সম্প্রতি ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র নদের পাশে বসে চা খাচ্ছিলাম। হঠাত্ করেই লক্ষ করলাম, একদল তরুণ একটা ছেলেকে চার হাত-পা ধরে বেঁধে এনে নদের পানিতে নিক্ষেপ করল। গায়ে তার ছেঁড়া শার্ট আর মুখমণ্ডলসহ মাথায় কাঁচা ডিম, কেক আর ময়দা মাখানো, বুঝতে সমস্যা হলো না যে, ছেলেটির জন্মদিন আজকে। একটু পর জানলাম—হ্যাঁ, আজ ছেলেটির ‘হ্যাপি বার্থডে’ আর সেই হ্যাপি মুহূর্তটি উদ্যাপন করতেই এহেন হ্যাপি আয়োজন!
বেশ কিছু বছর ধরে উঠতি বয়সের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এভাবে জন্মদিন পালন করার এক অদ্ভুত ট্রেন্ড চালু হয়েছে। যার জন্মদিন সে যদি ছেলে হয়, তাকে সবাই মিলে চেপে ধরে সেই অবস্থায় হয় তাকে অসহায় আত্মসমর্পণ করতে হবে, না হয় জোর করে তার হাত-পা গাছ বা বাঁশের সঙ্গে বেঁধে মুখে-মাথায় ডিম, ময়দা, কেক বা কাদামাটি ইত্যাদি নানাবিধ জিনিস লাগিয়ে অত্যাচার করা হবে। আনন্দ উদ্যাপনের দিনে এভাবেই ‘তাকে দুঃখ দিয়ে’ আনন্দ উদ্যাপন করে থাকে বন্ধুমহল অথবা তার পরিচিতজনরা। অন্যদিকে, মেয়ে হলে অনেক সময় এমন না হলেও জোরপূর্বক মুখমণ্ডলে বা শরীরে এসব মাখিয়ে কিংবা হরেক কিসিমের রং লাগিয়ে আনন্দ উদ্যাপন করা হয়। এ কোন সংস্কৃতি!
জন্মদিনের এই উত্সবকে অনেকে আখ্যায়িত করে থাকেন ‘সন্ত্রাসী কায়দার উত্সব’ হিসেবে—সঠিক পর্যবেক্ষণ বটে! তবে ভিন্নমতও রয়েছে; কেউ কেউ বলেন, কিছু সময় আনন্দ পাওয়ার জন্য হয়তো ব্যতিক্রমী কায়দায় জন্মদিনের এমন উত্সব করা হয়। তবে বিষয়টি আরো একধাপ এগিয়ে যায় যখন বন্ধুমহল সেই ঘটনা ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল করে।
সচেতন নাগরিক ও অভিভাবক মহল বিষয়টিকে যে স্বাভাবিকভাবে নেন না, সে কথা বলাই বাহুল্য। অভিভাবকরা এ ধরনের আয়োজন বা মজা করার প্রবণতা মানতে নারাজ। তাদের ভাষ্যমতে, এটা সামাজিক অবক্ষয়ের নব্য ট্রেন্ড।
আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি, এটা আসলেই মজা নাকি বর্বর আচরণ? আমাদের সমাজের জন্য এই প্রবণতা কতটা ক্ষতিকর, সেটা কি ভেবে দেখছি? উত্সব উদ্যাপনের নামে এহেন কুরুচিপূর্ণ ও লজ্জাজনক আচার-আচরণ আসলেই সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয় ত্বরান্বিত করছে, যা পরিত্যাজ্য।
জন্মদিন উদ্যাপন হবে আনন্দের, ভালোবাসার, শুভেচ্ছা বিনিময়ের দিন। অথচ একশ্রেণির তরুণ-তরুণী দিনটাকে পরিণত করছে অপমান আর হেনস্তার উপলক্ষ্য হিসেবে। এদের কাছে সুস্থ মস্তিষ্ক ও আর সুস্থ সংস্কৃতি উভয়েরই বড্ড অভাব। অনেক সময় দেখা যায়, জন্মদিনের এমন বর্বর উত্সবের জন্য ব্যক্তি নানানভাবে সমালোচিত হয়। এনমকি এ থেকে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও ঘটে, যা শেষ পর্যন্ত জন্মদিনকে টেনে নিয়ে যায় হাসপাতাল পর্যন্ত। শুধু জন্মদিন নয়, বিভিন্ন উত্সব-পার্বণেও এই অপসংস্কৃতি লক্ষ করা যায়।
সচেতন মহল সর্বদাই বলে আসছেন, তরুণ প্রজন্মকে এখনই এসব নোংরামি বন্ধ করতে হবে, নতুবা ভবিষ্যতে জন্মদিন উদ্যাপন মানেই তরুণরা কেবল অপমান, হেনস্তার মতো অপসংস্কৃতিকেই বুঝবে। নতুন প্রজন্মকে বুঝতে হবে, আনন্দ মানে কষ্ট দেওয়া নয়, লজ্জায় ফেলা বা অপদস্ত করা নয়। বরং উত্সব হবে আনন্দের, নমনীয় এবং সুন্দর ও স্মরণীয়। জন্মদিনের সুন্দর হাসি যেন কারো লজ্জার ও অপমানের কারণ না হয়, সেদিকে লক্ষ রেখেই আনন্দ-উত্সব পোলন করা উচিত। এটাই সুস্থ সংস্কৃতির পরিচায়ক।
লেখক : শিক্ষার্থী, আনন্দমোহন কলেজ, ময়মনসিংহ
(এই লেখা লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত অভিমত; এ সংক্রান্ত কোনো দায় দৈনিক মূলধারা বহন করবে না)













