স্থানীয় সরকারের কাঠামোয় জেলা পরিষদ একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর। কেন্দ্রীয় সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমের পাশাপাশি জেলা পরিষদ জেলার স্থানীয় উন্নয়ন, অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক কল্যাণ-সংক্রান্ত কাজগুলোতে যুগ যুগ ধরে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে এসেছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এখনো পর্যন্ত জেলা পরিষদের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা সরকারি পেনশন সুবিধার আওতায় আসেননি। স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হলেও তারাই জেলা পর্যায়ে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নে নিরলসভাবে কাজ করছেন এবং উন্নয়নকার্যের তদারকিতে জেলা-রক্ষক হিসেবেই রয়েছেন।
বৈধভাবে জেলা পরিষদের কর্মচারীরা স্থানীয় সরকার (জেলা পরিষদ) আইন, ২০০০ অনুযায়ী পরিচালিত হন। সেই কারণে জেলা পরিষদে চাকরিকে ‘সরকারি চাকরি’ হিসেবে গণ্য করা হয়নি এবং পেনশন সুবিধা নিশ্চিত হয়নি। এর ফল—দীর্ঘদিন কর্মজীবন শেষে অনেকেই এককালীন সামান্য অনুদান নিয়ে আর্থিক অনিশ্চয়তায় পতিত হন; কেউ অসুস্থ হয়ে বিনা চিকিত্সায় মারা গেছেন। হাজার হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর অবসর-জীবন মানবেতর হওয়ার কাহিনি এই প্রতিষ্ঠানের স্মৃতি।
পেনশন কেবল আর্থিক সুবিধা নয়; এটি কর্মজীবনের স্বীকৃতি ও অবসরের পর মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের নিশ্চয়তা। সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষক, বিভিন্ন সামরিক ও বেসামরিক বাহিনীর কর্মচারীরা পেনশন ভোগ করছেন—কিন্তু জেলা পরিষদের কর্মীরা এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এর ফলে তাদের মনোবল, প্রশাসনিক দক্ষতা ও ভবিষ্যত্ পরিকল্পনায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, যা শেষ পর্যন্ত সেবার মানে প্রতিফলিত হয়।
ইতিহাসও ইঙ্গিত দেয়—জেলা পরিষদের বহু প্রতিষ্ঠানকেই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পুনর্গঠিত করে আলাদা সংস্থা হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে; সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মচারীরা পেনশন পাচ্ছেন, অথচ জেলা পরিষদের কর্মীরা আজও বঞ্চিত। তাই এই বৈষম্য দূর করা জরুরি—এটাই প্রকৃত বিকেন্দ্রীকরণ ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতার শর্ত।
পেনশনাভাবে যেতে হলে নীতিগত পদক্ষেপ প্রয়োজন। স্থানীয় সরকার (জেলা পরিষদ) আইন, ২০০০-এ সংশোধন আনা বা পেনশন সংযোজন করে একটি ‘জেলা পরিষদ কর্মকর্তা-কর্মচারী (পেনশন) বিধিমালা’ প্রণয়ন করা যেতে পারে। বিধিমালায় চাকরির মেয়াদ, অবসরকালীন সুবিধা, পেনশন হিসাবের ধরন ইত্যাদি স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
এক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার বিভাগ (এলজিডি), অর্থ মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগ অপরিহার্য। একটি সমন্বিত কমিটি গঠন করে আর্থিক প্রভাব, জনবলকাঠামো ও বিদ্যমান বিধিবিধান বিশ্লেষণ করার পর সুস্পষ্ট আইনগত বিধান প্রণয়ন করা উচিত। জেলা পর্যায়ের সেবা রেকর্ড ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ করে প্রত্যেক কর্মীর যোগদানের তারিখ, চাকরির ধরন ও অবসরের বয়স অনুযায়ী পেনশন হিসাব তৈরি করা যায়। পেনশন প্রদানের কার্যক্রম তদারকির জন্য একটি পেনশন সেল গঠনের প্রস্তাবও করা যায়।
ইতিমধ্যে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় জেলা পরিষদগুলোকে পেনশন সংক্রান্ত তথ্য চেয়ে পত্র দিয়েছিল; সেসব তথ্য প্রেরণ হলেও কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তবে ১৫ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে ২২৬০ নম্বর স্মারকে স্থানীয় সরকার বিভাগ জেলা পরিষদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনশন প্রদানের বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতামত চেয়েছে—এটি ইতিবাচক সূচনা। যদি অর্থ মন্ত্রণালয় পজিটিভ মতামত দেয় এবং সরকার অনুমোদন দেয়, তাহলে জেলার নিজস্ব গ্র্যাচুইটির তহবিল ও ব্যাংক হিসাব থেকে অবসরপ্রাপ্ত কর্মীদের পেনশন প্রদানের ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে—অতিরিক্ত সরকারি বরাদ্দ না দিলেও।
উল্লেখ্য, ১৮৭০ সালে গ্রাম চৌকিদারি আইন পাশের মাধ্যমে পল্লি অঞ্চলে এক স্তরবিশিষ্ট স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়। ১৮১৭ সনে তত্কালীন ব্রিটিশ লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে জিলা বোর্ড সেস কমিটি বিল উত্থাপিত হয় এবং ঐ বছরেই তা আইনে পরিণত হয়। এ আইনের অধীন প্রতিটি জেলায় জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের তৃত্বে জেলা বোর্ড সেস কমিটি গঠিত হয়। ১৮৭১ সালে দশম বেঙ্গল অ্যাক্টের অধীনে একটি রোড কমিটি গঠিত হয়। ১৮৭১ সাল থেকে ১৮৮৫ সাল পর্যন্ত এ কমিটির অস্তিত্ব ছিল। স্থানীয় সরকার গঠনের এটিই ছিল প্রাথমিক পদক্ষেপ। সেস কমিটির অভিজ্ঞতার আলোকে ১৮৮৫ সালে লোকাল সেলফ গভর্নমেন্ট অ্যাক্ট প্রণীত হয় এবং রোড সেস কমিটির বদলে জেলা বোর্ডের সৃষ্টি হয়। ১৮৮৫ সালে লোকাল সেলফ গভর্নমেন্ট অ্যাক্ট বলে তত্কালীন বাংলায় ১৬টি জেলায় বিভিন্ন ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড গঠিত হয়। ১৯৫৯ সনে মৌলিক গণতন্ত্র আদেশের অধীন ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডকে নতুন আঙ্গিকে পরিণত করে। ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিল নামকরণ করা হয়। এ ব্যবস্থায় ১৯৬৩ সালে জেলা পরিষদের প্রথম নির্বাচন হয়। দ্বিতীয় এবং সর্বশেষ ১৯৬৬ সনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর স্বাধীনতা-পরবর্তী কালে ১৯৭২ সনে নির্বাচিত পরিষদ ভেঙে দিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে জেলা প্রশাসককে এর প্রশাসক করে ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিলের যাবতীয় কার্যাবলি পরিচালনা ও তত্ত্বাবধানের ক্ষমতা অর্পণ করা হয় এবং ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিলের স্থলে জেলা বোর্ড নামকরণ করা হয়। ১৯৭৬ সনের স্থানীয় সরকার অধ্যাদেশ জারি করা হয় এবং জেলা বোর্ডের নামকরণ করা হয় জেলা পরিষদ স্থানীয় সরকার (জেলা পরিষদ) আইন ২০০০। এই আইন দ্বারা জেলা পরিষদ বর্তমানে পরিচালিত হয়ে আসছে।
স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করে দেশের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব। জেলা পরিষদ সেই কাঠামোর একটি স্তম্ভ; আর এর কর্মকর্তা-কর্মচারীর জীবন নিরাপদ না করা পর্যন্ত প্রকৃত বিকেন্দ্রীকরণ অর্ধেকই থেকে যাবে। তাই—পেনশনপ্রথা চালুর উদ্যোগ সময়ের দাবি।













