এদেশে জন্ম আমার আজন্ম পাপ—বাক্যটি কেবল কোনো ব্যক্তিগত হতাশার উচ্চারণ নয়; এটি বাংলাদেশের অসংখ্য নাগরিকের ভয় ও অসহায়ত্বের এক কাব্যিক বহিঃপ্রকাশ। যেদিন একজন মানুষ নিজের জন্মকে অভিশাপ হিসেবে ভাবতে শুরু করে, সেদিন সেই রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি ও শাসনব্যবস্থা গভীর প্রশ্নের মুখে পড়ে—এটাই স্বাভাবিক।
গত কয়েক মাসের সংবাদপত্রের পাতা উলটালেই এই বোধের উৎস স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মেট্রোরেলের পিলারের বিয়ারিং প্যাড পড়ে এক যুবকের মর্মান্তিক মৃত্যু, রাজনৈতিক সংঘর্ষে নিহত এক কলেজছাত্র, মগবাজারে ককটেল বিস্ফোরণে প্রাণ হারানো এক নিরীহ পথচারী কিংবা বেপরোয়া বাসের ধাক্কায় নিভে যাওয়া এক তরুণ—এরা কেউ অপরাধী ছিল না, কেউ রাষ্ট্রবিরোধীও নয়। তারা ছিল সাধারণ মানুষ। তাদের একমাত্র ‘অপরাধ’ ছিল—তারা বাংলাদেশে জন্ম নিয়েছিল এবং জীবনের তাগিদে প্রতিদিনের মতো ঘর থেকে বের হয়েছিল।
প্রশ্ন উঠতেই পারে—একটি দেশে জন্ম নেওয়া কেন পাপের মতো অনুভূত হবে? এর উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের তাকাতে হবে রাষ্ট্রের ভূমিকায়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মৌলিক তত্ত্ব অনুযায়ী, রাষ্ট্রের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হলো নাগরিকের জীবন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু যখন উন্নয়নের নামে নির্মাণকাজ নাগরিকের মাথার ওপর মৃত্যুফাঁদ হয়ে ঝুলে থাকে, তখন প্রশ্ন জাগে—এই উন্নয়ন কার জন্য? জনগণের জন্য, নাকি জনগণের বিরুদ্ধে? যখন রাজনীতির নামে শিক্ষার্থী হত্যা হয়, তখন ভবিষ্যৎ রাজনীতি নিয়ে জনমনে গভীর শঙ্কা জন্ম নেয়। আর যখন রাজনৈতিক সংঘর্ষে নিরীহ পথচারী মারা যায়, তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে—আমাদের রাজনীতি মানবজীবনের মূল্যবোধ থেকে কতটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
এই মৃত্যুগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়। এগুলো দায়িত্বহীনতা, জবাবদিহিতার অভাব এবং মানবজীবনের প্রতি চরম অবহেলার ধারাবাহিক বহিঃপ্রকাশ। প্রতিটি মৃত্যুর পর গঠিত হয় তদন্ত কমিটি, উচ্চারিত হয় আনুষ্ঠানিক শোকবার্তা ও প্রতিশ্রুতি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু তলিয়ে যায় বিস্মৃতির অতল গহ্বরে। পড়ে থাকে শুধু শোকস্তব্ধ পরিবার, আর একটি জাতির বিবেকের গায়ে জমে থাকা আরেকটি কালো দাগ।
জন্মকে পাপ মনে হওয়ার এই বোধ হঠাৎ জন্ম নেয় না। এটি জন্ম নেয় তখনই, যখন নাগরিক নিজেকে রাষ্ট্রের কাছে বোঝা মনে করতে শুরু করে; যখন ন্যায়বিচার চাইতে গিয়ে তাকেই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়; যখন শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার মতো মৌলিক অধিকারগুলো ধীরে ধীরে অনিশ্চয়তার বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে পড়ে।
তবে কি এই পাপবোধ থেকে মুক্তির কোনো পথ নেই? আছে—নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন জবাবদিহিতার সংস্কৃতি গড়ে তোলা। উন্নয়নের ঢোল পিটিয়ে মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে রাখার রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। সহিংস রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিত্যাগ করতে হবে। নিরাপদ সড়ক, নিরাপদ নগর, নিরাপদ নাগরিক—এগুলো যেন কেবল স্লোগান না হয়ে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারে পরিণত হয়। সর্বোপরি, মানবজীবনের মূল্যকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে স্থান দিতে হবে।
একটি দেশ তখনই প্রকৃত অর্থে স্বাধীন, যখন তার নাগরিক ভয় ও হতাশামুক্ত হয়ে বাঁচতে পারে—যখন জন্ম নেওয়া কোনো পাপ নয়, বরং সৌভাগ্য বলে মনে হয়। আমাদের সচেতন হতে হবে, প্রশ্ন তুলতে হবে, সংগঠিত হতে হবে এবং পরিবর্তনের জন্য দাবি জানাতে হবে। কারণ জন্মভূমিকে অভিশাপ মনে হওয়ার এই বেদনা দূর করার দায় শুধু রাষ্ট্রের নয়; সমাজের, রাজনীতির এবং আমাদের সবার। আসুন, আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ি—যেখানে জন্ম নেওয়া হবে গর্বের বিষয়, জীবন হবে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ, আর মৃত্যু হবে না কোনো অকস্মাৎ পরিণতি; হবে নিতান্তই স্বাভাবিক এবং স্বস্তির।













