কৃষিভিত্তিক বাংলাদেশে অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা, গ্রামীণ জীবন, কর্মসংস্থান—সব ক্ষেত্রেই কৃষি খাতের ভূমিকা অপরিসীম। ধান, গম, ডাল, সবজি, পাট, আখ, ফলসহ বিভিন্ন ফসল উত্পাদনের মাধ্যমে কৃষি শুধু মানুষের খাদ্যচাহিদাই পূরণ করে না, বরং শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ দারিদ্র্য হ্রাসে রাখেন বড় ভূমিকা।
বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ গ্রামে বাস করে, আর সেই গ্রামের অর্থনীতি, জীবিকা ও সামাজিক কাঠামোর মূল ভিত্তি হলো কৃষিকাজ। উর্বর মাটি, পানি, খোলা পরিবেশ এবং তুলনামূলক ভালো উত্পাদন সম্ভাবনার কারণে কৃষি মূলত গ্রামকেন্দ্রিকভাবেই বিকশিত হয়েছে। ইতিহাস বলছে, আদিম যুগে নারীর হাত ধরেই এই কৃষিকাজের সূচনা হয়েছিল। সে সময় পুরুষরা শিকার করতে চলে গেলে নারীরা গৃহস্থালি কাজের পাশাপাশি ফলমূলের বীজ ঘরের সামনে ফেলতেন, আর সেখান থেকে চারা গজানো দেখে আনন্দিত হতেন। এভাবেই নারীর হাতে বীজ বপন ও কৃষি উত্পাদনের চর্চা শুরু হয়। সেই থেকে আজ অবধি নারীরা কৃষির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত রয়েছেন। অধিকন্তু, সময়ের পরিক্রমায় কৃষিতে এখন নারীর অংশগ্রহণ আরো বেড়েছে। উপরন্তু, নারীর শ্রমই সবচেয়ে বিস্তৃত এবং ধারাবাহিক। তবে দুঃখজনকভাবে নারীর এই অবদান সেভাবে স্বীকৃত নয়।
তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের কৃষি খাতে নারী ও পুরুষের অংশগ্রহণের ধরন ও স্বীকৃতির মধ্যে বড় বৈষম্য রয়েছে। ফসল রোপণ, আগাছা পরিষ্কার, সবজি উত্পাদন, গবাদি পশু পালন, বীজ সংরক্ষণ, ফসল সংগ্রহ থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাতকরণ—প্রতিটি ধাপে নারীর উপস্থিতি অত্যন্ত সক্রিয়। সহজ কথায়, কৃষি উত্পাদনে নারী-পুরুষের শ্রম সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও নারীর শ্রম অনেকটাই অদৃশ্য থেকে যায়। পুরুষের কাজের স্বীকৃতি এক্ষেত্রে সুস্পষ্ট হলেও নারীদের কাজ থেকে যায় আড়ালেই।
কৃষক শব্দটি উচ্চারণ করলে এখনো সবার চোখে কেবল পুরুষের চিত্রই ভেসে ওঠে। অথচ গ্রামবাংলার মাঠে মাঠে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নারী শ্রমিকরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। চা-বাগানের মতো কৃষিক্ষেত্রের কথা নাই-বা বললাম! এভাবে ঘরের কাজের পাশাপাশি মাঠের কাজের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপেও নারীরা ভূমিকা রেখে চলেছেন। অথচ সামাজিকভাবে তাদের পরিচয় ‘গৃহিণী’, ‘কৃষক’ নয়—এ কেমন কথা!
’২২ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, কৃষিতে মোট নিয়োজিত ৪৫ শতাংশ মানুষের মধ্যে নারীর হার ২৬ শতাংশ, যা পুরুষের ১৯ শতাংশের চেয়ে অনেক বেশি। সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪-এ দেখা যায়, দেশের ১৮.৪ মিলিয়ন নারী কৃষি খাতে নিয়োজিত, যা কৃষিতে পুরুষের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে। এর পরও নারীরা কৃষক হিসেবে পরিচয় বা কৃষি খাতের সুযোগসুবিধা; যেমন—কৃষক কার্ড, সার সাবসিডি, কৃষিঋণ—এসবের বেশির ভাগই পান না।
নারীর শ্রমকে ‘স্বাভাবিক দায়িত্ব’ বা ‘ঘরের কাজ’ হিসেবে দেখা হয়। ফলে তাদের মজুরিবৈষম্যও স্পষ্ট। অনেক ক্ষেত্রে নারীদের সমান পরিশ্রমের পরও পুরুষের তুলনায় কম মজুরি দেওয়া হয়। আবার ভূমির মালিকানা বেশির ভাগই পুরুষের নামে থাকার কারণে নারীরা কৃষির সিদ্ধান্ত, সম্পদ বা সুবিধায় সেভাবে অংশ নিতে পারেন না। তাদের শ্রম যতই অপরিহার্য হোক না কেন, মালিকানা না থাকার কারণে ক্ষমতায়নের একটি বড় অংশ থেকে তারা ছিটকে যান। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে নারী কৃষকদের জন্য ঋণ, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, উপকরণ সহায়তা, বাজারসংযোগ—এসব সুবিধা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে, যা ধীরে ধীরে তাদের ক্ষমতায়ন ও স্বীকৃতি বৃদ্ধি করছে।
কৃষিতে নারীর শ্রম, দক্ষতা ও অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া শুধু সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন নয়, এটি দেশের কৃষি উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নারী কৃষকের অধিকার, সুবিধা এবং পরিচয় নিশ্চিত করা গেলে কৃষি উত্পাদন আরো বাড়বে; কৃষি হবে আরো শক্তিশালী ও টেকসই।
লেখক : শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়













