জাতীয় নাগরিক পার্টি থেকে একে একে শীর্ষ নেতানেত্রীরা পদত্যাগ করছেন, এতে এখন আর কারো চা ঠান্ডা হয় না। এটি আর রাজনৈতিক খবর নয়, বরং নিয়মিত আবহাওয়ার আপডেটের মতো :আজও কয়েক জন গেলেন। তবে এই পদত্যাগের ভিড়ে একজন নেত্রীর ফেসবুক নোট আলাদা করে সচেতন মহলের নজর কেড়েছে। কারণ সেখানে রাজনীতি নয়, সরাসরি পাকস্থলীর কথা এসেছে।
তাজনূভা জাবীন নামের ঐ নেত্রী এনসিপি থেকে বিদায় নেওয়ার কারণ হিসেবে জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনি সমঝোতার কথা বলেছেন। আর সেই কথা বলতে গিয়ে তিনি যে শব্দটি বেছে নিয়েছেন, সেটি হলো—‘হজম’। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির আসন সমঝোতা এমন এক বস্তু, যা তিনি ‘হজম করে মরতেও পারবেন না’। বক্তব্যটি একাধারে গভীর, দার্শনিক এবং গ্যাস্ট্রোলজিক্যালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই দেশে রাজনীতি করতে গিয়ে মানুষ প্রতিদিন যে পরিমাণ বিষ, ভেজাল, কুখাদ্য আর নাকে ধরা দুর্গন্ধ হজম করে, সেখানে জামায়াত নামের একটি বহু পুরোনো, ভালোভাবে প্রিজারভ করা রাজনৈতিক খাদ্য হজমে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তবু সমস্যা হয়েছে। আর রাজনীতিতে যেখানে বদহজমই সবচেয়ে বিরল ঘটনা, সেখানেই এই অস্বস্তি,এখানেই আসল রহস্য।
মানুষ সর্বভুক প্রাণী। এই তত্ত্ব প্রথম বলেছিলেন অ্যারিস্টটল নাকি কোনো চায়ের দোকানের বুদ্ধিজীবী, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। কিন্তু ঢাকা শহরে বসবাস করলেই বিষয়টি প্রমাণিত হয়ে যায়। আমরা দিনে তিন বেলা খাবার খাই, তার সঙ্গে চার বেলা ধোঁয়া, পাঁচ বেলা শব্দদূষণ, ছয় বেলা ভেজাল আর সাত বেলা রাজনৈতিক ভণ্ডামি গিলি। সকালে ঘুম ভাঙে হর্নের চিত্কারে, দুপুরে অফিসে বসে শ্বাস নিই ডিজেলের ধোঁয়া আর সন্ধ্যায় ফেসবুক খুলে হজম করি নীতিকথা আর নৈতিকতার পোস্ট। এত কিছুর পর যদি কেউ বলেন, জামায়াতকে হজম করা যাবে না, তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে, আপনার পাকস্থলীটা আসলে কোন গ্রহে থাকে?
ঢাকায় বসবাস মানেই বিষের সাগরে ডুব দেওয়া। বাতাসে এমন সব কেমিক্যাল ভাসে যে ফুসফুস মাঝেমধ্যে নিজেই ভাবতে থাকে, আমি কি সত্যিই ফুসফুস, নাকি কোনো কারখানার ফিল্টার। এই বাতাস হজম করতে পারছি আমরা। খাবারে ফরমালিন, রং, সাবান, ডিটারজেন্ট মিশিয়ে দিলেও আমরা হেসে খাচ্ছি। বাসে উঠলে মানুষের শরীরের ঘাম, নিঃশ্বাস আর জীবনের হতাশা একসঙ্গে মিশে যে গন্ধ তৈরি হয়, সেটাও আমরা নিয়মিত হজম করি। সেখানে রাজনৈতিক সমঝোতা নামের একটি পুরোনো রেসিপি হজমে সমস্যা হওয়া একটু অস্বাভাবিক নয় কি?
রাজনীতির ইতিহাসের পাতা ওলটালেই বোঝা যায়, এ দেশে হজমশক্তির দিক থেকে মানুষজন অলিম্পিক নয়, সরাসরি বিশ্ব রেকর্ডধারী। আদর্শ, শপথ, শত্রুতা—সবই এখানে অনায়াসে হজম হয়। যাদের বিরুদ্ধে একসময় বুক চিতিয়ে লড়াই, পরদিনই তাদের কাঁধে হাত রেখে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে হাসি। যাদের রাজাকার বলে গলা ফাটানো হয়েছে, সুযোগ বুঝে তাদের সঙ্গেই ভোটের হিসাব-নিকাশ। যাদের অন্ধকার বলে আঙুল তোলা হয়েছে, পরে সেই অন্ধকারেই খুঁজে পাওয়া গেছে ক্ষমতার আলো।
মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান ও কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রম তার সামান্য নমুনা মাত্র। এই দুই মহান মুক্তিযোদ্ধা একসময় জামায়াতবিরোধী অবস্থান থেকে বক্তৃতা দিয়েছেন, কলাম লিখেছেন, অবস্থান নিয়েছেন। সময়ের পাকচক্রে এসে মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান সরাসরি জামায়াতে যোগ দিলেন, আর কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রমের এলডিপি ঠাঁই নিল জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটে। জামায়াতি ছাতার নিচে দাঁড়িয়ে এখন তারা রোদ-বৃষ্টি উপভোগ করছেন নির্বিঘ্নে। আশ্চর্যজনকভাবে কোনো বদহজম হয়নি, বরং মনে হয়—দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অনুশীলনে তাদের পাকস্থলী আরো শক্তপোক্ত হয়েছে।
হজমের একটি বৈজ্ঞানিক দিক আছে। ডাক্তাররা বলেন, অল্প অল্প করে বিষ খেলে শরীর অভ্যস্ত হয়ে যায়। রোগপ্রতিরোধক্ষমতা বাড়ে। আমরা জাতি হিসেবে সেটাই করেছি। অখাদ্য, কুখাদ্য, ভেজাল, দূষণ, দুর্নীতি, মিথ্যা, প্রতারণা সবকিছু একটু একটু করে খেয়ে আমরা এমন শক্তিশালী হয়েছি যে, কোভিডের মতো একটা বৈশ্বিক মহামারি আমাদের সামনে এসে থতমত খেয়ে গেছে। উন্নত বিশ্বের মানুষ মাস্ক, স্যানিটাইজার, লকডাউন, বিজ্ঞান আর শৃঙ্খলার পাহাড় গড়ে তুলেও যখন শয়ে শয়ে লাশ হয়েছে, আমরা তখন কোনো নিয়ম না মেনেই রাস্তায় আড্ডা দিয়েছি, বিয়ের দাওয়াত খেয়েছি, চায়ের দোকানে বসে করোনার সমালোচনা করেছি। ফলাফল কী হয়েছে? করোনা বাপবাপ বলে পালিয়েছে। কারণ সে বুঝেছে, এই জাতির শরীর ইতিমধ্যেই সব ধরনের ভাইরাসের সঙ্গে সহাবস্থানে অভ্যস্ত।
এই অভ্যস্ততার জায়গা থেকেই প্রশ্ন আসে, রাজনীতিতে কেন এই হঠাত্ নীতিগত বদহজম? এ দেশে রাজনীতি করতে হলে হজম শক্তি বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। এটা খাব না, ওটা খাব না, ওর সঙ্গে বসব না, ওর সঙ্গে মিশব না—এই ছুতমার্গ নিয়ে রাজনীতিতে টিকে থাকা যায় না। এখানে টিকে থাকতে হলে মাঝে মাঝে বিষ খেতে হয়, আবার সেই বিষকেই হজম করে শক্তিতে রূপান্তর করতে হয়। রাজনীতির জিমনেসিয়ামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হলো পাকস্থলী। আদর্শ হলো সাজানো ট্রফি, কিন্তু ম্যাচ জিততে হয় হজমশক্তি দিয়ে।
তাজনূভা জাবীনের বক্তব্যে যে আবেগ আছে, তা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু আবেগ দিয়ে রাজনীতি করলে সমস্যা হয়। কারণ এ দেশে রাজনীতি কোনো ভেজালমুক্ত জুস বার নয়, এটা পুরান ঢাকার ইফতারের মতো। কে কোন তেলে ভাজা, কে কত দিনের পুরোনো, কে কতটা স্বাস্থ্যসম্মত, তা জানার সুযোগ নেই। আপনি যদি শুধু অর্গানিক খুঁজতে যান, তাহলে ক্ষুধায়ই মারা যাবেন। তাই সবাই খায়। কেউ একটু বেশি খায়, কেউ কম। কেউ খেয়ে বদহজমে ভোগে, কেউ খেয়ে আরও মোটা হয়।
রাজনীতির আরেকটি বাস্তবতা হলো স্মৃতি। আমাদের রাজনৈতিক স্মৃতি খুবই স্বল্পমেয়াদি। আজ যাকে ঘৃণা করছি, কাল তাকেই প্রয়োজন হবে। আজ যাকে নৈতিকতার কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছি, কাল তাকেই উদ্ধারকর্তা বানাব। এই চক্রের মধ্যে হজমশক্তিই একমাত্র স্থায়ী সম্পদ। যারা সেটা পারেন না, তারা পদত্যাগ করেন, ফেসবুকে দীর্ঘ পোস্ট লেখেন, বিবেকের কথা বলেন। যারা পারেন, তারা মুচকি হাসেন, বলেন—রাজনীতি হলো সম্ভাবনার শিল্প, তারপর পরের বৈঠকে যান।
ফেসবুক পোস্টে ‘মরতেও পারব না’ বলা একটি শক্তিশালী বাক্য। কিন্তু রাজনীতিতে মৃত্যু বড় আপেক্ষিক ব্যাপার। এখানে কেউ মরেন না, শুধু অবস্থান বদলায়। আজ যে নৈতিকভাবে মৃত, কাল সে বাস্তবতার আলোয় পুনর্জন্ম নেয়। ইতিহাসে তার অভাব নেই। তাই মরতেও পারব না বলা মানে আসলে আমি এই পর্যায়ের খাবার খেতে পারছি না বলা। কেউ কেউ বিরিয়ানি খেয়ে অসুস্থ হন, কেউ শুকনা রুটি খেয়েই দিব্যি থাকেন। এটা ব্যক্তিগত সহনশীলতার ব্যাপার।
এই দেশের জনগণ রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে আর কিছুই চায় না। আদর্শ নয়, নৈতিকতা নয়, এমনকি প্রতিশ্রুতিও নয়। তারা শুধু একটাই গুণ খোঁজে :হজমশক্তি। কারণ যিনি নিজে হজম করতে পারেন না, তিনি দেশের বোঝা হজম করবেন কীভাবে? রাষ্ট্র চালানো মানে প্রতিদিন নতুন নতুন বিষের সঙ্গে সমঝোতা করা, কখনো আন্তর্জাতিক চাপ, কখনো অভ্যন্তরীণ কোন্দল, কখনো আদর্শ আর বাস্তবতার কাঁটাতার। সবকিছু একসঙ্গে গিলতে হয়, চিবানোর সুযোগ নেই। সেখানে যদি কেউ বলেন, ‘এইটা আমার গলায় আটকে যাচ্ছে’ বা ‘এইটা নৈতিকভাবে নিতে পারছি না’, তাহলে তাকে রাজনীতিবিদ না বলে বিশ্রামপ্রার্থী বলাই ভালো। রাজনীতি এখানে ডায়েট ফুড নয়, এটা একেবারে ভারী, তেলঝাল আর সন্দেহজনক উপাদানে ভরা খাবার।
সব মিলিয়ে এনসিপি নেত্রীর এই পদত্যাগ, এই পোস্ট, এই হজমবিতর্ক আমাদের আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় :বাংলাদেশে রাজনীতি কোনো নীতিশাস্ত্রের পরীক্ষাগার নয়, এটা আসলে একধরনের স্ট্রিট ফুড চ্যালেঞ্জ। কে কতটা ঝাল সহ্য করতে পারে, কে কতটা বাসি খাবার গিলে ফেলেও হাসিমুখে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে, সেটাই আসল যোগ্যতা। এখানে আদর্শ দিয়ে পেট ভরে না, নীতির কথা বলে ক্ষুধা মেটে না। পেট ভরাতে হলে পাকস্থলীকে লোহায় মোড়া করতে হয়। যারা সেটা পারেন, তারা টিকে যান, জোটে যান, ক্ষমতার টেবিলে বসেন। যারা পারেন না, তারা নৈতিক বিবৃতি দেন, ফেসবুকে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। আর জাতি হিসেবে আমরা সেই দীর্ঘশ্বাসও অনায়াসে হজম করে সামনে এগিয়ে যাই; কারণ অভ্যাস হয়ে গেছে, আর বিকল্প বলতে গেলে আজকাল হজমই আমাদের একমাত্র জাতীয় সক্ষমতা।













