সফরে যাওয়ার আগেই পশ্চিমের মিডিয়ার অনেকে পুতিনের এবারের ভারত সফরকে ‘বিগ ইভেন্ট’ হিসেবে চিহ্নিত করে রেখেছিল। আসলেই তা ছিল। রাশিয়া-ভারত বন্ধুত্ব বহুদিনের; সম্ভবত ব্রিটিশরাজে ভারত বিভক্তিরও পূর্ব থেকে এই সম্পর্কের সূত্রপাত। সোভিয়েত আমল থেকেই দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, সামরিক ও শিল্প-বাণিজ্যে অত্যন্ত মজবুত সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। ভারতকে প্রাগ্রসর প্রযুক্তি প্রদানের দীর্ঘ ইতিহাস আছে; যেমন—সোভিয়েত আমলে ভারতের হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স লিমিটেডে দুই ধরনের মিগ-২১ নির্মিত হতো।
যাহোক, বিগত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকের শুরুতে, বহিরাগত চাপ ও অভ্যন্তরীণ সংকটের ফলে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি ঘটে। আবির্ভাব হয় রুশ ফেডারেশনের, এবং যুক্তরাষ্ট্র প্রবেশ করে ফ্রান্সিস ফুকুয়ামার দি এন্ড অব হিস্ট্রি অ্যান্ড দ্য লাস্ট ম্যান-এর অধ্যায়ে। ১৯৯২ সালে পল ভলফোভিত্স প্রতিরক্ষা কৌশলের একটি খসড়া প্রস্তুত করেন এবং তা প্রচার শুরু হয়। এই খসড়া বা ডকট্রিনে ‘দ্য লাস্ট ম্যান’ অর্থাত্ যুক্তরাষ্ট্রকে একমেবাদ্বিতীয়ম সুপারপাওয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করিবার লক্ষ্যে অতি জরুরি কিছু ব্যবস্থার কথা বলা হয়; যেমন—একমেরু বিশ্বব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা, নিবৃত্তিমূলক অতর্কিত বিমান হামলার অধিকার ও সক্ষমতা অর্জন, নিজের মূলনীতি ও স্বার্থের অনুকূলে গণতন্ত্র ও বাজারমুখী অর্থনীতিকে উত্সাহিত করতে ‘নতুন বিশ্ব বিন্যাস’-এর নির্দিষ্ট রূপদান, এবং ক্রিটিক্যাল প্রাকৃতিক সম্পদের উত্সসমূহে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমের প্রবেশগম্যতা বজায় রাখা ইত্যাদি।
২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বুশ জুনিয়রের ডেপুটি প্রতিরক্ষামন্ত্রী থাকাকালে ভলফোভিত্স আফগান যুদ্ধের কড়া সমর্থক এবং ইরাক যুদ্ধের প্রধান স্থপতি ছিলেন। অন্যদিকে, ১৯৯৮ সালের ১১ ও ১৩ মে ‘অপারেশন শক্তি’র সফল বিস্ফোরণের মাধ্যমে ভারত পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্রের মর্যাদা অর্জন করে। যুক্তরাষ্ট্র তখন ভারতের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। সে সময় অটল বিহারী বাজপেয়ি ছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী।
ইউগোস্লাভ ফেডারেশনের ভাঙনপ্রক্রিয়ার এক পর্যায়ে, ১৯৯৯ সালের ২৪ মার্চ জাতিসংঘের অনুমোদন ব্যতিরেকে ন্যাটো টানা ৭৮ দিন বোমাবর্ষণ চালায়। রুশ ফেডারেশনের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী ইয়েভগেনি প্রিমাকোভ ঐ দিনই বৈঠকের উদ্দেশ্যে ওয়াশিংটন যাত্রা করিতেছিলেন। তার বিমান আটলান্টিক মহাসাগরের ওপর থাকা অবস্থায় তিনি ন্যাটোর তথাকথিত ‘জনহিতৈষী হস্তক্ষেপ’-এর সংবাদ পান এবং তখনই বিমান ঘুরাইয়া মস্কোতে প্রত্যাবর্তন করেন। প্রিমাকোভ তাহার মন্ত্রিসভার নিকট সমঝোতার মাধ্যমে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনা এবং মার্কিন প্রভাব প্রতিহত করিবার হাতিয়ার হিসেবে বহুমেরুত্ব বা মালটিপোলারিটি নীতি গ্রহণের ওপর জোর দেন।
প্রিমাকোভের বহুমেরুত্বের বাস্তব প্রকাশ ঘটে ২০০৬ সালে। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীন মিলিয়া একটি নতুন আর্থিক ও অর্থনৈতিক জোট গঠন করে; চার দেশের নামের প্রথম অক্ষর লইয়া এই অরাজনৈতিক সংস্থার নাম হয় ‘ব্রিক’। ২০০৯ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা যোগদান করিলে জোটটির নাম হয় ‘ব্রিক্স’। বিগত ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ বত্সরের বিশ্বরাজনীতি, বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার ‘অস্ত্রায়ন’ এবং নিষেধাজ্ঞার হুমকির প্রেক্ষাপটে ব্রিক্স সম্প্রসারিত হইয়া ‘ব্রিক্স’-এ রূপ নেয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অন্যতম প্রধান চক্ষুশূল এই ‘ব্রিক্স+’।
এবার পুতিনের দিল্লি সফরের প্রসঙ্গে আসা যাক—পুতিন-মোদি সম্পর্ককে কিংবদন্তিতুল্য বললে অত্যুক্তি হয় না। ট্রাম্পের সঙ্গেও মোদির গভীর ব্যক্তিগত সখ্য রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর মোদি দশ বার সরকারি সফরে যুক্তরাষ্ট্র গিয়াছেন এবং কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনে দুই বার ভাষণ দিয়েছেন। কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে আশির দশকে চীন যেমন মার্কিন বিনিয়োগ ও আউটসোর্সিংয়ে ভোসে গিয়ে১ছিল, তেমনটি ঘটেনি। ভারতীয় নীতিনির্ধারকেরা বুঝিয়াছেন—মার্কিন আউটসোর্সিংয়ের ওপর অতিনির্ভরতারও একটি সীমা আছে।
পুতিন যে দল নিয়ে দিল্লি সামিটে যান, সেই দলে ছিলেন প্রথম ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী ডেনিস মানতুরোভ—ইন্ডিয়া-রাশিয়া জয়েন্ট ইকোনমিক কমিশনের সহ-চেয়ারম্যান, পুতিনের বৈদেশিক বিষয়ক উপদেষ্টা ইউরি উশাকভ এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন্দ্রেই বেলোউসভ। মস্কো ত্যাগের প্রাক্কালে পুতিন বলেন, রুশ-ভারত সামিটের ভিত্তি অর্থনৈতিক সহযোগিতা—এই বহুমুখী সহযোগিতা লোকোমোটিভের ন্যায় দুই দেশকে অগ্রগতির পথে টেনে নিয়ে যাবে। কথার সঙ্গে কাজের মিলও দেখা যায়—প্রতি বছর দুই দেশের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের বাণিজ্য, লেনদেনের জন্য বড় ব্যাংকের শাখা স্থাপন, ভারতে সার কারখানা ও পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণ, রুশ শিল্প প্রকল্প ও কৃষি খাতে সহযোগিতা, এমনকি ‘স্কিল’ খাতের চাহিদা পূরণে ভারত থেকে এক লক্ষ দক্ষ শ্রমিক গ্রহণের পরিকল্পনা। এর পাশাপাশি রাশিয়ায় ভারতের এলএনজি, তেল ও গ্যাস খাতে ‘আপস্ট্রিম’ বিনিয়োগের সুযোগও থাকছে। সুমেরুর আর্কটিক নর্দার্ন রুট ব্যবস্থাপনায় অংশগ্রহণ, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, পারমাণবিক শিল্প ও ওষুধ শিল্পও এই সহযোগিতার অংশ।
তবে সর্বাধিক চমকপ্রদ বিষয় হইল—বিশ্বের সামুদ্রিক রাজনীতিতে প্রায় নীরবে ‘রিলোস’ (Reciprocal Exchange of Logistics Support) চুক্তির স্বাক্ষর ও রুশ কর্তৃক তাহার সক্রিয়করণ। এই চুক্তি অনুযায়ী রাশিয়া ও ভারত একে অপরের বন্দর, বিমানক্ষেত্র, রিফুয়েলিং স্টেশন, মেরামত কারখানা এবং দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতির জন্য ঘাঁটি ও ক্যাম্প ব্যবহার করতে পারবে। অর্থাত্, মস্কো এখন একটি নির্ভরযোগ্য লজিস্টিক করিডরের মাধ্যমে ভারত মহাসাগরে প্রবেশাধিকার পাচ্ছে। অন্যদিকে ভারত রাশিয়ার সুমেরীয় বন্দর, উত্তরের নৌঘাঁটি এবং নর্দার্ন সি রুট বরাবর চলাচলের সুযোগ লাভ করছে।
ভারত মহাসাগরে দিয়েগো গার্সিয়া থেকে উপসাগরীয় অঞ্চল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিদ্যমান। যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স পূর্ব আফ্রিকা ও আরব সাগরের ঘাঁটি থেকে তত্পর, জিবুতিতে জাপানের উপস্থিতি আছে, এবং চীনেরও পাকিস্তান থেকে জিবুতি পর্যন্ত একাধিক বন্দর রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে রিলোস চুক্তির মাধ্যমে ভারত মহাসাগরের কৌশলগত জলরাশিতে রাশিয়ার প্রবেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রকাশ্যে হইচই না হলেও নেপথ্যে প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট। পুতিনের দিল্লি সফর উপলক্ষ্যে ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যের দিল্লিস্থ রাষ্ট্রদূতগণ যৌথভাবে ভারতীয় পত্রিকায় নিবন্ধ প্রকাশ করে মস্কো-দিল্লি সম্পর্কের সমালোচনা করলে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রকাশ্যেই তাদের তিরস্কার করে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ভারত মহাসাগরকে কেন্দ্র করিয়া শক্তি, লজিস্টিকস ও বৈশ্বিক সামরিক প্রক্ষেপণের যে পুনর্বিন্যাস চলছে, তাতে ভারত একটি অনিবার্য প্রধান শক্তিতে পরিণত হচ্ছে। একবিংশ শতাব্দীতে ভারত মহাসাগরের ভবিষ্যত্ নির্ধারিত হবে এই সামুদ্রিক সংযোগস্থলকে ভিত্তি করে—এবং সেই কারণেই বিষয়টি আলোচনার জন্য ডিসেম্বরের ছয় তারিখ মার্কিন বাণিজ্য মিশন দিল্লি সফর করেছিল।













