বর্তমান সময়ে এমন কিছু ঘটনা ঘটতে দেখা যায়, যা আমাদের কল্পনাকেও হার মানায়। সম্প্রতি পটুয়াখালীর দশমিনায় নিজের দেড় বছরের শিশুসন্তানকে প্রায় এক লাখ টাকায় বিক্রি করার অভিযোগ উঠেছে ২২ বছর বয়সী এক তরুণের বিরুদ্ধে। পরিবারের দাবি, কোলের সন্তান বিক্রির সেই টাকা দিয়ে তিনি আইফোন কিনেছেন। ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর যথারীতি পুলিশ শিশুটিকে উদ্ধার এবং অভিযুক্ত পিতাকে আটক করেছে। যদিও অভিযুক্তের বক্তব্য, সন্তানকে বিক্রি নয়, বরং অন্যের কাছে লালন-পালনের জন্য দিয়েছিলেন তিনি।
অর্থাৎ, বিষয়টি এখনো তদন্তসাপেক্ষ। তবে অভিযোগ সত্য হোক কিংবা তদন্তে ভিন্ন কোনো তথ্য প্রকাশ পাক, ঘটনাটি আমাদের সামনে যে প্রশ্নটি রেখে যায়, তা অত্যন্ত ভয়াবহ। একটি বস্তুগত পণ্যের আকাঙ্ক্ষা কি এতটাই প্রবল হতে পারে যে, নিজের সন্তানের মতো অমূল্য একটি মানবজীবনও তার পিতার কাছে অর্থের বিনিময়ে হস্তান্তরযোগ্য হয়ে উঠবে? কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ কি এটি কল্পনা করতে পারেন?
আইফোন বা দামি কোনো জিনিস কেনা কোনো অপরাধ নয়। তবে এখানে সমস্যা আইফোনে নয়, সমস্যা আমাদের মানসিকতায়, মূল্যবোধে। পরিতাপের বিষয় হলো, ভোগবাদী সংস্কৃতির প্রবল স্রোতে গা ভাসিয়ে আমরা ক্রমশ এমন এক বাস্তবতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, যেখানে মানুষের মর্যাদার চেয়ে পণ্যের মূল্য, প্রয়োজনের চেয়ে ‘অপ্রয়োজনীয় প্রদর্শন’ কিংবা সামর্থ্যের চেয়ে বড় হয়ে উঠছে মনের আকাঙ্ক্ষা। একটি শিশু কোনো পণ্য বা সম্পদ নয়, কোনো লেনদেনের বস্তু নয়। সে আর দশজনের মতোই একজন স্বতন্ত্র মানুষ; তারও অধিকার রয়েছে নিরাপদে বেড়ে ওঠার, পরিবারের সুরক্ষা পাওয়ার এবং মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপন করার। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে শিশুকে বিক্রি ও পাচার প্রতিরোধে রাষ্ট্রগুলোর ওপর সুস্পষ্ট দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে।
প্রশ্নটি কেবল কোনো একটি পরিবারের নয়, বরং প্রশ্নটি আমাদের সবার—আমরা কি এমন এক সমাজ নির্মাণ করে চলেছি, যেখানে ব্যবহারের জিনিসের জন্য রক্ত-মাংসের মানুষকেও অবলীলায় বিসর্জন দেওয়া যায়? এই প্রশ্নের জবাব যদি ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলে সন্দেহ থাকে না যে, আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট অর্থের নয়, বরং মনুষ্যত্বের!
অধিকন্তু, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে দত্তক গ্রহণের ক্ষেত্রেও অর্থের বিনিময়ে শিশুকে হস্তান্তরের কোনো সুযোগ নেই। এসব ক্ষেত্রে শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থই সর্বাগ্রে এবং প্রধান বিবেচনা। এই অর্থে, আইফোনের মতো একটি বিলাসী পণ্যের জন্য একজন শিশুকে বিক্রি করে দেওয়ার মতো ঘটনা নিছক কোনো ছোটখাটো অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
উন্নত দেশগুলোতে শিশু সুরক্ষাকে কেবল পারিবারিক বিষয় হিসেবে দেখা হয় না। এসব সমাজে রাষ্ট্রীয় শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা, সামাজিক সেবা, আদালতের তত্ত্বাবধান এবং বৈধ দত্তক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শিশুকে সুরক্ষিত রাখার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। আমাদের দেশেও শিশু সুরক্ষায় নানা ব্যবস্থা প্রচলিত রয়েছে। তবে মুশকিল হলো, এসব অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আমাদের ব্যর্থতার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। তাই ঘটনার পর শুধু পুলিশি অভিযান চালিয়ে দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না। কেন একজন তরুণ পিতা এমন ভয়ংকর সিদ্ধান্তের পথে হাঁটলেন, এর পেছনে ঠিক কী কারণ রয়েছে—সেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দেখতে হবে। অর্থনৈতিক চাপ, ভোগবাদী মানসিকতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা নাকি পারিবারিক সংকট—এসব প্রশ্নের আলোকে দেখতে হবে বিষয়টির মনস্তাত্ত্বিক দিকও।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘আমি আদম-সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি।’ তবে আমরা সেই মর্যাদা ক্রমশ ভুলে যাচ্ছি কি না, সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। একটি ফোন হারিয়ে গেলে নতুন ফোন কেনা যায়; অর্থ হারালে আবার উপার্জন করা যায়; কিন্তু একটি কোমলমতি নিষ্পাপ শিশুর শৈশব, নিরাপত্তা কিংবা জীবন কোনো বাজার থেকেই আবার কিনে আনা যায় না।
তাই প্রশ্নটি কেবল কোনো একটি পরিবারের নয়, বরং প্রশ্নটি আমাদের সবার—আমরা কি এমন এক সমাজ নির্মাণ করে চলেছি, যেখানে ব্যবহারের জিনিসের জন্য রক্ত-মাংসের মানুষকেও অবলীলায় বিসর্জন দেওয়া যায়? এই প্রশ্নের জবাব যদি ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলে সন্দেহ থাকে না যে, আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট অর্থের নয়, বরং মনুষ্যত্বের!
একটি আইফোনের কাছে পিতৃত্ব পরাজিত হচ্ছে—ভাবা যায়!













