। পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষ এমন জীবাশ্ম জ্বালানি প্রকল্পের তিন মাইলের (পাঁচ কিলোমিটার) মধ্যে বসবাস করছে। এতে দুই বিলিয়নেরও বেশি মানুষ এবং গুরুত্বপূর্ণ ইকোসিস্টেমের স্বাস্থ্যকে ঝুঁকিতে ফেলবে, প্রথম বারের মতো এমন গবেষণায় জানানো হয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের নতুন একটি রিপোর্টে দেখা গেছে, বর্তমানে ১৮ হাজার ৩০০-এর বেশি তেল, গ্যাস ও কয়লা প্রকল্প বিশ্বের ১৭০টি দেশে ছড়িয়ে আছে, যা পৃথিবীর বিশাল অংশ জুড়ে বিস্তৃত। এবং বিপুল পরিমাণ কার্বন নিঃসারণ করে এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান। তেল, গ্যাস বা কয়লা ড্রিলিং ওয়েল, প্রসেসিং প্ল্যান্ট, পাইপলাইন এবং অন্যান্য জীবাশ্ম জ্বালানি সুবিধার কাছাকাছি বসবাস করার ফলে ক্যানসার, শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা, হার্ট ডিজিজ, অকাল জন্ম এবং মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যায়। এছাড়া পানির উত্স, বায়ুর মান এবং ভূমিদূষণও বৃদ্ধি পায়।
গত দুই দশকে চীন এখন বিশ্বব্যাপী মোট গ্রিনহাউজ গ্যাসের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের জন্য দায়ী। প্রধান কারণ হলো, দেশের বিশাল ও সম্প্রসারিত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্র। আন্তর্জাতিক এনার্জি এজেন্সি অনুযায়ীর তথ্য, গত বছরে চীন প্রায় ২.৩ বিলিয়ন টন কয়লা জ্বালিয়েছে। চীন এখন বৈশ্বিক ক্লিন-এনার্জি খাতের নেতৃত্ব দিচ্ছে, দ্রুত ইলেকট্রিক ভেহিকেল, বায়ু ও সৌরশক্তিতে বিনিয়োগ করছে। চীন ২০৩৫ সালের মধ্যে শীর্ষ নির্গমন থেকে কমপক্ষে ৭% হ্রাসের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, চলতি বছর বিশ্বব্যাপী জীবাশ্ম জ্বালানির নির্গমন বাড়বে। এর মধ্যেও আশার খবর হলো, বৈশ্বিক কার্বন ডাইঅক্সাইড নির্গমন ও কার্বন শোষণ সক্ষমতার বিশ্লেষণে অন্তত ৩৫টি দেশ কার্যকরভাবে ডিকার্বনাইজেশনের পথে হাঁটছে। অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, নিউজিল্যান্ডসহ আরো বেশ কয়েকটি দেশে গত দশকে জীবাশ্ম জ্বালানির নির্গমন উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে, কিন্তু তাদের অর্থনীতি বেড়েছে। চীনের নির্গমন বৃদ্ধির হারও সাম্প্রতিক দশকের তুলনায় অনেক কম এবং বছরের শেষে প্রায় শূন্য প্রবৃদ্ধিতে নামতে পারে। বাস্তবে এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন না হলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি প্যারিস চুক্তির লক্ষ্যমাত্রার অনেক ওপরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
এবারের প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, বিশ্বের মানবসৃষ্ট ও প্রাকৃতিক কার্বন উত্স ও সিঙ্ক নির্ণয়ে বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা বেড়েছে। কার্বন সিঙ্ক বলতে এমন সব প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম ব্যবস্থা বোঝায় যেখানে নির্গমনের চেয়ে বেশি কার্বন শোষিত হয়। তবে বনের নিধন, জমির অবক্ষয় ও পুনঃবনায়নের মতো ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তনজনিত নিট কার্বন নির্গমন গত দশকে কমেছে। অবশ্য সগর, মহাসাগর ও স্থলভাগের কার্বন সিঙ্ক মানবসৃষ্ট নির্গমনের অর্ধেক শোষণ করে। কিন্তু নতুন তথ্য বলছে, এই সিঙ্কগুলোর প্রত্যাশা বাড়ছে না। ১৯৬০ সাল থেকে জলবায়ুর প্রভাবে সিঙ্কের সম্ভাবনা কমে গেছে, ফলে বায়ুমণ্ডলে অতিরিক্ত ৮ পিপিএম কার্বন জমা হয়েছে। বর্তমানে তা ৪২৫ পিপিএম ছাড়িয়ে যাবে।
অন্যদিকে জলবায়ু ঝুঁকি হ্রাসের সঙ্গে অর্থায়ন ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। ২০১৫ সালে প্যারিসে যে বৈশ্বিক জলবায়ু চুক্তিটি হয়েছে তা ইতিহাসে প্রথম বারের মতো জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার ক্ষেত্রে বিশ্বের দেশগুলোকে একতাবদ্ধ করছে। তখন ২০০টির মতো দেশ গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসারণ কমিয়ে আনতে এবং অর্থায়নে যে ঐকমত্য পোষণ করেছে তাকে তখন অনেক পর্যবেক্ষকই ‘ঐতিহাসিক অর্জন’ বলে বর্ণনা করছেন। কিন্তু বাস্তবে প্যারিস চুক্তি অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত দেশসমূহকে কার্বন নিঃসারণ হ্রাস কিংবা অর্থসহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি সেই অর্থে বাস্তবায়ন হয়নি। তাই এবারের কপ ৩০ সম্মেলনে জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজনের চাহিদা এবং ন্যায্য পরিবর্তনের বিষয়ে উত্তপ্ত বিতর্ক হয়েছে। এতে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি অংশ নিলেও, উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের মধ্যকার বিভাজনে তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি।
এই বিতর্কে বাংলাদেশ বৈশ্বিক জলবায়ু কূটনীতিতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় তার নেতৃত্বের ভূমিকা পুনর্ব্যক্ত করে। মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতারের নেতৃত্বে দেশের প্রতিনিধিদল ন্যায্য জলবায়ু কর্মকাণ্ডের প্রতি বাংলাদেশের অব্যাহত প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেন। কপ ৩০ সম্মেলনস্থলে বাংলাদেশ প্যাভিলিয়নে অনুষ্ঠিত ‘হিট স্ট্রেস ইন ঢাকা : ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স সলিউশন’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ন্যায়সংগত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জলবায়ু কর্মকাণ্ড এগিয়ে নিতে নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত। এ সময় তিনি ক্ষয়ক্ষতি, অভিযোজন এবং জলবায়ু অর্থায়নের বিষয়ে ঢাকার অবস্থান তুলে ধরেন। অভিযোজন অর্থায়ন তিন গুণ বৃদ্ধির এবং ক্ষয়ক্ষতি পূরণে তহবিল ব্যবস্থাপনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। বাস্তবে অভিযোজন অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা কখনো পূরণ হয়নি। গত বছর কপ ২৯-এ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ২০২৫ সাল থেকে বার্ষিক ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার সংগ্রহের প্রস্তাব থাকলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। যদিও ২০৩৫ সালের মধ্যে ৩০০ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়; কিন্তু যদি এই কপে প্রতিশ্রুত অর্থায়নের জন্য একটি স্পষ্ট রোড ম্যাপ ও স্বচ্ছ প্রতিবেদন ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয়, তবে সেটিও অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
একইভাবে আফ্রিকান গ্রুপ ও এলএমডিসি (সমমনা উন্নয়নশীল দেশগুলো) উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে স্পষ্ট ও পরিমাপযোগ্য প্রতিশ্রুতি দাবি করেছে। তারা বলেছে, বিদ্যমান প্রতিশ্রুতি অপর্যাপ্ত এবং এখনো পূরণ হয়নি। ল্যাটিন আমেরিকান জোট বলেছে, জলবায়ু সহযোগিতা সদিচ্ছার নয়, এটি একটি আইনি বাধ্যবাধকতা। তারা ধনী দেশগুলোর প্রতি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়নে আহ্বান জানিয়ে বলেছে, লিঙ্গ সমতা, সম্মুখসারির জনগোষ্ঠী এবং স্থানীয়ভাবে পরিচালিত অভিযোজনের সমর্থনে প্রতিষ্ঠিত অভিযোজন তহবিল এখনো অত্যন্ত অপ্রতুল। আফ্রিকান গ্রুপ এবং অ্যালায়েন্স অব স্মল আইল্যান্ডস্থ দুর্বল দেশগুলোর জন্য সরাসরি তহবিল প্রবেশাধিকারের দাবি করেন। আফ্রিকান ও আরব রাষ্ট্রগুলো অভিযোজন অর্থায়নের ব্যবধান নিয়ে গভীর হতাশা প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং সুইজারল্যান্ড তাদের আর্থিক অবদান বৃদ্ধির আগে আরো শক্তিশালী স্বচ্ছতা ও আর্থিক নিরাপত্তার দাবি করেছে।













