আধুনিকতা মানুষের জীবনে এনেছে প্রযুক্তি, দ্রুত যোগাযোগ ও ভোগের নতুন মাত্রা। কিন্তু এই অগ্রগতির আড়ালে ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে আমাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ইতিহাস চেতনা। বাংলাদেশে উন্নয়ন ও দীর্ঘদিন ধরে নগরায়ণের নামে যেভাবে পুরোনো স্থাপনা ভেঙে ফেলা হচ্ছে এবং আদিকালের গ্রামীণ জীবনব্যবস্থা থেকে লোকজ সংস্কৃতি উপেক্ষিত হচ্ছে, তাতে স্পষ্ট হয় যে আধুনিকতা প্রায়ই ইতিহাসবিমুখ হয়ে উঠছে।
ঐতিহ্য কেবল অতীতের স্মৃতিচিহ্ন নয় বরং এটি একটি জাতির সামষ্টিক অভিজ্ঞতা, আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতার বহিঃপ্রকাশ। ঐতিহাসিক সূত্রও এই সত্যকে সমর্থন করে। ফ্রান্সিস বুকানন-হ্যামিলটনের Account of the District of Dinajpur এবং আবুল ফজলের বিখ্যাত আইন-ই-আকবরি গ্রন্থ বাংলার সমাজ, নগর রাষ্ট্র ও অর্থনৈতিক কাঠামোর যে চিত্র তুলে ধরে, তা আমাদের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের স্পষ্ট দলিল। বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলো আজ আধুনিকতার চাপে সংকটের মুখে। নওগাঁর সোমপুর মহাবিহার (পাহাড়পুর), বগুড়ার মহাস্থানগড়, কুমিল্লার ময়নামতি বা বাগেরহাটের মসজিদ নগরী আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাস্তব সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি রয়ে গেছে। ইউনেস্কো স্বীকৃতি থাকা সত্ত্বেও সোমপুর মহাবিহারের আশপাশে অপরিকল্পিত বসতি, পর্যাপ্ত তথ্যকেন্দ্রের অভাব এবং দুর্বল অবকাঠামো ঐতিহ্য সংরক্ষণের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানে আধুনিকতা মানে শুধু রাস্তা বা ভবন নয় বরং পরিকল্পনাহীন উন্নয়ন ঐতিহ্যকে ক্রমশ ক্ষয়ের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে।
এই সংকট আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে পর্যটন ব্যবস্থাপনায়। বাংলাদেশে ঐতিহাসিক পর্যটনের বিশাল সম্ভাবনা থাকলেও ডিজিটাল গাইড ও ট্যুরিজমের অভাব একটি বড় সমস্যা। অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী স্থানের জন্য এখনো পূর্ণাঙ্গ ও হালনাগাদ ওয়েবসাইট, ভার্চুয়াল ট্যুর, ডিজিটাল গাইড বা বহুভাষিক তথ্যব্যবস্থা নেই। ফলে দেশি-বিদেশি পর্যটকরা প্রয়োজনীয় তথ্য পেতে ব্যর্থ হন। আধুনিক বিশ্বে যেখানে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম পর্যটনের প্রধান মাধ্যম, সেখানে এই ঘাটতি আমাদের ঐতিহ্যকে বৈশ্বিক পরিসরে তুলে ধরার সুযোগকে নষ্ট করছে।
একইসঙ্গে পর্যটকদের জন্য সীমিত আবাসন ব্যবস্থা বড় অন্তরায়। অধিকাংশ প্রত্নস্থলের আশপাশে মানসম্মত হোটেল, গেস্টহাউস বা পর্যটনবান্ধব আবাসনের অভাব রয়েছে। ফলে পর্যটকরা স্বল্প সময় অবস্থান করেন বা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অবকাঠামোগত সমস্যা যেমন: যোগাযোগ ব্যবস্থা দুর্বল, পর্যাপ্ত সাইনবোর্ড নেই, শৌচাগার, বিশ্রামাগার কিংবা তথ্যকেন্দ্রের স্বল্পতা। এসব সমস্যা শুধু পর্যটকদের ভোগান্তিই বাড়াচ্ছেনা, পাশাপাশি ঐতিহ্য সংরক্ষণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আগ্রহ কমিয়ে দিচ্ছে।
ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায়, সমাজ যখন তার অতীতের সঙ্গে সংযোগ হারায়, তখন পরিচয় সংকট তৈরি হয়। ইতিহাসবিদ ই.এইচ. কার তাঁর ডযধঃ রং ঐরংঃড়ৎু? গ্রন্থে বলেছেন, ইতিহাস হলো অতীত ও বর্তমানের মধ্যে এক অবিরাম সংলাপ। কিন্তু বর্তমান যদি অতীতের কথা না শোনে, তবে সেই সংলাপ ভেঙে পড়ে। বাংলাদেশে নতুন প্রজন্মের কাছে ইতিহাস প্রায়ই পরীক্ষার সিলেবাসের মতো একটি নির্দিষ্ট কাঠামোতে সীমাবদ্ধ থাকে যা বাস্তব ও কর্মমুখী জীবনের অংশ হয়ে ওঠে না। এর ফলে সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয় এবং সামষ্টিক সংস্কৃতি গুরুত্ব হারায়। অথচ ঐতিহ্য আধুনিকতাকে পরস্পরের বিরোধী ভাবার কোনো প্রয়োজন নেই। পরিকল্পিত নগরায়ণ, কার্যকর সংরক্ষণ আইন, ডিজিটাল ট্যুরিজম উন্নয়ন এবং পর্যটনবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তুললে ঐতিহ্য সংরক্ষণ করেই আধুনিক উন্নয়ন সম্ভব। ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে বলা যায়, অতীতকে অস্বীকার করে কোনো সমাজ টেকসই উন্নয়নের পথে এগোতে পারে না। ঐতিহ্য আমাদের শেখায় আমরা কোথা থেকে এসেছি, আর আধুনিকতা দেখায় আমরা কোথায় যেতে চাই। এই দুইয়ের ভারসাম্য না থাকলে উন্নয়ন হয়ে পড়ে শিকড়হীন ও অসম্পূর্ণ।













