আগের মেয়াদে ভেনিজুয়েলায় সামরিক হামলা চালানোর ইচ্ছা থাকলেও সেখান থেকে সরে এসেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এবার তিনি অনেকটাই এক্ষেত্রে মনস্থির করে ফেলেছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে। এই লক্ষ্যে ইতিমধ্যেই ক্যারিবীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বিমানবাহী রণতরি ইউএস জেরাল্ড ফোর্ড মোতায়েন করা হয়েছে, যার আওতায় ১২টি যুদ্ধজাহাজ রয়েছে। এর বাইরেও রয়েছে জলে ও স্থলে হামলা চালানোর মতো জাহাজ এবং সাবমেরিন।
এই বিষয়ে তিনি বেশ কয়েক বার তার সামরিক, গোয়েন্দা এবং রাজনৈতিক নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সম্ভাব্য হামলার ধরন কী হবে, হামলা কি আদৌ ফলপ্রসূ হবে কি না এবং এর মধ্য দিয়ে তার আসল উদ্দেশ্য দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলো মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করা সম্ভব হবে কি না, আর যদি না হয়, তাহলে সম্ভাব্য কি পরিণতি ভোগ করতে হতে পারে ইত্যাদি বিষয়গুলো এখন ভাবনার সর্বাগ্রে রয়েছে। প্রেসিডেন্ট মাদুরো ইতিমধ্যে সতর্ক করে বলেছেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র এমনটা করে, তাহলে ল্যাটিন আমেরিকায় আরেকটা গাজা, আফগানিস্তান বা ভিয়েতনাম পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে, যার জন্য যুক্তরাষ্ট্রই দায়ী থাকবে।
কী কারণে ট্রাম্প ভেনিজুয়েলায় আক্রমণ করার কথা ভাবছে, সেটা বিশ্লেষণ করা দরকার। ট্রাম্পের পক্ষ থেকে বারবার যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ অভিবাসীর ঢল, মাদক এবং কোকেন পাচারের জন্য ভেনিজুয়েলাকে দায়ী করা হচ্ছে। আর তাই সেখানে কোকেন উত্পাদন কেন্দ্র এবং মাদক পাচারের রুটগুলো প্রাথমিক হামলার লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হলেও মূলত যুক্তরাষ্ট্রের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সেখানকার সমাজতন্ত্রী সরকার এবং মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করে নিজেদের পছন্দের কাউকে অধিষ্ঠিত করা। ২০১৯ সালের ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পর বিরোধী নেতা হুয়ান গোয়াইদো দেশটির নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হননি, উপরন্তু মাদুরো তার শাসনক্ষমতাকে আরো পোক্ত করেছেন। ১৯৮৯ সালে হুগো শাভেজ ক্ষমতাসীন হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের চূড়ান্ত অবনতি হয়, যা শাভেজের মৃত্যুর পর নিকোলাস মাদুরো ধরে রেখেছেন, যদিও শাভেজের মতো জনসমর্থন তিনি অর্জন করতে পারেননি, বরং জোর করে ক্ষমতা টিকিয়ে রেখেছেন, যার জেরে জন-অসন্তোষ এখন চরমে রয়েছে, আর এই সুযোগটাই কাজে লাগাতে চেষ্টা করছেন ট্রাম্প। ।
দেশটিতে রয়েছে প্রচুর তেলসম্পদ, ২০২৩ সালের হিসেবে ভেনিজুয়েলায় তেলের মজুত রয়েছে ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল, যা বিশ্বের সবচেয়ে বেশি, এর পরের অবস্থানে রয়েছে সৌদি আরব, যার মজুতের পরিমাণ ২৬৭.২ ব্যারেল। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে তেল রপ্তানি তাদের অর্থনীতিতে তেমন ভূমিকা রাখতে পারছে না। ২০২৩ সালে ভেনিজুয়েলা মাত্র ৪.০৫ বিলিয়ন ডলারের তেল রপ্তানি করেছে, এর বিপরীতে সৌদি আরব ১৮১ বিলিয়ন ডলার, যুক্তরাষ্ট্র ১২৫ বিলিয়ন ডলার এবং রাশিয়া ১২২ বিলিয়ন ডলারের তেল রপ্তানি করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির মূল জায়গা মানবাধিকার, গণতন্ত্র ইত্যাদি বিষয়গুলোকে পুঁজি করে তারা এখন পর্যন্ত বহির্বিশ্বে যেসব অভিযান পরিচালনা করেছে, তার একটা বর্ধিত কলেবর হিসেবে ভেনিজুয়েলাকে এই মুহূর্তে বিবেচনা করছেন ট্রাম্প। এর আগে ২০১৯ সালের ব্যর্থ অভ্যুত্থানের নেপথ্যেও ছিল যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়ার মধ্যকার ক্ষমতার লড়াই। এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সব প্রেসিডেন্ট ভেনিজুয়েলা নিয়ে পরিকল্পনা করলেও চূড়ান্ত আক্রমণ করতে সাহস করেনি, পাছে রাশিয়া-চীন এবং অপরাপর প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো এতে জড়িয়ে পড়ে একে আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ দেয়—এই শঙ্কায়।
২০১৩ সালে দেশটির তুলনামূলক জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজের মৃত্যুর পর সেই সময়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তাকে প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করে চলতে হচ্ছে। তেল ও হীরকসমৃদ্ধ দেশটির তেল বাণিজ্যের ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় অর্থনীতি যখন টালমাটাল, এমন অবস্থায় রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের দুর্নীতি, আন্তর্জাতিক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতা, অকল্পনীয় মুদ্রাস্ফীতি এবং প্রধান বিরোধী দল কর্তৃক সরকার উত্খাতে পশ্চিমা সমর্থন মোকাবিলায় প্রেসিডেন্ট মাদুরো কতটুকু সক্ষম, সেটা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। হুগো শ্যাভেজ ২০০৯ থেকে ২০১৩ সময় পর্যন্ত দায়িত্ব পালনকালে কেবল ভেনিজুয়েলা নয়, গোটা দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর প্রভাব হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছিলেন, যা ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়েছিল। শ্যাভেজ তার দায়িত্ব পালনকালে তার উত্তরসূরি হিসেবে অসমাপ্ত কর্মসম্পাদনে মাদুরোকে বেছে নিলেও নেতৃত্ব গুণ এবং দক্ষতায় মাদুরো কোনো অবস্থায় শ্যাভেজের ধারে কাছে যেতে পারেননি।
প্রশ্ন হচ্ছে, হুগো শ্যাভেজের ব্যক্তিত্বের বিপরীতে কেন মাদুরোর এই বিপরীতমুখী ভাবমূর্তি? সবকিছুকে ছাপিয়ে সর্বস্তরে দুর্নীতি, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে ব্যাপক অনিয়মের মাধ্যমে ধ্বংস করে দেওয়া এবং ক্ষমতা হারানোর শঙ্কায় ব্যাপক অনিয়মের মাধ্যমে বিতর্কিতভাবে ক্ষমতা ধরে রাখার প্রবণতা আজ গোটা দেশকেই বিশৃঙ্খলার চরমে নিয়ে গেছে। এই সংকটকালীন ভেনিজুয়েলার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অযাচিত হস্তক্ষেপে চীন এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধাচারণের অর্থ এই নয় যে, তারা মাদুরোর সপক্ষ অবস্থান নিয়েছে, কিন্তু ঐ অঞ্চলে মার্কিন প্রভাব বিস্তারের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনাকে তারা বাস্তবায়ন করতে দিতে চায় না।
সত্যিকার অর্থে কী ঘটতে যাচ্ছে ভেনিজুয়েলাতে, তা এই মুহূর্তে স্পষ্ট নয়। তবে রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এটুকু অন্তত বোঝা যায় যে, জনগণের মুক্তি বেশ দুরূহ। লাতিন আমেরিকার মুক্তির দূত হিসেবে পরিচিত সিমন বলিভার ১৮২১ সালে স্পেনের ঔপনিবেশিক শাসন থেকে ভেনিজুয়েলাসহ কলম্বিয়া, বলিভিয়া, ইকুয়েডর এবং পেরুর স্বাধীনতা এনে দিয়ে পরবর্তীকালে এর সব কয়টিতেই কর্তৃত্বমূলক শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। ১৯৫০-এর দশকে রোমলো গালেগস প্রথম বারের মতো গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হলেও ক্ষমতাচ্যুত হন মার্কোস পেরেজ কর্তৃক। এভাবে কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা ধারাবাহিকভাবে অব্যাহত থাকে। ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি সেখানে মার্কিন সেনা পাঠাবেন বলে যে হুমকি দিয়েছেন, তা যদি শুধু হুমকির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে ভালো। এখানে যে কোনোভাবে জোরপূর্বক মাদুরোকে টানিয়ে নামানোর বিষয়টি স্পর্শকাতর হবে। আবার মাদুরোর বিষয়ে যে নেতিবাচক ভাবমূর্তি ইতিমধ্যে দেশটিতে সৃষ্টি হয়েছে, এই অবস্থায় যদি নির্দিষ্ট মেয়াদের আগে সেখানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তাহলে সেখানে নিশ্চিতভাবে বামপন্থি সরকারের বিপর্যয় ঘটবে, যা প্রত্যাশিতভাবেই পশ্চিমা গোষ্ঠীর জন্য স্বস্তিদায়ক হবে।
পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে বোঝা যাচ্ছে যে, দেশটির চীন এবং রাশিয়াপন্থি প্রভাব বেশ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তারা অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাই চাইবেন বিকল্প নেতৃত্ব খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত মাদুরোর ওপর ভরসা রাখতে। তবে এই সংকটকালীন সময়ে এখন পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট মাদুরোর সবচেয়ে বড় ভরসা দেশটির সেনাবাহিনী। সরকারের প্রতি সেনাবাহিনীর এই আনুগত্যের ভিতও রচনা করেছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট শ্যাভেজ। সংবিধান অনুসারে রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিষিদ্ধ হলেও শ্যাভেজের শাসনামলে তাদের রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন করা হতে থাকে। তাছাড়া তাদের একটা বড় অংশ নিজেরাই মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত, এর ফলে যদি মাদুরো সরকারকে উচ্ছেদ করাও হয়, তাহলে পরবর্তী বেসামরিক সরকারের পক্ষে, বিশেষ করে পশ্চিমাপন্থি সরকারের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে কাজ করাটাও দুরূহ বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।
এর বাইরেও রয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার আঞ্চলিক রাজনীতির মেরুকরণ। ভেনিজুয়েলার তেলসম্পদের সবচেয়ে বড় উপকারভোগী হচ্ছে কিউবা। মূলত ভেনিজুয়েলার তেলের ওপর তাদের অর্থনৈতিক ভিত্তি দাঁড়িয়ে রয়েছে, এবং কিউবার গোয়েন্দা সংস্থাই মাদুরোর সরকারকে টিকিয়ে রাখতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে। এরই মধ্যে ভেনিজুয়েলার ৭০ লাখের অধিক শরণার্থী যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল এবং কলম্বিয়াসহ বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিয়েছে। এমন অবস্থায় সরকার পতন পরবর্তী সময়ে এই সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে, যা তাদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।
মাদুরোকে পছন্দ না হলেও তিনি বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নিজেকে হুমকি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেননি, বরং দেশের অভ্যন্তরে তার জনসমর্থনের পাল্লা ধীরে ধীরে কমছে। এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য দুইটি বিকল্প থাকতে পারে, প্রথমত, আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে ভেনিজুয়েলার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানে সম্মিলিত প্রয়াস গ্রহণ করা এবং দ্বিতীয়ত, ভেনিজুয়েলার সঙ্গে সরাসরি সংলাপে বসে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের বিষয়গুলো নিরসন করা। শক্তি প্রয়োগের চিন্তা থেকে সরে না এলে দক্ষিণ আমেরিকায় যুদ্ধের পরিণাম যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভয়াবহ হতে পারে।













